টকশোর প্রশ্নোত্তর ও পরীক্ষার খাতার পাস-ফেল নম্বর

আকমল হেসেন

বিভিন্ন মিডিয়াতে স্বাক্ষাৎকারভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের রেওয়াজ অনেক আগের, তবে টকশোভিত্তিক ঘটনা সাম্প্রতিক কালের। দেশ-বিদেশে ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ায় মিডিয়ার নানান প্রোগ্রামের সাথে এটির সংযুক্তি। বাংলাদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সাথে সাথে অনলাইনভিত্তিক টিভি চ্যানেল, ফেসবুকভিত্তিক লাইভ শো প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় টকশোর স্কোপ যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনই এটি জনপ্রিয় প্রোগ্রাম হিসেবে সবার মাঝে আবির্ভূত হয়েছে। এ সকল টকশোতে বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার অভিজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞ মানুষদের মতামতের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে এই টকশোগুলিতে মানুষের সাথে মাঝে মধ্যে দু-চার জন অমানুষ যে আসেন না এমনটা নয়। প্রোগ্রামের কর্ণধারদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভালো লাগা বা মন্দ লাগার জায়গা থেকে এমনটা ঘটে না তার নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। কারণ মানুষ মাত্রেই ভুল হয় এবং এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হওয়ার নয়। টকশোর প্রোগ্রামগুলি জনপ্রিয় হওয়ার অনেকগুলি কারণ  রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণে যখন মিডিয়া জনগণকে সব কিছু জানাতে পারে না তখন মানুষের মধ্যে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে। সেই আকাঙ্ক্ষা যে মিডিয়া এবং যেই ধরণের প্রোগ্রাম পূরণ করতে পারে সেটির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে, টকশোর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।

বাংলাদেশের সামরিক শাসনামলে বিবিসি বাংলা এবং ভয়েজ অব আমেরিকার বাংলা খবর শোনার জন্য রেডিও-এর সামনে মানুষের জটলা তৈরি হতো ঠিক একই কারণে। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার টকশোতে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের ডেকে দেশ-জাতির বিভিন্ন সমস্যা ও তার প্রতিকারের পথ সম্পর্কে যে আলোচনা হয় তা মানুষের নিকট বেশ উপভোগ্য। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যে প্রশ্নগুলি করা হয় তা আগেই লিখিত বা মৌখিকভাবে জানানো হয়, আবার  টকশোতে আলোচনার প্রেক্ষিতে নতুন নতুন প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নের  উত্তর যেটাই হোক, সেটার উত্তর দেওয়ার আগেই প্রশ্নকারীর প্রশ্ন করার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, সাংবাদিককে কোন একটি দল বা মতের হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। একই টকশোতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অশ্লীল বাকযুদ্ধ, হাতাহাতি এমনকি শারীরিক সংঘাতের মত ঘটনার দৃশ্যও দেখা গেছে। সরকারি দলের লোকদের জন্য যেমন সকল প্রশ্নের একই উত্তর, তেমনি বিরোধী দলের লোকদের ক্ষেত্রেও তাই। তবে সরকারি দলের লোকদের   উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে একই প্রশ্নের উত্তর বিরোধী দলের লোকদের  পক্ষ থেকে হয় ‘না’। আবার অনেক সময় সঞ্চালক যে প্রশ্ন করেন উত্তরে তার ধারেকাছে না যেয়ে এমন সব উত্তর দেন তখন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা হাসাহাসি করে। বিশেষ করে সরকারি আমলা ও পুলিশের নিকট থেকে অনেক প্রশ্নের ভিন্নধর্মী উত্তর আসে। চাকুরির কারণেই এমনটা হয় কিনা জানিনা।

সব বিষয়কে রাজনীতিকরণের কারণে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিক এবং উত্তরদাতা মানুষগুলি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো না বলে উত্তর দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, এমনকি শিক্ষকরাও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। ক্ষেত্রবিশেষে দু-একটি ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু নয়। টকশোর প্রশ্ন এবং তার উত্তর দেখে স্কুল লেবেলের শিক্ষার্থীরা যেমন হাসাহাসি করে তেমনি পরীক্ষার খাতায় যদি এইভাবে লেখা হয় অথবা চাকুরির ভাইভা পরীক্ষায় যদি এমনভাবে উত্তর দেওয়া হয় তখন কি প্রাথমিক বাছায়ে টেকা যাবে? তাছাড়াও এ সকল গুরুত্বপুর্ণ মানুষের উপস্থাপিত ভুল তথ্যে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা যায় না। সত্য বলার সৎ সাহসটুকু যেন এরা হারিয়ে ফেলছে।

বামচিন্তার মানুষগুলির মধ্যে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সৎ সাহস থাকলেও রাজনৈতিক শক্তিতে দুর্বল হওয়ার কারণে এই সকল টকশোতে তাদের তেমন ডাক পড়েনা। জানিনা অন্যন্যদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে এটা ঘটছে কিনা? কারণ বাংলাদেশের মিডিয়ার টকশোগুলিতে একই বিষয়ে যে আলোচনাটা হচ্ছে বিদেশি মিডিয়াতে ভিন্নভাবে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র, খোলাবাজারের অর্থনীতি আর অবাধ তথ্য প্রবাহের সময়ে এটা হওয়ার কথা নয়। জানিনা কোন অদৃশ্য সুতায় আটকে আছে আমাদের সংবিধানের ৩৯ ধারার চিন্তা, বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতা?

লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.