টিকা নিয়ে জি-৭ এর প্রতিশ্রুতি ‘মহাসাগরে একফোঁটা পানি’

গরিব দেশগুলোকে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির সাত দেশের জোট জি-৭ এর ১শ’ কোটি ডোজ কোভিড টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি একেবারেই যথেষ্ট মনে করছেন না বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রচার সংগঠনের কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, জি-৭ এর টিকা দেওয়ার পরিকল্পনার সুদূরপ্রসারী কোনও লক্ষ্য নেই, পদক্ষেপ খুবই ধীরগতির। পশ্চিমা নেতারা যে বিশ্বে খুবই খারাপ পর্যায়ে চলে যাওয়া জনস্বাস্থ্য সংকট সামাল দিতে এখনও তৈরি নন তা এ থেকেই স্পষ্ট।

দাতব্য সংস্থা অক্সফামের স্বাস্থ্যনীতি বিষয়ক ব্যবস্থাপক আন্না ম্যারিয়ট টিকার একটি হিসাব দিয়ে বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর অবসান ঘটাতে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ১শ’ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করা প্রয়োজন। সেখানে জি-৭ নেতারা মাত্র ১শ’ কোটি ডোজ টিকার ব্যবস্থা করতে পেরে থাকলে এ সম্মেলনই ব্যর্থ হবে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এর আগে কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় গরিব দেশগুলোকে ১শ’ কোটি ডোজ টিকা দিতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ জি-৭ এর রাজি হওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন।

তার এ ঘোষণার পরই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ১০০ কোটি ডোজ কোভিড টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মহাসাগরে মাত্র একফোঁটা পানি দেওয়ার মতোই। এ দিয়ে ভারতেরই পুরো জনসংখ্যাকে টিকার আওতায় আনা যাবে না, আর বাদবাকি বিশ্ব তো দূরের কথা।

লন্ডন-ভিত্তিক বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য বিষয়ক দাতব্য ফাউন্ডেশন ওয়েলকাম এর কর্মকর্তা অ্যালেক্স হ্যারিস বলেন, এই প্রতিশ্রুতি একেবারেই যথেষ্ট নয়, ত্বরিতও নয়। বিশ্বের এখনই টিকা প্রয়োজন, বছরের শেষে গিয়ে নয়। ঐতিহাসিক এই মুহূর্তে সময়ের দাবি মেনে জি-৭ নেতাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখানেটাই বাঞ্ছনীয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে ফাইজার-বায়োএনটেকের ৫০ কোটি ডোজ টিকা গরিব দেশগুলোতে বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এরপরই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আগামী বছরের মধ্যে অন্তত ১০ কোটি ডোজ টিকা গরিবদেশগুলোকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

কানাডাও ১০ কোটি ডোজ টিকার প্রতিশ্রুতি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে এবং এমন কিছু টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে আরও দেশ।

যুক্তরাজ্যের কারবিস বে-তে ১১ জুন থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন। ১০০ কোটি ডোজ টিকা দান হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা আসার কথা রয়েছে এ সম্মেলন থেকে।

কিন্তু স্বাস্থ্য ও দারিদ্য বিমোচন বিষয়ক প্রচারকর্তারা বলছেন, এই সহায়তা সঠিক পথের একটি পদক্ষেপ হলেও পশ্চিমা দেশগুলোর নেতারা ভাইরাসকে ধরাশায়ী করতে যে বিশেষ প্রচেষ্টার প্রয়োজন তা অনুধাবন করতে পারেননি। টিকা দেওয়ার সাথে সাথে বিতরণে সাহায্য করাটাও জরুরি।

আবার সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, জি-৭ নেতাদের প্রতিশ্রুতি অনেকটা সংকটের প্রকৃত সমাধান করার চাইতে বরং ভিক্ষার ঝুলি এক হাত থেকে অন্য হাতে পার করার মতোই ব্যাপার।

প্রচার কর্মকর্তারা বলছেন, বেশিরভাগ মানুষেরই দুই ডোজ টিকা এবং ভাইরাসের নতুন নতুন ধরন মোকাবেলায় বুস্টার ডোজ নিতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে টিকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জি-৭ কেবল যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু তাদেরকে খুব দ্রুতই আরও বহুদূর যেতে হবে।

তা নাহলে বিশ্বের গরিব দেশগুলোর মানুষজনকে টিকার আওতায় আনতে ২০৭৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যাবে বলে হিসাব-নিকাশ করে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, অক্সফাম, স্টপ এইডস ক্যাম্পেইন, গ্লোবাল জাস্টিস নাউ, ইউএনএইডস-সহ বিভিন্ন সংগঠনের কোয়ালিশন ‘দ্য পিপলস ভ্যাকসিন এলায়েন্স’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.