দাম কমাতে জান বাঁচাতে রাজপথে নামতে হবে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন 

পল্টন মোড়ে চায়ের গলিতে ঢোকার মুখে ডানদিকের প্রথম চায়ের দোকানটা রুবেলের। সেই ছোটবেলা থেকে চায়ের দোকান করছে। প্রথমে সিপিবি অফিসের সামনের ফুটপাথের উপর তার দোকান ছিল। অনেকদিন ধরে এখনকার জায়গায় দোকান চালাচ্ছে। আজ শুক্রবার সকালে যখন এ লেখাটা লিখছি এর দুই দিন আগে দুপুরে রুবেলের দোকানে গেলাম চা পাউরুটি খেতে। রুবেল জানে, আমরা গেলে সাধারণত ‘হাফ কাপ’ চা দেয়। এক কাপ চায়ের দাম রাখে ১০ টাকা। আমাদের জন্য রাখে ৫ টাকা। রুবেল চা দিতে দিতে বললো- দুই টাকা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। ১০ টাকার চা ১২ টাকা করেছে। আমাদের এখন থেকে হাফ কাপ চা ৬ টাকা দিতে হবে। উত্তেজিত রুবেল বললো, চিনি কিনি ৮২/৮৫ টাকায়। সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বেড়েছে গত পাঁচ মাসে ৪৭২ টাকা। জুন মাসে কিনতাম ৮৪২ টাকায় আর এখন অক্টোবর মাসে কিনতে হচ্ছে ১২৫৯ টাকায়। রুবেলের শেষ কথা- ভাই কিছু একটা করেন।

মাঝে মাঝে সকাল বেলায় বাসার সামনের ছোট রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা কিনি। সকাল বেলায় নাস্তায় ডাল-ভাজি আর হালুয়া পাওয়া যেত। বেশ কয়েকদিন ধরে হালুয়া বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। চিনির কেজি ৮৫ টাকা। বাসার সামনে আমজাদের মুদির দোকান থেকে মাসের বাজার করি। সেও খুব উত্তেজিত। তার কথা ভাই, সবাই খালি চাল-ডালের দাম বাড়ার কথা বলে। কিন্তু অন্যান্য জিনিষের দাম যে হু-হু করে বাড়ছে তা কেউ নজর দিচ্ছে না। গত কয়েক মাসে প্রতিটি ব্র্যান্ডের গায়ে দেয়ার সাবানের দাম বেড়েছে ১০/১৫ টাকা। কাপড় ধোয়ার গুড়া সাবানের দাম বেড়েছে ৩০ টাকারও বেশি। টয়লেট টিস্যুসহ অন্যান্য টিস্যু পেপার, টুথপেস্ট, সেভিং ক্রিম ইত্যাদি খাদ্য নয় কিন্তু প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উৎপাদক ও ডিস্ট্রিবিউটাররা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কোনো হৈচৈ নেই। আমজাদও বলে ভাই কিছু একটা করেন।

দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার দাবড়ানিতে মানুষের আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। বাজারে তেল, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে সবজি, মুরগি সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। চালের কেজি ৬০ টাকা। গত এক মাস ধরেই দফায় দফায় বাড়ছে ব্রয়লার ও কক জাতের সোনালি মুরগির দাম। ঢাকায় এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ টাকা। গ্রামেও কম না। সয়াবিন তেলের লিটার ১৫০ টাকা। চিনি ৮৫ টাকা। পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকা। গরু-খাসি-মুরগির মাংস মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। চাষের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া গরিব মানুষের প্রোটিনের একটা উৎস ছিল তার দামও ঊর্ধ্বমুখী। পত্রিকায় প্রকাশিত সবজির দাম দেখে বোঝা যাচ্ছে তাও আমজনতার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। গত সপ্তাহে বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজির মধ্যে শিম ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মুলা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা, পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এছাড়া বাজারে আসা শীতকালীন আগাম সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপি (আকারে ছোট) ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। গত সপ্তাহে বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৭ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা আগের সপ্তাহে ছিল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট মানভেদে ৫৮ থেকে ৬৬ টাকা ও মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতা ৫০ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

করোনাকালে অসংখ্য মানুষ তার কাজ হারিয়েছে। যোগ্যতার চেয়ে অধস্তন কাজে নিয়োজিত হয়েছে। গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ি আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে নেমে গেছে। করোনার আগে ২০.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করতো এখন ৪২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। ৭০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। করোনার সময় প্রবাসী আয় ছিল ঊর্ধ্বমুখী। গত জুলাই থেকে তা ক্রম নিম্নমুখী। এতে গ্রামাঞ্চলে প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো জীবনযাত্রার উপর ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ করোনার কারণে আমজনতার আয় অনেক কমে গেছে এবং আরো কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ি মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নীচে রয়েছে। যার সাথে প্রকৃত বাস্তবতার কোনো মিল নাই। জীবনধারণের জন্য প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত বছরের মার্চে করোনার শুরুতে যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ এক নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। এর উল্টো পিঠও রয়েছে। এ সময়কালে বাংলাদেশে ১৩ হাজার ৮৮১ জন নতুন কোটিপতির জন্ম হয়েছে। অনেক লোক অতি ধনীর কাতারে শামিল হয়েছে। বাংলাদেশে অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ১৭.৪ শতাংশ, যা বিশে^র মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এ বছরও ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ২ হাজার ১১৬ মার্কিন ডলার। যেখানে ৯৯ শতাংশ মানুষের আয় ও সম্পদ কমে যাচ্ছে সেখানে কেবল গুটিকয়েক মানুষের রকেট গতিতে আয় বৃদ্ধির কারণে জাতীয়ভাবে মাথাপিছু আয় বেড়ে যায়- তখন বুঝতে হবে সমাজে আয় ও ধন বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য করোনাত্তরকালে অর্থনীতির উত্তরণ হবে ইংরেজী ক অক্ষরের মত। অর্থাৎ সমাজের এক দলের উত্তরণ হবে ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদলের নিম্নমুখী। এবং তাই ঘটছে। বাংলাদেশর কৃষকরা গত বছর ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন চাল উৎপাদন করেছে। চীন, ভারতের পর বাংলাদেশ। তারপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। সরকার চলতি বোরো মৌসুমে মিলারদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৩৯ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকদের কাছ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এটা সর্বজনবিদিত সরকারের ক্রয় কেন্দ্রে প্রকৃত কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারে না। মৌসুমের শুরুতে তাদের অনেক কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে হয়। বড় বড় চাতাল মালিকরাসহ করোপরেট কোম্পানিগুলো এ ধান কিনে নেয়। পরে চাল করে সিন্ডিকেট বানিয়ে দাম বাড়িয়ে তা বাজারে ছাড়ে। একটা হিসাব থেকে দেখা গেছে দেশে প্রতিদিন কমবেশি ৮০ হাজার টন চাল দরকার হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার টন চাল বাজারে কেনা বেচা হয়। কেজিতে ৫ টাকা দাম বাড়লে ক্রেতাদের পকেট থেকে দিনে ২৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বেরিয়ে যায়। শুধুমাত্র কেজি প্রতি ৫ টাকা দাম বাড়িয়ে দিলে বছরে অতিরিক্ত ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি চাল ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে বাড়তি জমা পড়ে। এভাবে গরিব মানুষকে সর্বস্বান্ত করে ব্যবসায়ী পুঁজিপতি দ্রুত অতি ধনীতে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষক সংগঠনসমূহ কৃষিপণ্যের লাভজনক দাম দাবি করে আসছে। সেটাকে আইনে পরিণত করার কথা গত পঞ্চাশ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে তারা কর্ণপাত করছে না। কৃষকরা তাদের পণ্য উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কমে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অপরদিকে ভোক্তারা বাজার থেকে যখন কিনছেন তখন কৃষকের বিক্রিমূল্যের কয়েকগুণ বেশি তাকে দিতে হচ্ছে। মাঝখানের এ অংশটুকু আত্মসাৎ করছে ফড়িয়া মুৎসুদ্দীরা ও কৃষিপণ্য ব্যবসায় নিয়োজিত কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। এই অতি মুনাফার একটা অংশ ঘুষ হিসাবে আমলাদের ব্যাংক হিসাব স্ফীত করছে। অসৎ রাজনীতিক-দুর্নীতিবাজ আমলা-অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফলে একদিকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক, অন্যদিকে সর্বস্বান্ত হচ্ছে আমজনতা। যাদের আয় মাসে এক লাখ টাকা, ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে তাদের গায়ে লাগে না কারণ শতাংশের হিসাবে তাদের আয়ের একটা সামান্য অংশ তার জন্য ব্যয় হয়। কিন্তু যে পরিবারের আয় ১০/১৫ হাজার টাকা তার চামড়া পুড়ে যায়, কারণ তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করেও সে পরিবারের মুখে ডাল-ভাত তুলে দিতে পারে না। ঋণ করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে হয়।

ক্ষমতাসীনশ্রেণির অর্থনীতিবিদদের কুতর্ক হচ্ছে উন্নয়নের অনুসঙ্গ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতির কারণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। বাংলাদেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ১০ লাখ টন। সরকারি হিসাবে এ বছর ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন চাল উৎপাদন হলে উদ্বৃত্ত থাকে ৫৬ লাখ টন। তারপরও চালের দাম বাড়ছে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে। বাংলাদেশের চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ৪/৫ টি কোম্পানি। সরকার গত বছর ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টি বন্ধ করে দিয়েছে। চিনি আমদানি, সরবরাহ, বিপণন সবকিছু চিনি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে রয়েছে। ফলে করোনার আগে যে চিনির দাম ছিল ৫০ টাকা সেই চিনি এখন ৮৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। সরকারের নীতির কারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এভাবে সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

আমাদের পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ১৯৫৯ সালে একবার ও ১৯৬৬ সালে আরেকবার খাদ্যের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল। অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে খাদ্য আন্দোলনের সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মত সিপিআইএম ক্ষমতাসীন হয়েছিল। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের শুরু হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি পেত্রগ্রাদে খাদ্যের দাবিতে শ্রমিক নারীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে।

বর্তমান সরকার, সংসদ নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এ সরকারের অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, পাটমন্ত্রী, বেসরকারীখাত উপদেষ্টা সবাই ব্যবসায়ীনেতা। সংসদের ৬২ শতাংশ সাংসদ ব্যবসায়ী। ফলে আমজনতার স্বার্থ এদের কাছে উপেক্ষিত। ব্যবসায়ীদের মুনাফার স্বার্থে নীতি প্রণয়ন এদের কাজ। গণস্বার্থ বিরোধী এ সরকার জনগণকে ভাতে মারার সব আয়োজন করে চলছে। আর তার জন্য মধ্যরাতে ভোট ডাকাতি করে ‘মিড নাইট সরকার’ গঠন করে অবৈধভাবে ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। জনগণকে ভাতে মারার জন্য ভোট বঞ্চিত করার এ সরকার হটানোই আজকের দিনের প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য। এর জন্য দাম কমাও, জান বাঁচাও; দুঃশাসন হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও আওয়াজ দিয়ে রাজপথে নেমে আসতে হবে। জনগণকে রাজপথে নামাতে হবে।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.