তেঁতুলতলার বিজয়, একখণ্ড মুক্ত আকাশ পুনরুদ্ধার

জামসেদ আনোয়ার তপন  

‘তেঁতুলতলা মাঠ, এতটুকুই আকাশ আছে আমাদের, সেই আকাশটুকু কেড়ে নেবেন না’। কী আবেগভরা আর্তনাদ উচ্চারিত হয়েছে সৈয়দা রত্নার কণ্ঠে!

এই আর্তনাদ আর আবেগের মূল্য কি আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে? নীতি, নৈতিকতার কতটা ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটলে এমন একটা নিষ্ঠুর উদ্যোগ নিতে পারে কেউ। বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের মানসিক বৈকল্যের এমনই একটি নমুনা জাতি প্রত্যক্ষ করলো রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠকে কেন্দ্র করে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কয়েক লাখ মানুষের একটি মাত্র খোলা জায়গা। গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মাঠে খেলছে এলাকার শিশুরা। সেই মাঠ দখল করে থানা ভবন নির্মাণ করতে চায় সরকার। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলে মাঠটিকে। সেখানে সকলের প্রবশ বন্ধ হয়ে যায়। শিশুরা বেড়ার ফাঁক গলে মাঠে খেলতে গেলে কান ধরে তাদের ওঠ-বস করানো হয়।

গত বছরের ২৪ আগস্ট ঢাকা জেলা প্রশাসনের এক নোটিশে বলা হয়, ডিএমপির কলাবাগান থানার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য এ সম্পত্তি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ওই নোটিশে এ জমিকে পতিত জমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে কলাবাগানের বাসিন্দা, সাংস্কৃতিক কর্মী, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও শিশু-কিশোররা এ নোটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সর্বশেষ গত ৩১ জানুয়ারি মাঠটিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বেষ্টনী তৈরি করে পুলিশ।

সোচ্চার প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন উদীচীকর্মী সৈয়দা রত্না। এলাকাবাসীকে সংগঠিত করে মানববন্ধন, প্রতিবাদী সমাবেশ ইত্যাদি কার্যক্রমে এলাকাবাসী স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। আন্দোলন সংগঠিত করতে প্রথম থেকেই যুক্ত হয় উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও সিপিবির স্থানীয় সংগঠক ও কর্মীরা। ২৪ এপ্রিল তেঁতুলতলা মাঠে দেয়াল নির্মাণের দৃশ্য ফেসবুক লাইভে প্রচার করেছিলেন সৈয়দা রত্না। এর পরপরই তাঁকে আটক করা হয়। মাকে আটকের কারণ জানতে চাইলে তার এইচএসসি পড়ুয়া ছেলে প্রিয়াংশুকেও আটক করে পুলিশ। ১৩ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখা হয়। সহযোদ্ধা, স্বজনরা ছুটে গেলে তাদের থানায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। আটকের কারণ না জানিয়ে কোনোরূপ কথা বলতেই অপারগতা জানায় থানা কর্তৃপক্ষ। পরে থানার সামনে উদীচীসহ সংস্কৃতিকর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে গভীর রাতে মুচলেকা নিয়ে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। সৈয়দা রত্না আর মাঠের দাবিতে আন্দোলন করবেন না, এমন অঙ্গীকার আদায় করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরদিন মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশে মাঠ রক্ষা আন্দোলনে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়, ‘জায়গাটি সব নিয়ম মেনে থানা ভবন নির্মাণে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। সে হিসেবেই থানার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় লোকজন ও শিশুদের এনে সে কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন সৈয়দা রত্না’।

২০১৬-২০৩৫ এ ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ২০১৬-২০৩৫ এ উন্মুক্ত স্থানের যে নির্দেশনা আছে তা নিম্নরূপ:

১. বিবরণ:

এই জোনের প্রধান ব্যবহারের মধ্যে আছে খেলার মাঠ, পার্ক, স্টেডিয়াম, ইত্যাদি। এই এলাকায় জলাশয় যেমন পুকুর, খাল, লেক ও নদী থাকতে পারে।

২. উদ্দেশ্য ও কাঙ্ক্ষিত ফল:

এই জোনের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিনোদন চাহিদা পূরণ করা, পাশাপাশি মানুষের জন্য প্রকৃতির অফুরন্ত প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্য সংরক্ষণ করা।

৩. বিদ্যমান তেঁতুলতলা মাঠ:

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ এর ঢাকা উপ অঞ্চল-১৭ এ কলাবাগান এলাকায় প্রায় দশমিক ২২ একরের বিদ্যমান তেঁতুলতলা মাঠ ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় খেলার মাঠ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি (খসড়া) আকারে এই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিকল্পনায় নির্দেশিত উন্মুক্ত স্থানের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে এই মাঠ অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার জন্য বরাদ্দ দেয়া বেআইনি। অথচ এই বেআইনি কাজটিই সংঘটিত হয়েছে মাঠটিকে কেন্দ্র করে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছ থেকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে যে, ‘তেঁতুলতলা মাঠ ছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি, কখনোই খেলার মাঠ ছিল না’। বলা হচ্ছে পুলিশ ১৭ কোটি টাকা দিয়ে এই মাঠটি কিনে নিয়েছে। কথা হল এই টাকাতো জনগণেরই টাকা। জনগণের টাকা দিয়ে জনগণের এই মাঠ তারা কিনেছে জনগণেরই আরেক প্রতিষ্ঠান থেকে। এ ভারি মজার গল্প।

আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলেও শিশুপার্ক নির্মাণের নামে মাঠটি বেদখল হতে যাচ্ছিল। এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে তা সম্ভব হয়নি।

বলা হয়েছে- ‘থানা ভবনও দরকার খেলার মাঠও দরকার। বিকল্প জায়গা পেলে থানাভবন বা মাঠ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া যাবে’। কোনো এক অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন বীর বাহাদুরদের যতি এই মনোবাঞ্ছা জাগে যে, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা রমনা পার্কে একটি অতি প্রয়োজনীয় সরকারি ভবন নির্মাণ দরকার, তাও কি সম্ভব হবে?

জনমতের চাপে অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরে সুর নরম করে বলেছেন- “আমরা দেখেছি ঐ এলাকায় খেলার মাঠ বা খোলা জায়গা নেই, বিনোদনের কিছু নেই, সেহেতু পুলিশের জমি পুলিশেরই থাক। মাঠটি যেভাবে আছে সেভাবে থাকুক। এখানে যেন আর কোনো কনস্ট্রাকশন না হয়। মাঠটি যেভাবে ব্যবহার হচ্ছিল সেভাবেই চলতে থাকুক”। এখন সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসে থানা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা যদি বাতিল হয়ে থাকে এবং মাঠটি যদি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে তবে তা পুলিশি মালিকানায় থাকার যৌক্তিকতা কী?

সারা দেশজুড়েই চলছে মাঠ নদী বন দখলের উৎসব। গত বছর বরগুনা শহরে ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি খেলার মাঠ নিয়ে এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। মহামারিতে লকডাউনের আড়ালে মাঠ নষ্ট করে করা হয়েছে বৃক্ষরোপণ। বনায়নের জন্য বিকল্প জায়গা থাকলেও মাঠটির ওপরই চোখ পড়েছে বিবেচনাহীন কর্তৃপক্ষের। এ মাঠে জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা হতো। শহরের কয়েকটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে পাউবোর মাঠটি ঘিরে। এ নিয়ে পরিবেশ সচেতন ও ক্রীড়ামোদী স্থানীয় মহলের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে আপাতত বন্ধ রাখা হয় বৃক্ষরোপন। জানি না সে মাঠের বর্তমান অবস্থা কী।

চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি’র মনোরম সৌন্দর্যময় স্থানে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া, বান্দরবানে ম্রাে জাতিগোষ্ঠীর গ্রাম থেকে তাদের উচ্ছেদ করে পাঁচতারা হোটেল বানানোর খবর কিংবা কক্সবাজারের ৫০০ একর পাহাড়ি জমিতে সরকারি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের জাতীয় জীবনের এক চরম নৈরাজ্য ও অধঃপতনের বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকার ছোট-বড় প্রায় শতাধিক খেলার মাঠ দখল হয়ে গেছে। আর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন জানায়, তাদের হিসেবে তাদের ৫০টি মাঠ এখন অবৈধ দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। এর মধ্যে ১০টি মাঠ তারা উদ্ধারে কাজ করছেন। খোদ রাজধানী শহরের যদি এ অবস্থা হয় তাহলে সারা দেশের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়।

খেলার মাঠ দখল করে থানা বানিয়ে কেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাচ্ছেন আমাদের সরকার? এর ফলে আমরা ভবিষ্যতে একটি হৃদয়হীন ও অসামাজিক প্রজন্ম পাবো। যাদের দুনিয়া হবে টিভি ও মোবাইল ফোন। তারা বাস্তব দুনিয়া চিনবে না। খোলা মাঠ আর সবুজ না থাকলে একসময় জীবনও থাকবে না।

এক টুকরো মাঠের জন্যও আমাদের আন্দোলন করতে হয়। খেলার মাঠ, উদ্যান, পাহাড়, নদী, বন সব এখন নানা দখলদার গোষ্ঠীর লালসার বস্তু। বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে সরকারের নানা রকমের বক্তব্য প্রচারণা দেখি মিডিয়ায়। বাস্তবে উল্টো যদি নিজেরাই তা দখল করতে যায়, আর নাগরিকেরা শ্বাস নেয়ার জন্য এগুলো রক্ষা করতে চাইলে বিভিন্ন বাহিনী যদি তাদের ক্ষমতা দেখানো শুরু করে, যা তারা দেখিয়েছিল সৈয়দা রত্না আর তার পুত্রের সাথে, তার বিরুদ্ধে সকল স্তরের মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধ ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ থাকে না।

তেঁতুলতলা মাঠ উদ্ধার আন্দোলনে সশরীরে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদ প্রতিরোধের কারণেই সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এই আন্দোলন একটি ন্যায্য ও সফল আন্দোলন। তবে সদা সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে আবার যেন মাঠ দখলের চেষ্টা কেউ না করতে পারে। এখন দেশের সকল দখলকৃত মাঠ নদী বন রক্ষার আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। সে আন্দোলনের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে তেঁতুলতলা মাঠ।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, উদীচী, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.