দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও, বিকল্প গড়ো

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন

দেশ আজ মহাসংকটে, দুঃশাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত সাধারণ জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষেরই স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশে মানুষের মতো বাঁচবে। দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা, শোষণ-বৈষম্যের ঘটবে অবসান। রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর সমান অধিকার থাকবে সাধারণ মানুষের, কৃষক পাবে তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম, শ্রমিক পাবে ন্যায্য মজুরি, ক্ষেতমজুর পাবে সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা, ঘুচবে বেকারত্ব, শিক্ষার্থী পাবে শিক্ষার সমঅধিকার, সাধারণ মানুষ পাবে ন্যায় বিচার ইত্যাদি। কিন্তু স্বাধীনতালাভের মধ্যদিয়ে মুক্তির সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।

দেশে বারংবার শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু যারাই দেশ শাসন করেছে তারাই প্রতিষ্ঠিত করেছে লুটেরা ধনিক শ্রেণি। এই ধনিক শ্রেণির শাসন-শোষণের ফলশ্রুতিতে আজ বাংলাদেশ গণতন্ত্রহীনতা ও লুটপাট-দুর্নীতির চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও আধিপত্যবাদের তাবেদারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের সম্পদ ১ ভাগ মানুষের কাছে কুক্ষিগত হয়েছে। বাকি ৯৯ ভাগ মানুষ ১ ভাগের শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনা করছে।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বলে দাবিদার বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে অহর্নিশ বেঈমানি করছে। মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশ পরিচালনা না করে উল্টোদিকে পরিচালনা করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অধীনস্থ নয়া উদারবাহী নীতি ও দর্শন গ্রহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। অর্থনীতিতে অবাধ লুটপাটের ধারা অনুসরণ করছে, তাতে বাড়ছে শোষণ-বৈষম্য, মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা। অর্থনীতির ক্ষেত্রে লুটপাটের ধারা অব্যাহত রাখতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে, বর্তমান সরকার রাতের অন্ধকারে জনগণের ম্যান্ডেট না নিয়েই জোর করে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। ফলশ্রুতিতে জনগণের প্রতি সরকারের দায়-দায়িত্ব নেই বললেই চলে। লুটেরা ধনিক শ্রেণি, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর নির্ভর করে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে। আর তাতে করে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার জনগণ থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র ও সরকারের স্বৈরাচারী ভূমিকা, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও কার্যকলাপ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ভয়-আতংকের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। সরকারের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই গুম-হত্যা ও নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে।

‘আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র’ এমন ধারণা সামনে নিয়ে এসেছে বর্তমান সরকার। এখন প্রশ্ন হলো- উন্নয়ন কোথায়? হ্যাঁ, লুটপাট-দুর্নীতির উন্নয়ন হয়েছে। মেগা প্রকল্পের নাম মেগা দুর্নীতি হচ্ছে। এক শ্রেণির লোকেরা হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করছে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেছে না। সরকারের পক্ষ থেকে এদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। লুটপাট-দুর্নীতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, তথাকথিত সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের মন্ত্রীকে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে তো পুকুরচুরি হয় না, সাগর চুরি হয়! এটা তো আমরা সাম্প্রতিককালে দেখেছি। ক্যাসিনো বাণিজ্য, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, বালিশ-কাণ্ড, পদা-কাণ্ড ইত্যাদি ঘটনার মাধ্যমে ব্যাপক লুটপাটের চিত্র মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

করোনাকালীন দেশে যখন প্রায় তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে গিয়েছে, আড়াই কোটি মানুষ বেকার হয়েছে, তখন নতুন করে ১৭ হাজার ২৯৩ জন কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে। এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের মদত দিচ্ছে। লুটপাটের অর্থনীতি জন্ম দিচ্ছে লুটপাটের রাজনীতির। তাই রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। রাজনীতিবিদেরা ব্যবসায়ী হয়েছে আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হয়ে গেছে। তথাকথিত বর্তমান জাতীয় সংসদে ২৬০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যারা ব্যবসায়ী। রাজনীতিও আজ গভীর সংকটে নিপতিত। বহুদিন ধরে চলতে থাকা রাজনীতির বাজারিকরণ নীতি-আদর্শ নির্বাসিত করে বাজারি লেনদেন, লাভ-লোকসানের আত্মস্বার্থবাদী ভাবনায় নিমজ্জিত করার মতো প্রক্রিয়াগুলো রাজনীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছে। এখন একটি ‘বিরাজনীতিকরণের’ দলে দেশে কার্যত রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও মুষ্টিমেয় লুটেরা ধনিকদের এক প্রকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তির মদত ও ছত্রছায়া ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকটের পাশাপাশি চলতি রাজনীতির এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে দেশের রাজনীতি এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে রয়েছে লুটেরা ধনিক শ্রেণির শোষণ-শাসন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শুধু রাজনীতি-অথনীতিকে ধ্বংসই করেনি, সাম্প্রদায়িক শক্তিকেও মদত দিচ্ছে। এই শক্তি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ ডেকে এনেছে। অতীতে আমরা বিএনপিকে দেখেছি জামাতকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করতে, আর বর্তমান আওয়ামী লীগ হেফাজতকে সাথে নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে। এই সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির একধরনের সখ্যতা রয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দার দেশ পরিচালনা করছে। দেশে চলছে গণতন্ত্রহীনতা এবং বেড়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিপদ। সাধারণ মেহনতি মানুষ বর্তমান সরকারের এই দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়।

এই দুঃশাসন হঠাতে আজ কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিশীল শক্তিকেই এগিয়ে আসতে হবে। ধারাবাহিকভাবে বর্তমান সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখতে হবে। নিপীড়ন নিযার্তন আঘাত আসবে, তা মোকাবিলা করার শক্তি-সাহস কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই গড়ে তুলতে হবে। দুঃশাসন হঠানোর সংগ্রামের পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষক মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকেও আজ অগ্রসর করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, শুধু দুঃশাসন হঠালেই চলবে না, ব্যবস্থা বদলের সংগ্রামও চলবে। দুটোকেই একযোগে চালাতে হবে। কেননা, লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসনের সৃষ্টি করে, যে ব্যবস্থা বদল জরুরি। বিগত সময়কালে বারংবার শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং শোষণ- বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে। গরিব আরও গরিব হয়েছে ধনী আরও ধনী হয়েছে। লুটেরা ধনিক শ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলো পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে। এদের শ্রেণিচরিত্রের কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি।

দুঃশাসন হটানো ব্যবস্থা বদলানোর সংগ্রামে জয়ী হতে হলে প্রধানত বামপন্থি কমিউনিস্ট প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তুলে গণসংগ্রাম ও গণআন্দোলনের ধারাকে শক্তিশালী করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে দুঃশাসন হটানো এবং শ্রেণিসংগ্রাম সমান্তরালভাবে চালাতে হবে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করলে আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে না।

দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ একটি বাম-বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠার প্রত্যাশায় রয়েছে। মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেই হবে। অন্য আর কোনো পথ নেই। তাই আজ সারাদেশে আওয়াজ উঠুক- দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও, বিকল্প গড়ো।

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.