দীর্ঘ ছায়া ফেলে গেছেন মৃত্যুহীন ম্যান্ডেলা

আহমেদ রফিক

(১৮ জুলাই। দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর সংগ্রামের প্রতিক, বিশ্বের কিংবদন্তী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার আজ জন্মদিন। জাতিসংঘ তাঁর জন্মদিন ১৮ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক নেলসন ম্যান্ডেলা দিবসহিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একতা টেলিভিশনের পক্ষ থেকে মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা। লেখাটি ‘সাপ্তাহিক একতা’-য় পুর্ব প্রকাশিত।– নির্বাহী সম্পাদক, একতা টেলিভিশন।)  

নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত গ্রামের (গ্রামের নাম ‘কুনু’) মাঠে-মাঠে নদীর ধারে মনের আনন্দে ছুটে বেড়ানো শিশু নিজেকে ‘মুক্ত স্বাধীন’ মনে করলেও ভিন্ন সত্য দ্রুতই তার মনে ধরা দেয়। পারিবারিক সুবাদে প্রতাবশালী ঐতিহ্য সত্ত্বেও কিশোর ম্যান্ডেলার বুঝতে বাকি থাকে না, এদেশে ‘শেতাঙ্গরা ঈশ্বরপ্রতীম। তাদের ভয় ভক্তি করে চলাই রীতি।’বলতে হয় ‘স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে, এদেশ তোদের নয়।’তবে পরাধীন ভারতের সঙ্গে পরাধীন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম প্রভেদ সেখানে গোত্রে-গোত্রে প্রতিযোগিতা, কখনও সহিংসতা চিরাচরিত। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের পাশাপাশি কালো বা বাদামি ভারতীয়র সংখ্যা কম নয়। কিন্তু শাসকদের চিরাচরিত ‘ভাগ কর শাসন কর’নীতি সত্ত্বেও কালো ও বাদামিদের মধ্যে সহিংসতার প্রকাশ তেমন ছিল না, যেমন দেখা গেছে একই কারণে ভারতে দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতার চেয়েও সহিংসতার অগ্নিরূপ।

বৃটিশ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় শেতাঙ্গ শাসনের প্রাবল্য এতটাই বহুমাত্রিক ছিল যে ব্রিটিশ শিক্ষা, ব্রিটিশ সহবত, ব্রিটিশ সংস্কৃতি ও তার রাজনৈতিক চাপ স্থানীয় আফ্রিকান ঐতিহ্যে জবরদস্তিমূলক প্রভাব রাখে এবং তা এতটাই যে স্কুল পড়–য়া ছাত্রের নামও তা থেকে মুক্ত থাকে না। পারিবারিক নামের সঙ্গে স্কুল থেকে দেয়া ইংরেজি নাম যেন দ্বৈতসত্ত্বার প্রতীক। আফ্রিকান ‘বিদঘুটে’নাম উচ্চারণে ‘মিশেদর’(শিক্ষিকাদের) বড় অসুবিধা, জিবে আসে না, তাই এ ব্যবস্থা। ম্যান্ডেলার মূল নামের সঙ্গে বার্তি নাম ‘নেলসন’।

কথাগুলো একটু রসিয়ে উল্লেখ করেছেন ম্যান্ডেলা তাঁর আত্মজীবনীতে। ব্রিটিশ আভিজাত্য, ব্রিটিশ উচ্চমন্যতা দক্ষিণ আফ্রিকায় (গোটা আফ্রিকা মহাদেশেই) ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নৈতিক জীবনে এতটা প্রবল ও উন্নাসিক প্রভাব রাখে যে বর্ণভেদ (শেতাঙ্গ বনাম কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি) সেখানকার শাসননীতি হয়ে দাঁড়ায়- সমাজের সর্বস্তরের ও রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতিতে। মধ্যযুগে ইউরোপীয় সমাজে কুষ্ঠরোগীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো ব্যবস্থার শিকার বিপুল সংখ্যক স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ ও তাদের সহযাত্রী বাদামি রঙ্গের মানুষ। এদিক থেকে ভারত ভাগ্যবান ও তার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির কারণে।

অবশ্য এর ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। অত্যাচার যত প্রবল ও ব্যাপক, তার প্রতিক্রিয়া তত তীব্র ও দ্রুত হয়ে থাকে। আফ্রিকার একাধিক দেশ তার প্রমাণ। বিশেষ করে রোডেশিয়া (বর্তমানে ‘জিম্বাবুয়ে’) ও দক্ষিণ আফ্রিকা। অথচ সুসভ্য (!) ভারতীয়দের ব্রিটিশ কবচা থেকে মুক্ত হয়ে স্বশাসন পেতে প্রায় ২০০ বছর লেগে গেছে। অর্ধেক সময়ও লাগেনি দক্ষিণ আফ্রিকার। তবে সেজন্য তাদের মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। হত্যা, রক্ত, নির্যাতন ও চরম ঘৃণা-অবজ্ঞার মতো অনেক কিছু সহ্য করে তবেই না স্বশাসন।

সে স্বশাসন আদায়ের প্রধান সংঘবদ্ধ শক্তি ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (সংক্ষেপে ‘এএনসি’) নামের সংগঠন, সঙ্গে ‘প্যান-আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেস’ (পিএসি) এবং ছোঁখাটো কমিউনিস্ট পার্টি। এছাড়া গোত্র প্রভাবিত ভিন্নমত, ভিন্ন দলের অস্তিত্বও ছিল। ছিল সংখ্যালঘু শেতাঙ্গদের ক্ষমতাশালী ‘ন্যাশনাল পার্টি, বলা যায় শাসকদল। এমন রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল স্থানীয় তরুণের প্রতিক্রিয়া প্রকাশই স্বাভাবিক। ম্যান্ডেলার পক্ষেও এটা ছিল স্বাভাবিক।

তাই শৈশবে নিজেকে ‘জন্মস্বাধীন’ (‘বর্ণ ফ্রি’) মনে হলেও তরুণ ম্যান্ডেলার বুঝতে বাকি থাকে না দেশটা স্বাধীন নয়। তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে বিদেশাগত অস্ত্রধারী শক্তি। অস্ত্রের জোরে, দেশের খনিজ ও ভূমি সম্পদের অর্থনৈতিক দাক্ষিণ্যে নিতান্ত সংখ্যালঘু হয়েও তারা এদেশ শাসন করছে। ইতিহাস থেকে ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তরুণ ছাত্র ম্যান্ডেলার মনে এসব নিয়ে প্রবল বিতৃষ্ণা শাসকশ্রেণির প্রতি। প্রবল আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়- এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সে জন্য দরকার লড়াই, ঐক্যবদ্ধ লড়াই। যোগ দেন জাতীয় কংগ্রেসের যুব শাখায়। আন্তরিকতা ও শ্রমে নেতৃত্ব এসে যায় হাতে। শুধু নিজের স্বাধীনতাই নয়, জনগণের ও তার প্রিয় সব মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্সক্ষাই প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় আন্দোলনের পথে। শান্তিপ্রিয় আইনজীবী নেলসন ম্যান্ডেলা ক্রমে হয়ে ওঠেন এএনসির প্রধান ব্যক্তি। সঙ্গে সর্বত্যাগী একাধিক সহকর্মী। বন্ধু। যারা দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জনে দ্বিধান্বিত নন।

এভাবেই একটি সুবোধ তরুণ দৃঢ়পণ স্বাধীনতা লড়াইয়ের নেতা হয়ে ওঠেন এই আফ্রিকান বালক। নেলসন ম্যান্ডেলা বিপ্লবী নন এবং সে অর্থে চে ও গুয়েভারা নন। তাই বলে তিনি শান্ত মেজাজের হয়ে অহিংস গান্ধীবাদী নন। প্রয়োজনে সশস্ত্র ও সংগ্রামে বিশ্বাসী। তাই এক পর্যায়ে সঙ্গোপনে দেশত্যাগ করে ইথিওপিয়া ও মরোক্কোতে যান সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে (১৯৬২ সালে)। চেনা যায় শান্তিপ্রিয়, শান্তিবাদী ও ম্যান্ডেলাকে- যিনি পরবর্তী সময়ে নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন যৌথভাবে, দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্কের সঙ্গে (১৯৯৩ সালে)।

এ যাত্রায়, এ অ্যাডভেঞ্চারে কপাল মন্দ। তাই দেশে ঢুকতে যেয়ে ধরা পড়ে যান নাটাল সীমান্তে (১৯৬২ সালে)। বিনা পাসপোর্টে দেশ ছাড়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় (৭ নভেম্বর)। এর আগে অনেক ঘটনা। যেকোনো প্রকার আন্দোলন বন্ধ করতে বদ্ধ পরিকর সন্ত্রাসী শেতাঙ্গ প্রশাসন এএনসিকে এক টুকরো জমি ছেড়ে দিতেও নারাজ। তাই এ সংগঠনকে নিষিদ্ধ রাখতে সব রকম ব্যস্ততা। এর মধ্যেও ১৯৫৫ সালে কংগ্রেসে ‘মুক্তি সনদ’ (‘ফ্রিডম চার্টার’) গৃহিত হয়। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এক দোকানের ছাদ থেকে সহকর্মী বন্ধুদের নিয়ে এ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন ম্যান্ডেলা। তাদের মাথার উপর তখন হুলিয়া।

প্রত্যক্ষ কারণ ছাড়াই ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১৫৫ জন নেতা-কর্মীসহ গ্রেপ্তার হন ম্যান্ডেলা। সাড়ে চার বছর ধরে এ বিচারপ্রক্রিয়ার ভণ্ডামি চলে। এরপর নানা সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালের মার্চে দেশের জরুরি অবস্থা জারি, ম্যান্ডেলা আঁক এবং এপ্রিল মাসে এএনসি ও পিএসি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বুঝতে পারা যায় সরকারি দমননীতির মাত্রা। পূর্বোক্ত বিচারের প্রহসন শেষে প্রমাণের অভাবে ম্যান্ডেলাসহ অভিযুক্তদের মুক্তি (১৯৬১ সালে)।

অবস্থা বিবেচনায় ম্যান্ডেলা আত্মগোপনে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এএনসির সশস্ত্র সংগ্রাম শাখা গঠিত হয়, ম্যান্ডেলা এ শাখার প্রথম সর্বাধিনায়ক। শুরু হয়ে যায় বিস্ফোরণধর্মী কর্মকাণ্ড। বলতে হয় শ্বেত সন্ত্রাসের জবাবে কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাস। পরিস্থিতি শান্তিপ্রিয় ম্যান্ডেলাকে কোথায় ঠেলে নিয়ে গেছে, তা ভেবে দেখার মতো। এবং সেই সঙ্গে তুলনাও চলে ভারতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বিচক্ষণতা ও অদূরদর্শিতার দিকগুলো।

এরই মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পথে ম্যান্ডেলার গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। এবার দুই, চার, পাঁচ বছর নয়- রবেন আইল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদী নির্বাসন-কারাদণ্ডে দণ্ডিত ম্যান্ডেলা। ক্রমে শীর্ষ নেতারাও গ্রেপ্তার তাদেরও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে রবেন আইল্যান্ড কারাগারে প্রেরণ করা হয় (১৯৬৪ সালে)। এরই মধ্যে ম্যান্ডেলার মা (১৯৬৮ সালে) ও বড় ছেলে থেম্বির (১৯৬৯ সালে) মৃত্যু হন। কিন্ত তাদের শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়নি প্রশাসন। কারাগারে বন্ধুদের উপস্থিতি তার জন্য এক ধরনের শান্তি। তাছাড়া রাজনৈতিক আলোচনা ও সিদ্ধান্তেরও সুযোগ মিলে। বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন উল্লেখযোগ্য ওয়াল্টার, সিসুল, আহমেদ কাথ্রাডা, গোভসন এমবেকি, ডেনিস গোল্ডবার্গ, রেমন্ড মাহ্লাবা প্রমুখ।

কারাগারে কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা আত্মজীবনী লিখেছেন সময় কাটাতে, যেমন- ভারতের জওহরলাল নেহেরু। এদিকে নেলসন ম্যান্ডেলাও ১৯৭৫ সাল থেকে গোপনে তাঁর আত্মজীবনী লেখেন, যা তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য বিষয় হয়ে থাকবে এবং তা আমাদের জন্যও- এই আদর্শবাদী মানুষটিকে জানতে ও বুঝতে। এমনকি তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন ও রাজনীতি বোঝারও কিছুটা সহায়ক হবে এ আত্মজীবনী এবং তাঁর সম্পর্কে লেখা গ্রন্থাদি।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রচণ্ড বর্ণবাদী শাসন ও দীর্ঘস্থায়ী কঠোর দমননীতি যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। তাই চেষ্টা চলে চাপ সৃষ্টি করে ওই শ্বেত শাসনকে নমনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার। কিন্তু সহজে নমনীয় হওয়ার পাত্র নন তাঁরা। তবু প্রেসিডেন্ট পি ডাব্লিউ বোথার প্রস্তাব শর্ত স্বাপেক্ষে ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেয়ার। এএনসি তাদের সন্ত্রাসবাদী নীতি পরিহার করবে। ম্যান্ডেলা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন (১৯৮৫ সালে)। তাঁর ওই ঘোষণা সোয়েটর বিশাল র‌্যালিতে পাঠ করেন তাঁর কন্যা জিনজি। বাপকা বেটি!

শ্বেতাঙ্গ শাসকশ্রেণিও স্বস্তিতে ছিল না। একে তো দেশের শ্বেতাঙ্গদের বেপোরোয়া মনোভাব, কৃষ্ণাঙ্গদের অনুরূপ প্রতিক্রিয়া, অব্যাহত সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলায় অর্থনীতির উপর চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ। বিশ্ব অঙ্গন থেকে একঘরে হওয়ার অবস্থা জেদি বোথাকে নমনীয় হতে বাধ্য করে। এএনসির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ৩০ বছর পর ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর মিমাংসার লক্ষ্য আলোচনা কমা আর আলোচনার ম্যান্ডেলার সঙ্গে প্রশাসনের। বোথার উত্তরসূরি ডি ক্লার্কের কারণে সমঝোতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

শেষে পর্দা উঠল। দিনটি ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০ সাল। প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্কের ঘোষণায় এএনসি, পিএসি ও কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এর পর নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তি কারগার থেকে ২৭ বছরের বন্দিদশার পর ১১ ফেব্রুয়ারি (১৯৯০ সালে)। ১৯৯১ সালে এএনসির জাতীয় সম্মেলনে মুক্তি সংগ্রামী ম্যান্ডেলা এএনসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য ম্যান্ডেলা ও ডি ক্লার্ককে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় এই প্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতির জাতীয় নির্বাচন (২৭ এপ্রিল, ১৯৯৪) অনুষ্ঠিত হয়। একজন কৃষ্ণাঙ্গ নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট! বিশ্ব রাজনৈতিক মহল থেকে ম্যান্ডেলা ও ডি ক্লার্ক উভয়কে উষ্ণ অভিনন্দন তাঁদের বিচক্ষণতা ও সহিষ্ণু রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য। প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দুই ডেপুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে- প্রথমজন থাবো এ এমবেকি, দ্বিতীয়জন ডি ক্লার্ক। লক্ষ্য শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ সংঘাত ঠেকানো। তবু তা পারা গেছে? স্বাধীনতার বা মুক্তির এ পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। দীর্ঘ সময়ের বিদ্বেষ, ঘৃণা, সর্বোপরি অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ। দারিদ্র্য, বঞ্চনা, কষ্ট, নারী-পুরুষ বৈষম্য, সর্বোপরি দীর্ঘ পুঞ্জিভূত শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বৈষম্য নিরসনেও প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের। ম্যান্ডেলা সম্পর্কে সবচেয়ে বড় কথা- তৃতীয় বিশ্বের বিরল ঘটনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদ শেষেই ১৯৯৯ সালে সরে দাঁড়ান তিনি, সহকর্মীদের জন্য জায়গা তৈরি করে দিতে। মানুষ বুঝে নেয় কি বিরল মাপের, বিচক্ষণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেলসন ম্যান্ডেলা। হয়তো তাই ঘরে-বাইরে তাঁর প্রতি মানুষের অজস্র ভালোবাসা আর ‘সীমাহীন মুগ্ধতা’।

সংগ্রামের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আসা নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাণের মানুষ, চে গুয়েভারার কিছুটা বিপরীত ঘরানার হয়েও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর চোখে সংগ্রামের প্রতীক, কিংবদন্তী ‘আইকন’। তাঁর বার্তা বৈশ্বিক চরিত্রের- ‘কখনও অন্যের সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলবে না। নিজেকে অন্যের চেয়ে ছোট করে দেখবে, প্রবীণের প্রতি শ্রদ্ধা আর ছোটদের সহিষ্ণু মমতা যেন জীবনচর্চার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।’‘স্বাধীনতার সঙ্গে আসে গুরুদায়িত্ব।’

নানাদিক ভেবেই হয়তো জাতিসংঘ তাঁর জন্মদিন ১৮ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক নেলসন ম্যান্ডেলা দিবস’হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মৃত্যু নেই ম্যান্ডেলার।

লেখক: গবেষক, ভাষাসংগ্রামী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.