দেশে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আকমল হোসেন

খুলনার রুপসার শিয়ালী গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে মুসলিম ধর্মাবলম্বী বিপথগামী কিছু যুবক। অভিযোগ তাদের, নামাজের সময় রাস্তা দিয়ে কীর্তন করতে করতে যাওয়ায় নামাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রতিবাদে শতাধিক যুবক রামদা, চাপাতি ও কুড়াল নিয়ে ঐ নারকীয় তাণ্ডব চালায়। প্রশাসনের বক্তব্য হচ্ছে, পরিস্থিতি অনুকূলে আছে। দশ জন দুর্বৃত্ত গ্রেফতার হয়েছে। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগার ওপর দিয়ে দেশে হরহামেশাই এ ধরনের জঘন্য ঘটনা ঘটে চলেছে।

ধর্মকেন্দ্রিক বিপদগামী রাজনীতি শুধু মানুষের মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেই বিপদ নয়, দেশ ও জাতির সার্বিক অগ্রগতিরও অন্তরায়, সেটা আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের শান্তিপ্রিয় মানুষ। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যাগত অনুপাত প্রায় সমান, উন্নয়ন অগ্রগতিতেও উভয়ের ভূমিকা কাছাকাছি। কোন একটা পক্ষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেটা জাতিসংঘ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুঁজিবাদী অর্থনীতি বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দেশেই হোক বিষয়টি উপলব্ধি করে সমধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছে, অথচ আফগানিস্তানের সাম্প্রদায়িক এবং ইসলামী মৌলবাদী তালেবান গোষ্ঠী নারীশিক্ষার বিরোধিতাই শুধু নয়, নারীকে গৃহবন্দি রাখার ব্যবস্থায় রত। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে গজিয়ে উঠা ইলোমী হেফাজত নামে মৌলবাদীরা ১৩ দফা দিয়ে আফগান স্টাইলের সমাজ গড়ার দাবিতে বিভিন্ন প্রকার সহিংসতা ঘটিয়েছে। জ্বালাও পোড়াও থেকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পর্যন্ত পোড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের শাল্লায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ রিসোর্টে হেফাজতি তা-বে তাদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। এরপরও হেফাজতকে বিএনপি সমর্থন করে চলেছে। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু- এ তত্ত্ব সব সময় ইতিবাচক নয়। বিএনপি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় হেফাজতের ১৩ দফায় বিশ্বাস করলেও ক্ষমতাসীন হয়ে তা কার্যকর করতে পারবে কিনা, এবং তা কার্যকর করতে গেলে তাদের নেত্রীর বর্তমান অবস্থা থাকার কথা নয়। নারী-পুরষের একত্রে চলাফেরাও বোরখা ছাড়া চলাফেরা করা, হেফাজতের এই বক্তব্যকে বিএনপির আন্তরিক সমর্থন না রাজনৈতিক চাল? সে বিষয়টা অনেকেরই জানার আগ্রহ। তবে এই দলটি যাদের নিয়ে গঠিত তাদের অধিকাংশ চরম ডান/স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক দলের এবং উগ্রপন্থি মতাদর্শের। দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তার দলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের স্থান দেয়ায় আজ দলটিতে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্নদের অবস্থান আরও প্রকট হয়েছে।

ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ থেকে চলে যাওয়ার আগে উদ্ভব ঘটিয়েছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির। ১৮১৬ সালে কলকাতার হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা এ ঘটনার উস্কানি বটে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মধ্যবিত্ত স্নাতকধারীদের সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখার চিন্তা থেকেই ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত আইসিএস অফিসার এ্যালেন অক্টোভিয়ান হিউমসকে দিয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে শ্রেণিবিভাজনকে পোক্ত করতে ইংরেজি ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষার বিস্তার ঘটানো হয়। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্যই পরে ধর্মীয় বিরোধ সৃষ্টি করে। এটাকে বাড়াতে ১৯০৬ সালে মুসলিমলীগ গঠনে ইন্ধন দেয়া হয়। হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথকে আরও প্রশস্থ করেছিল ব্রিটিশরা, যার ফলে ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের উত্থান ঘটে। “ধর্ম ব্যক্তির আর রাষ্ট্র সবার”- অনেকগুলি সংস্কৃতি ও ধর্মের অনুসারী মানুষের দেশে রাষ্ট্র বিশেষ কোনো একটা ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র সকল মতের ও পথের মানুষের খাজনা ও করের টাকায় পরিচালিত হয়। সেই বিবেচনায় ভারত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রকৃত অর্থে সেকুলারিজম গ্রহণ করতে পারলেও পাকিস্তান পারেনি। কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্না যদিও পাকিস্তানের নতুন সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতার অজুহাতে জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করা হয়। একই কারণে ৫২-এর ভাষা শহীদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণে বাধা দেয়, শহীদ দিবস পালনেও বাধা সৃষ্টি করে। বাংলা ভাষা ও ঐতিহ্য পালনে বাধা সৃষ্টি করে। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ঐ শক্তিকে পরাজিত করে বাংলদেশ নামে নতুন দেশের জন্ম দেয়া হয়। সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান থাকার কারণে বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবাদী রাজনীতির অনুসারী কমিউনিস্টদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, এমনকি স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি করে ৭ জন কমিউনিস্ট কর্মীকে হত্যা এবং ৩৯ জন কর্মীকে আহত করা হয়েছিল। পাকিস্তানী শাসকদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বর্বরতার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব বংলায় এককভাবে আওয়ামী লীগকে রায় দেয়। জণগণের রায়কে প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তানী শাসক গণহত্যা শুরু করলে বাঙালিরা সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং বিজয়ী হয়। নতুন রাষ্ট্রের দর্শনে অসাম্প্রদায়িকতা গণতান্ত্রিকতা সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি রাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ, দোষী রাজাকারদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুর হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক নিজেকে পুতুল রাষ্ট্রপতি করার পর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়ার কলকাঠিতে দেশ পরিচালনা শুরু হয়। খন্দকার মোশতাক থেকে বিচারপতি আবু সায়েম, পরে মেজর জিয়া নিজেই প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রশাসক হন। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার দালাল আইন বাতিল করে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতাবিরোধী খান এ সবুর ও শাহ্ আজিজুর রহমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়ে মুসলিম লীগ পুনরুর্জীবিত করে। স্বাধীনতাবিরোধী এই শাহ্ আজিজই পরে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৬ সালের ২৪ আগস্ট প্রথম ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগের ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী। এই চর্চায় আরো ছিল নিজামে ইসলামী, ইসলামী গণতান্ত্রিক দলসহ স্বাধীনতাবিরোধী আরো কয়েকটি দল। স্বাধীনতার বিপক্ষে শুধু অবস্থানই নয়, স্বাধীনতার পর পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির মাধ্যমে পৃথিবীর নানা দেশে বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় গোলাম আযমসহ অনেকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। জিয়ার আমলে ১৯৭৮ সালে ১১ জুলাই গোলাম আযম পাকিস্তানী পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জিয়া তার সামরিক শাসনামলে সামরিক ফরমান বলে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালু করেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি’র বৈধতা দেয়া হয়, যার ফলে শেখ মুজিবসহ ১৫ আগস্টের সকল হত্যার বিচারকে আইন দ্বারা বন্ধ করা হয়। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। মেজর জিয়ার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীও (সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া) তারই আদর্শে স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে জোট গঠন করেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে দেন। ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় থাকাকালে রাজশাহী অঞ্চলে জামাতের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা সন্ত্রাসী বাংলাভাইকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয়বারের শাসন আমলে মৌলবাদী জঙ্গিরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তেমনই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলে প্রকট হারে, ফলে অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। জঙ্গিরা বাংলা নববর্ষসহ বাঙালি ঐতিহ্যের ওপর একের পর এক হামলা করতে থাকে। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের ওপরই শুধু নয়, বিচারপতিদের ওপরে হামলা এবং হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে। একদিনে একই সময়ে ৬৩টি জেলায় ৫০০টির বেশি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জামাত-শিবিরের প্রশ্রয়ে। সেই সরকারের আমলে স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবিরসহ মধ্যযুগীয় বর্বরতার অনুসারী হেফাজতের নামে জ্বালাও পোড়াওকারী চক্রের ১৩ দফার প্রতি সংহতি জানিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার রেখে যাওয়া দল আজ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সাথে যেভাবে সখ্যতা গড়েছে তাদের ঐ দলটি মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়ে আর কতদিন পরিচিত হতে পারবে? এই প্রশ্নটা এখন অধিকাংশ মানুষের। শুধু ক্ষমতার জন্য একটি দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য আর মূলচেতনাকে উপেক্ষা, এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান স্টাইলে দেশকে নিয়ে যাওয়া, জাতির জন্য দূঃখজনক। ৩০ লক্ষ লোকের জীবন দান ও দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত ও সম্ভ্রম হানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া কিইবা হতে পারে? দেশর বৃহৎ দল হিসেবে বিএনপির প্রতি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন চিন্তার মানুষগুলি মুক্তিযুদ্ধের চেতানায় দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা করে। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিহার করা উচিৎ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে আফগান স্টাইলের সমাজ গঠন কারোরই কাম্য হতে পারে না। কারণ সেটি সুস্থ মানুষের সমাজ নয়।

যুদ্ধাপরাধের কারণে জামাতের কতিপয় নেতাসহ অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকরে জামাত কোণঠাসা হলে ধর্মব্যবসায়ী মৌলবাদীদের স্বার্থরক্ষায় হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে সংগঠিত হয় মৌলবাদীরা, অনেকটা নতুন বোতলে পুরাতন মদ ঢালার মতো অবস্থা। তাদের প্রয়াত নেতা আল্লামা শফি সাহেব ওরফে ‘তেতুঁল হুজুর’ মেয়েদের লেখাপড়া এবং পোশাক কারখানায় কাজ করতে নিরৎসাহিত করে বক্তব্যই শুধু দেয়নি, তাদের চারিত্রিক বিষয়েও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান করেছে। অথচ ঐ নারী কর্মীদের শ্রমের কারণেই বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। সম্প্রতি তাদের আরেক নেতা মহিলা নিয়ে রিসোর্টে বিনোদন করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পতিত হয় এবং নানা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। যা টেলিফোন কল ফাঁস হওয়ায় দেশবাসী জানতে পেরেছে। ওই নেতার এই ব্যক্তিগত অপরাধকে ঢাকতে ইসলামী জোসে রিসোর্টসহ অনেক বাড়িঘর ও স্থাপনায় হামলা করেছে। অন্ধ এই সকল কর্মী বাহিনী যে কত ক্ষতিকর, তা ১৯৭১ সালে যারা রাজাকারদের ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছে তারাই কেবল ধারণা করতে পারবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ক্ষমতায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে হেফাজতের মতো অন্ধকারের এই শক্তির লাগাম না ধরলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ রক্ষা করা কঠিন হবে। বিষয়টি সরকারসহ প্রগতিশীল চিন্তার সবাইকে ভাবতে হবে।

লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস, কেন্দ্রীয় কমিটি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.