দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হলে জনবান্ধব সরকার দরকার

মোহাম্মদ শাহ আলম  

বিশ্ব মহামারী করোনায় দেশ বিপর্যস্ত, চলছে নৈরাজ্য, সমন্বয়হীনতা, অব্যাবস্থা। ৮ই মার্চ ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, ২৫শে মার্চ ২০২০ সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকার ও সরকারি দল ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পরার পরও এই রোগের ভয়াবহতাকে গূরুত্ব না দিয়ে এবং WHO এর সাবধান বাণীকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে  ব্যস্ত থাকে। সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা করোনা রোগের ভয়াবহতা নিয়ে উপহাস ও বাগাড়ম্বর করতে থাকে, অদৃষ্টবাদী কথাবার্তা তাদের বক্তব্যে ফুটে উঠে। কোন কোন নেতা বলতে থাকে শেখ হাসিনা তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, করোনা বাংলাদেশে আসবে না।

করোনা মহামারীর ব্যাপকতা বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। দেশের স্বাস্থ্য  ও চিকিৎসা ব্যানবস্থার দৈন্যদশা বের হয়ে আসে। সরকারের উদাসীনতা ও প্রস্তুতিহীনতার কারণে সরকার অথৈই জলে পড়ে। সরকারের ট্যা কনিক্যাতল ও কাঠামোগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অবহেলা মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়। দেশের মানুষের মধ্যে  ভয়-ভীতি অনিশ্চয়তা, সন্ত্রস্ত ভাব ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ডাক্তার, নার্সরাও এই অপরিচিত রোগের ভয়াবহতায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার ও নিরাপত্তা কর্মী আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুাবরণ করতে থাকে। আত্নীয়-স্বজনরাও করোনা রোগে আক্রান্ত আত্নীয় স্বজন থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে ও রোগের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। স্বজনরা নিকট আত্নীয়দের দাফন-কাফনে অংশগ্রহণ থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখে। করোনা রোগী দাফন-কাফনেও বিভিন্ন মানুষ বাধা দিতে থাকে।

সরকার এই পর্যায়ে জাতীয় পরামর্শ কমিটি গঠন করে কিন্তু পরামর্শ কমিটির পরামর্শ উপেক্ষা করে ও পাশ কাটিয়ে চলতে থাকে। প্রথম থেকেই সরকার এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় কোনো জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় বিরত থাকে, এমনকি সরকার সামাজিক, বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মী ও পাড়া-মহল্লায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে অনীহা প্রকাশ করে। সম্পূর্ণভাবে এই ভয়াবহ মহামারী মোকাবেলায় প্রশাসন ও আমলার উপর ভর করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে ও তার কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। সরকার ২০২০ এপ্রিল মাসে হঠাৎ গার্মেন্টস কারখানা চালু করে গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

এই অবস্থায় মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে  পড়ে, বিশেষ করে শ্রমিক, কর্মজীবি, মেহনতি নিম্নবৃত্ত মানুষের চাকরিচ্যুতি ও বেকারত্ব বাড়তে থাকে। একদিকে করোনায় মৃত্যু ভয়, অন্যকদিকে জীবিকা হারিয়ে নিরন্ন থাকার ভীতি মানুষকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে। এই পটভূমিতে সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সুরক্ষার জন্যা এক লক্ষ বিশ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যা কেজ ঘোষণা করে। এই ক্ষেত্রেও সরকারের শ্রেণি বৈষম্যে র দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। ইতিমধ্যে  দেশের আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যো সীমার নিচে নেমে যায়, বর্তমানে মধ্য বিত্ত- উচ্চ মধ্য বিত্তও নিচে নামতে শুরু করেছে।

পাকিস্তান আমল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত খাদ্যছ বণ্টনের যে রেশনিং ব্যা বস্থা চালু ছিল তা অবাধ মুক্তবাজারপন্থি সরকারগুলো বাতিল করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে খাদ্যক বণ্টনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকার কারণে সরকারের খাদ্যি সহায়তা বণ্টনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। দেশ, জনগণ ও রাষ্ট্র ব্যাাবসায়ীদের হাতে যে জিম্মি সেটা উন্মোচিত ও জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠে। সরকার গত বার তেরো মাসে কয়েকবার লকডাউন দিয়েছে, যে লকডাউনগুলো ছিল আধাখ্যাসচড়া বা নড়েবড়ে। সরকারের লকডাউন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ইঁদুর-বিড়াল খেলা মানুষকে নিয়মমানার ক্ষেত্রে অভ্যাস্ত করে তোলেনি এবং মানুষ অভ্যরস্ত হয়ে উঠেনি, সরকার এইখানে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এর মূল কারণ হলো লকডাউন কার্যকরি করার ক্ষেত্রে সরকারের দোদুল্যমানতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব। মানুষের নিয়মমানার ক্ষেত্রে এই অরাজকতা ও নৈরাজ্যু এখনো চলছে-এর মধ্যা থেকে এখনো দেশ বের হতে পারেনি। আরেকক্ষেত্রেও সরকার উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে, বিশেষ করে কিছু মোল্লা-মৌলভীদের ধর্মীয় সমাবেশ ও ফেইসবুকে নিয়মমানার দরকার নাই, মাস্ক পড়ার দরকার নাই, করোনা মুসলমানদের জন্যদ আসে নাই, কাফেরদের জন্যর এসেছে, এই করোনা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, বিজ্ঞান বহির্ভূত এই অপপ্রচার মানুষকে অদৃষ্টবাদী করে তোলে এবং নিয়মভঙ্গে উৎসাহিত করে, এই অপপ্রচার বন্ধ করতেও সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, এখনো এই বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব সমাজে বিরাজ করছে।

পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি সরকার নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যভ তার সমস্ত নীতি ও কর্মকাণ্ড জনগণের herd immunity’র উপর অর্থাৎ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে এবং জনগণের উপর নিয়ম না মানার দোষ ও দায় চাপানোর কৌশল গ্রহণ করে, যে কৌশল এখনো সরকার অব্যাহত রেখেছে।

সরকার যে লুটেরা ব্যাবসায়ীদের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল সেটি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে বেক্সিমকোর টিকা আমদানির চুক্তিতে প্রমাণ হয়। সরকার যদি জনগণের সরকার হতো তাহলে সরকার সরকারি পর্যায়ে এই চুক্তি করতে পারতো এবং একক কোম্পানির উপর নির্ভর না করে বহু টিকা উৎপাদনকারী দেশ ও বহুমুখী উদ্যোনগ গ্রহণ করতে পারতো, তাহলে বর্তমানে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেল দেশ ও জাতি পড়তো না।

বস্তুত প্রথম থেকেই সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সমন্বয়হীনতা, সময়ের পদক্ষেপ সময়ে না নেয়া, আশু ও দূরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও ঘাটতি এখনো আমাদের দেশ, জাতি ও জনগণকে এবং অর্থনীতি ও উৎপাদনকে করোনার ভয়াবহ রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে পারেনি। সরকার, প্রশাসন ও সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ। দুর্নীতি রন্ধ্র রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির ভয়াবহ রূপ আমরা দুর্বৃত্ত শাহেদ গ্রেফতারের মধ্য্দিয়ে দেখেছি। এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নিয়ে স্বাস্থ্য  মন্ত্রণালয়ে যে তুলকালাম ঘটনা ঘটেছে তা অবিশ্বাস্য। এই ঘটনা দেশে-বিদেশে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত করেছে। মানুষের বাক, ব্যা ক্তি, সংবাদপত্র ও বিচারবিভাগে স্বাধীনতা চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত এই ঘটনা তা প্রমাণ করে। কেনো দেশের এই অবস্থা? কেনো এইরকম ঘটনা ঘটতে পারছে? তা আমরা একটু খতিয়ে দেখলে বুঝতে পারবো। দেশে বছরের পর বছর জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র নাই, অনেকদিন ধরে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারছে না, ফলে জনগণের হাতে প্রশাসন ও রাষ্ট্রের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নেই। এই কারণে আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসন সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। গত দুইটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাদের উপর ভর করে হওয়ার ফলে তারা রাষ্ট্রের দণ্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেছে। এদের উপর রাজনীতি, রাজনীতিবিদ, সরকার ও সংসদের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না, তারা অবাধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট ও দুর্নীতিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এরকম একটি প্রশাসন ব্যাবস্থা দিয়ে দেশ চালানো কঠিন।

দেশের এই অরাজক ও নৈরাজ্যজনক অবস্থা, লকডাউন কার্যকর করা ও করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে যে বিষয়গুলোর উপর নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে হয়, তা হলোঃ

১) মানুষের চিকিৎসার সকল ব্যা বস্থা, টেস্ট, ভ্যাক্সিন, সুলভে ঔষধ সরবারহ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। স্বাস্থ্যা ও চিকিৎসা ব্যা বস্থার স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, স্বাস্থ্যচ ও চিকিৎসা ব্যা বস্থা পরিপূর্ণভাবে জাতীয়করণ করতে হবে। স্বাস্থ্য্ ও চিকিৎসা বাজেট আন্তর্জাতিক মান ও পর্যায়ে উর্ওীর্ণ করতে হবে।

২) নিম্নবিত্ত মানুষের জন্যক ক্যাুটাগরি ভাগ করে গ্রাম-শহরে স্থায়ী রেশনিং ব্যা বস্থা চালু করতে হবে।

৩) স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্যে র নিরাপত্তা জাল এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা যায়, জনগণ যেনো ভরসা ও সাহস পায়, জনগণের মধ্যে  যেনো দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা না দেয়।

৪) আশুকাজ হিসেবে যেগুলোতে নজর দেয়া প্রয়োজন তা হলো, স্বাস্থ্যবিধি মানার কার্যকরি ব্যারবস্থা গ্রহণ এবং কয়েকমাসের মধ্যে্ দেশের সকল নাগরিকের টিকার ব্যা বস্থা করে দেশের উৎপাদন, ব্যা বসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষাসহ সকল কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।

৫) ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য্ ও চিকিৎসা ব্যাাবস্থার সাথে জড়িত সমস্ত টেকনিক্যাল কর্মীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তাদের জন্যা বিশেষ প্রনোদণা ও ভাতার ব্যা বস্থা করা। দেশের পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য অনুরুপ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা। স্কুল, কলেজ এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, গীর্জায় সরকার ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোনগে মাস্ক, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যায়বস্থা করা।

৬) পর্যাপ্ত অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবারহের পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা।

উল্লেখিত কাজগুলো করতে পারলে দেশ-সমাজ ও জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু এই কর্মকাণ্ড, কাজগুলি হতে পারে দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও জনবান্ধব সরকার ক্ষমতায় থাকলে, যা আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে বহাল আছে অবাধ মুক্তবাজার পন্থী লুটেরা ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা নির্ভর সরকার।

তাই দেশ ও জনগণকে সংকটমুক্ত করতে হলে বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জনগণের পাশে থাকার সাথে সাথে সরকারের সকল অগণতান্ত্রিক ও অব্যােবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে হবে, লড়তে হবে ভাত-ভোট-গণতন্ত্র ও চিকিৎসার জন্যর। গড়তে হবে লুটেরা শাসক শ্রেণির বিকল্প, জনগণের বিকল্প শক্তি।

এইরকম একটি শক্তি ক্ষমতায় আসলে দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.