তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

এদেশের বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রচেষ্টার পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থই এখন প্রধান ও বলতে গেলে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘নীতি-আদর্শ-মতাদর্শের’ বিষয়গুলো হয়ে পড়েছে গৌণ। হয়ে উঠেছে নিতান্তই উপযোগিতার (expediency) বিবেচনার বিষয়। রাজনীতিতে এখন তাই মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা প্রায় হয় না বললেই চলে। দু’চারটি দলের মতাদর্শগত ভিত্তি যদিও অক্ষুন্ন আছে, কিন্তু তা প্রধানত সীমাবদ্ধ ও আবদ্ধ হয়ে থাকছে নিজস্ব দলের ও রাজনৈতিক ঘরানার ব্যক্তিদের মধ্যে। তাছাড়া চলতি হাওয়ার রাজনীতির ‘বি-মতাদর্শকীকরণ’-এর প্রভাবে এসব দলের মতাদর্শিক চর্চার ক্ষেত্রেও ঘাটতি ও অবহেলা বাড়ছে।

নীতি-আদর্শ-মতাদর্শের ক্ষেত্রে যেসব দল একাগ্র তাদের মধ্যে প্রধান একটি দল হলো কমিউনিস্ট পার্টি। এই দলের মতাদর্শ হলো ‘মার্কসবাদ’। শুধু বিমূর্ত রুপে নয়, বরঞ্চ প্রয়োগের মূর্ত প্রক্রিয়ার ধারাতে কমিউনিস্টরা তত্ত্বকে যাচাই ও তত্ত্বচর্চা করে। কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শিক চর্চায় অবহেলা ঘটলে তা হবে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

নীতি-আদর্শ-মতাদর্শ নিয়ে আলোচনাকে অনেকে ‘তত্ত্বের কচকচানি’ বলে হেয় করে থাকে। একথা ঠিক যে, প্রয়োগ ও বাস্তব সংগ্রাম ছাড়া তত্ত্ব হলো বন্ধ্যা। সাথে সাথে একথাও সত্য যে, তত্ত্ব ছাড়া শুধু বাস্তব সংগ্রাম হলো অন্ধ। একথা মনে রেখেই মতাদর্শিক তত্ত্বচর্চায় মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।

তত্ত্বচর্চা প্রসঙ্গে অভিযোগ আকারে অপর যে কথাটি বলা হয়ে থাকে তা হলো, মতাদর্শিক তত্ত্বচর্চা হলো জটিল ও দুর্বোধ্য কঠিন বিষয়। মাথা খাটিয়ে ও কষ্ট করে এসব তত্ত্বচর্চার বদলে কেবল ‘কমনসেন্স পলিটিক্স’ নিয়ে থাকাটিই সহজ ও ঝামেলামুক্ত! কিন্তু এ ধরনের ‘সহজ পন্থার’ চিন্তা রাজনীতিতে মতাদর্শিক স্খলনের পথ সুগম করে দেয়। মতাদর্শিক ভাবনা হলো ‘বিশেষ জ্ঞান’ প্রসূত। শুধু ‘সাধারণ জ্ঞান’ দিয়ে তা আয়ত্ত করা যায় না।

তাই রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরকে, বিশেষত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদেরকে, চিন্তার আলস্য ত্যাগ করে তত্ত্বচর্চার জটিল জগতে প্রবেশ করা একান্ত অপরিহার্য।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.