তেলে তেলেসমাতি, পেঁয়াজে ঝাঁঝ, চালে চালবাজি, মানুষের মাথায় বাজ

আহমেদ মিঠু  

দেশে তেল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি কারবার। সয়াবিনসহ ভোজ্যতেলের দাম এক বছরে দ্বিগুণ তো হয়েছেই, আরো বেশি মুনাফার লোভে বাজার থেকে তেল হাওয়া করে দিয়েছে ব্যবসায়ী নামধারী লুটেরারা।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে গত এক বছরে দফায় দফায় সঙ্কট সৃষ্টি করেছে তেলের কারবারিরা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবারই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বুলি আওড়ানো হয়েছে। মিল মালিক ও পাইকারদের ডেকে বৈঠক করা হয়েছে। আর প্রতিটি বৈঠকের পরই এসেছে নতুন করে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা। সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা না করে দফায় দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এমন সুযোগ হাতছাড়া করছে না মুনাফালোভীরা। কিছু দিন পর পরই তেলের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির কৌশলে সরকারের সাথে দেন-দরবার করে বাড়িয়ে নিচ্ছে দাম। বাজারে সেই দামেও তেল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। মজুত করে আরো দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটছে তেল সিন্ডিকেট।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে মজুত ঠেকাতে কয়েক মাস বাজারে খোলা তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করে সরকার। অথচ দেশে সয়াবিন তেলের ৬০ শতাংশের বেশি খোলা বিক্রি হয়। দামের দিক থেকে একটু স্বস্তি পেতে বোতলের পরিবর্তে খোলা তেল কিনে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সেই খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করে কোটি কোটি পরিবারের ওপর তেল কিনতে বাড়তি খরচ চাপিয়ে দিয়েছে সরকার।

তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত মার্চে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের চেয়ারম্যান। ওই বৈঠক শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘তেলের বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা লুটে নিয়েছে একটি চক্র।’ তিনি এও বলেছিলেন, ‘কারা এই টাকা তুলে নিলো, তা দেখা হবে।’

কিন্তু ভোক্তা অধিকার চেয়ারম্যানের সেই বাণী কথার কথাই থেকে গেলো। এখন পর্যন্ত কাউকে ধরা হয়নি। উল্টো গত দুই মাসে তেলের তেলেসমাতি আরো বেড়েছে। এরমধ্যে সরকার প্রতি লিটার তেলের দাম ১৯৮ টাকা করে দিয়েছে- এক বছর আগেও যার দাম ছিল ৯০ টাকা। এরপরও কিছু দিন ধরে বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ দোকানে দোকানে ঘুরছে। কিন্তু তেল নেই। অথচ এই সময়ে এমন কোনো খবর কেউ দেয়নি যে, দেশে তেল আমদানি বা উৎপাদন হয়নি। সরকারও বার বার বলছে, তেলের সঙ্কট নেই।

দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও সরবরাহ হাতেগোণা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এরাই বিদেশ থেকে তেল আমদানি করে। আবার দেশে যতুটুকু উৎপাদিত হয় সেই কারখানার মালিকও এরাই। ফলে বাজারে তেলের সঙ্কটের দায় এদেরই। ফলে এই হাতেগোণা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেখানেই সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সরকার। এই লুটেরাদের থামানোর কোনো ইচ্ছা সরকারের আছে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের মুনাফা লোটার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে?

শুধু যে ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে তা নয়, কিছু দিন পর পর একেকটি পণ্য নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তেলের পর এখন আবার শুরু হয়েছে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি। গত বছর এক পর্যায়ে পেঁয়াজের কেজি আড়াই শ’ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এবারো আবার সেই লক্ষণ শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, পেঁয়াজের মোট চাহিদার ৬০দিলেই সাথে সাথে কেন দাম বেড়ে যাবে? আবার এমন পরিস্থিতিতে দেশি পেঁয়াজের দাম কেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠবে? এখানেই চলে আসে সরকারের অক্ষমতা।

একেক সময় এক পণ্য নিয়ে হুলস্থূলের মধ্যে নীরবে বাড়ছে এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম। মোটা চালের দাম এরইমধ্যে ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। আর ভালো মানের চালের দাম তো ৮০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। মাঝেমধ্যেই বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বানরের তৈলাক্ত বাঁশে উঠার মতো দাম একবার ৫-৭ টাকা বেড়ে পরে হয়তো ২-৩ টাকা কমছে। আবার কিছু দিন পর একই অবস্থা হচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু আয় বাড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তার ওপর করোনা পরিস্থিতিতে কাজ হারিয়ে অসহায় জীবন কাটছে কোটি মানুষের।

মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মুনাফাখোরদের এই দৌরাত্ম্য এখন স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এর মূল কারণ বর্তমান রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজার ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট কমাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পণ্য সরবরাহের ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সরকার পুঁজিবাদের চাহিদা-যোগান সূত্রের ওপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। চাহিদা-যোগান সূত্রও যদি সঠিকভাবে কাজ করতো তাহলেও কথা ছিল। পণ্যের যোগানের ক্ষেত্রে লুটেরা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। তারা যেভাবে খুশি মানুষের পকেট কাটছে। এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার ক্ষমতা উপভোগে ব্যস্ত হয়ে আছে। এই লুটেরা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সাহস ক্ষমতাসীনদের নেই। কারণ এই লুটেরাদের উপর নির্ভর করেই শাসকশ্রেণীর দলগুলো ক্ষমতায় যায়, ক্ষমতায় টিকে থাকে।

ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থা বহাল রেখে লুটপাটের এ মহোৎসব কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.