জয় হোক বাঙালির

ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখী ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর- কবির এ বাণী হৃদয়ে ধারণ করে নতুন আরও একটি বাংলা বর্ষকে বরণ করে নেবে বাঙালি। পুরোনো বছরের জরা ও গ্লানি ঝেড়ে ফেলে এ দিনটিতে জাতি বরণ করবে নবোদ্যমে। স্বাগত জানাবে ১৪২৯ বঙ্গাব্দকে।

নববর্ষ উৎসবটি প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ একটি অনুষ্ঠান। এটি হিন্দুর নয়, মুসলমানের নয় অথবা বৌদ্ধের নয়। এ উৎসব সব বাঙালির। যে ধর্মনিরপেক্ষ ও অগ্রসরবাদী চিন্তা বাঙালি সংস্কৃতির একান্ত একটি বৈশিষ্ট্য, সেটি নববর্ষের উৎসবে সহজেই শনাক্ত করা যায়। এজন্য ষাটের দশকজুড়ে ঢাকায় নববর্ষ উদযাপনকে বিশাল রাজনৈতিক গুরুত্বে উপস্থাপন করা হতো। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা নববর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তবে তা এখন আর খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঋতু পরিক্রমায় বৈশাখকে বিবেচনা করা হয় শস্য রোপণের মাস হিসেবে। বৈশাখে খরতপ্ত মাঠ নবধারাজলে সিঞ্চিত হলে কৃষক হালকর্ষণ শুরু করেন, বীজ বুনেন, আশায় বুক বাঁধেন সোনালি ফসলের। বৈশাখে দোকানি সারা বছরের হিসাব-নিকাশ করতে হালখাতা খোলেন। বৈশাখ আসে বাঙালি জীবনে নতুন শস্যের আবাহন নিয়ে, আসে বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মীর বেশ ধরে। বাংলা নববর্ষে গ্রামগঞ্জে মেলা বসে, ঘোড়দৌড় হয়, তরুণরা বিচিত্র পোশাকে সঙ সেজে গ্রামের নারী-পুরুষকে আনন্দ দেয়। যদিও অতীতের তুলনায় আজ গ্রামীণ জীবনের এই সাংস্কৃতিক প্রাণপ্রবাহ কম। এখন বাংলা নববর্ষের সব আয়োজন যেন সীমিত হয়ে পড়েছে শহরাঞ্চলে। অথচ গ্রামই হলো বাংলাদেশের প্রাণ।

এ দিনটিকে কেন্দ্র করেই জেগে উঠে বাঙালির প্রাণ। নবপ্রাণে উজ্জীবিত হয় গোটা জাতি। কিন্তু বাঙালির এই প্রাণপ্রবাহ স্তব্দ করে দিতে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যে ক্রমাগত হামলা হয়েছে পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, তার প্রত্যুত্তর হিসেবে বাঙালি তার একটি সার্বিক পরিচিতি নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছে। ওই পরিচিতিটি শুধু ধর্মের একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল ছাড়া সব ক্ষেত্রেই ছিল পৃথক এবং ধর্মের ক্ষেত্রেও বাঙালির উদারপন্থি চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ পাকিস্তানিদের কট্টরপন্থি ও গোঁড়া ধর্মচিন্তা এবং চর্চার বিপরীতে ছিল। বাঙালির নিজস্ব পরিচিতি প্রতিষ্ঠায় আরও অনেক উপাদানের সঙ্গে তার লোকজ আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবনচর্চার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নববর্ষের ঐতিহ্যটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে নববর্ষের প্রতীকী তাৎপর্যটি খুব একাগ্রতা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি আমলের সেই প্রেতাত্মারাই বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেদিনের হামলায় আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন অনেকে।

নতুন বৎসরকে সত্যিই উজ্জ্বল ও ভাস্মর করে তুলতে হলে দুটো বিপদকে মোকাবিলা করতে হবে। একদিকে মৌলবাদের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কাজ, যা গত বৎসর খুবই ভয়াবহ আকারে আত্মপ্রকাশ করেছিল। অপরদিকে দেশে বিচারহীনতা ও গণতন্ত্রহীনতার পরিবেশ ও কর্তৃত্ববাদী শাসন। সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানি ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সম্পূণরূপে নির্মূল করতে না পারলে, গোটা জাতিই ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।

নতুন বৎসরে নতুন শপথে আমরা জেগে উঠবো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মহান আদর্শে। এখন জনগণের জন্য শান্তি, কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ পরিহার করে একযোগে কাজ করতে হবে। বাঙালির প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হোক। শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক বাঙালির জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.