দেউলিয়াত্বের পথে পাকিস্তানও?

শ্রীলঙ্কার পরে যেকোনো সময় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে দেউলিয়াত্বের পরিণতি বরণ করে নিতে হতে পারে পাকিস্তানকে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ মুহূর্তে শ্রীলংকার পরিণতির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা দেশগুলোর একটি হলো পাকিস্তান।

পাকিস্তানি রুপি মুদ্রাবাজারে ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। গত দুই সপ্তাহে মুদ্রাটির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ২২৮ রুপি ছাড়িয়েছে প্রতি ডলারের বিনিময় হার।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের হাতে রিজার্ভের পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ৯৩৯ কোটি ডলারে, যা দিয়ে দুই মাসেরও আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব না।

অপরদিকে এক বছরের মধ্যে ২ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে দেশটিকে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বেইলআউট হিসেবে কিছু অর্থ পাওয়া গেলেও তা খুবই অপ্রতুল।

দৈনিক বণিকবার্তা (অনলাইন) –এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রদান করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান সংকট মোকাবেলার জন্য আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে ৬০০ কোটি ডলার পাচ্ছে পাকিস্তান। এ অর্থ একবারে হাতে পাবে না দেশটি। ১৪ জুলাই হওয়া চুক্তির ভিত্তিতে কয়েকটি কিস্তিতে দেশটিকে এ ঋণের অর্থ দেবে আইএমএফ। এর মধ্যে প্রথম কিস্তিতে দেয়া হচ্ছে ১১৭ কোটি ডলার। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ অর্থ হাতে পাবে পাকিস্তান। তবে এ অর্থ দেশটির চলমান সংকট মোকাবেলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে সন্দিহান খোদ পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকরাও। তাদের ভাষ্যমতে, শুধু ঋণ পরিশোধ নয়; খাদ্য ও জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় জরুরি পণ্য আমদানি চালু রাখার পাশাপাশি দেশটির সরকারের চলতি হিসাব ঘাটতি পূরণের জন্যও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। বর্তমান রিজার্ভ ও আইএমএফের ঋণের পুরো অর্থ যোগ করেও এ প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না।

পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল সম্প্রতি দেশটির এক বাজেট সেমিনারে জানান, আগামী এক বছরে পাকিস্তানের মোট প্রয়োজন পড়বে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের দরকার হবে শুধু ঋণ পরিশোধের জন্য। চলতি হিসাবের ঘাটতি অর্থায়নে প্রয়োজন পড়বে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। বাকি ৮০০ কোটির দরকার হবে রিজার্ভ তহবিল বজায় রাখার জন্য।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রীলংকার মতোই দেউলিয়াত্বের পথে হাঁটছে পাকিস্তান। কলম্বো নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আগের দিনগুলোয় শ্রীলংকায় যেসব লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, তার সবই এখন পাকিস্তানে উপস্থিত। পার্থক্য হলো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ দেউলিয়াত্ব আরো মারাত্মক পরিণতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে। দেশটির জনসংখ্যা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং পারমাণবিক শক্তি হওয়ার কারণে পাকিস্তানের দেউলিয়াত্ব স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভয়াবহ সব ঘটনাপ্রবাহের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আসকারি রিজভির মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পতনের প্রভাব হবে শ্রীলংকার চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। আমি মনে করি, বিদেশী শক্তিগুলো পাকিস্তানের অর্থনীতির পতনের ধারাবাহিকতায় সম্ভাব্য দুর্যোগগুলোর প্রভাব থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইবে। লন্ডনভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে সম্প্রতি তিনি এ মন্তব্য করেন।

দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার এখন ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (পিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৩২ শতাংশের বেশি। খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম এখন তরতর করে বেড়ে চলেছে। আইএমএফের ঋণ চুক্তির শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে পাকিস্তান সরকার। চরম মূল্যস্ফীতির মধ্যে এমন পদক্ষেপ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এ মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশটির ক্যাব, রেস্তোরাঁ ও হোম ডেলিভারি সেবা একপ্রকার বন্ধ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও।

একই সঙ্গে জরুরি পণ্য আমদানিও কঠিন হয়ে পড়েছে দেশটির জন্য। রিজার্ভের দুরবস্থা ও মুদ্রার বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের খোলা এলসিতে কোনো ধরনের ডিসকাউন্ট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হলো এক্ষেত্রে সমস্যার উৎস পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা নন, উৎস হলো দেশটির সরকার। তারা এখনো রুপির ক্রমাগত পতন ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। রিজার্ভের অভাব থাকায় পাকিস্তানি ব্যাংকগুলোর কাছে ইস্যুকৃত এলসি বাবদ পাওনা অর্থ হাতে পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে বিদেশী ব্যাংকগুলোর। এ অবস্থায় পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট কোনো লেনদেনেই জড়াতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।

এতে খাদ্য ও নিত্যপণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপাকে পড়েছে দেশটির শিল্প উৎপাদন খাতও। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর লৌহ ও ইস্পাত শিল্প একপ্রকার ধসে গিয়েছে।

ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে পাকিস্তানিদের মধ্যে এখন ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর থেকে এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাধারণ পাকিস্তানিরা। সম্প্রতি পাঞ্জাব প্রদেশের উপনির্বাচনে নিজ দলের ভূমিধস বিজয়ের পর আগাম জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। একই সঙ্গে এ নির্বাচনের ফলাফলে শাহবাজ শরিফ সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো পাঞ্জাবের উপনির্বাচনের ফলাফল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দেবে না ঠিকই, কিন্তু দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করছে। দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ মুহূর্তে আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে আইএমএফের প্যাকেজ আটকে যাওয়ারও জোর আশঙ্কা রয়েছে।

অতীতে অর্থনৈতিক সংকটের সময় চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। তবে এবার দেশটির কূটনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সৌদি আরবের সঙ্গে ইমরান খানের আমলে সৃষ্ট দূরত্ব এখনো ঘোচানো সম্ভব হয়নি। একই কথা প্রযোজ্য ইউএইর ক্ষেত্রেও। ইমরান খান সরকারের পতনের পর থেকে পাকিস্তানের অল ওয়েদার ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচিত চীনও এখন ইসলামাবাদকে নিয়ে আস্থার সংকটে ভুগছে। পাকিস্তানের স্থানীয় ভাষ্যকারদের মতে, বর্তমান সংকট মোকাবেলা করতে পাকিস্তানের জন্য এখন সৌদি আরব, ইউএই ও চীনের আস্থা পুনরুদ্ধার ও দেশগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগানোর বিষয়ে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বর্তমান দুর্যোগের দিকে ঠেলে দেয়ার পেছনে দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদেশী ঋণের ভিত্তিতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেছে পাকিস্তান। দেশটিতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার মেগাওয়াটে। আবার বিতরণ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এ সংকটকে বর্তমানে আরো প্রকট করে তুলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। যদিও বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ (ক্যাপাসিটি চার্জ) পরিশোধ করতে হচ্ছে পাকিস্তান সরকারকে।

দেশটির উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা পাকিস্তান সরকার। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো উৎপাদন ছাড়া বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জের পাশাপাশি নির্দিষ্ট হারে মুনাফাও দেয়া হয়। এসব ব্যয় টানতে গিয়ে এখন খাতটিতে ভর্তুকি বাবদ প্রদেয় অর্থ পরিশোধ করাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে পাহাড়সম সার্কুলার ডেবটের বোঝা টানতে হচ্ছে পাকিস্তান সরকারকে।

সার্কুলার ডেবট মূলত একধরনের সরকারি ঋণ। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি বাবদ প্রদেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে কোনো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ঋণের যে দুষ্টচক্র তৈরি হয়, সেটিকেই অভিহিত করা হয় সার্কুলার ডেবট হিসেবে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্য অর্থ পাওয়া না গেলে বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি বা স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে (আইপিপি) প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এর ধারাবাহিকতায় উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। এ সার্কুলার ডেবট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা গোটা বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এবং এর ধারাবাহিকতায় সার্বিক অর্থনীতিতেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। দেশটিতে সার্কুলার ডেবটের পরিমাণ এখন আড়াই লাখ কোটি পাকিস্তানি রুপির বেশি। গ্যাস খাতের সার্কুলার ডেবট যুক্ত হলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ কোটি রুপিতে।

বিদ্যুৎ খাতের সার্কুলার ডেবট নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিচ্ছে আইএমএফও। পাকিস্তানের সঙ্গে সংস্থাটির ঋণচুক্তির শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সার্কুলার ডেবট কমাতে হবে। এতে সম্মতি জানালেও এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি পাকিস্তান সরকার।

সূত্র: দৈনিক বণিকবার্তা (অনলাইন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.