জ্বলছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’

একতা টিভি অনলাইন ডেস্ক: চলতি বছর প্রথম ৮ মাসেই আমাজন যতখানি পুড়েছে, গত কয়েক বছর মিলিয়েও এতখানি পুড়েনি। পরিবেশবাদীদের দাবি, বন উজাড়ে কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনেরোর নীতিই এ অগ্নিকাণ্ডে ‘হোতা’। বোলসোনেরো দায় স্বীকারে নারাজ, এমনকি বিশ্ব যেন এদিকে নাক না গলায়, তা নিয়েও তার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি আছে।

চিরহরিৎ আমাজন বনে ৩৯০ মিলিয়ন বৃক্ষ রয়েছে; যেগুলি প্রায় ১৬,০০০ প্রজাতিতে বিভক্ত, এই বনে ৩০-র বেশি উপজাতির বাস। বছরে ২ বিলিয়ন টন কার্বন-ডাই -অক্সাইড নিয়ে পৃথিবীকে ২০% অক্সিজেন জোগান দেয়। সেই ‘ফুসফুসেই’ গত ৮ মাসে আগুন লেগেছে ৭২ হাজার ৮৪৩ বার। কেবল ১৫ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহে আগুন লাগার সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৩% বেশি। আগুনের প্রকোপ এতটাই যে নিস্তার পায়নি কয়েকহাজার কিলোমিটার দূরের শহর সাও পাওলো।

নাসার আকুয়া স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে, ১১ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ব্রাজিলের রোডোনিয়া, অ্যামাজোনাস ও মাতো গ্রোসো রেকর্ড পরিমাণ আগুনে পুড়ছে মিনিটে ১০০০০ বর্গমিটার পরিমাণ। ৩০
লাখেরও বেশি উদ্ভিদ-প্রাণী এবং ১০ লাখের বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ আবাসস্থলে বন উজাড়ের মাত্রা চলতি বছরে বেড়েছে আগের তুলনায় ৩ গুণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বোলসোনেরোর অবস্থান সবসময়ই ছিল ‘বন খাদক’দের পক্ষে। তিনি বনাঞ্চলের মানবসৃষ্ট ক্ষতির জন্য জরিমানা কমানোর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর সংখ্যা ও কার্যক্রমের মাত্রা সীমিত করেন। বদলে দেন পরিবেশের পক্ষে থাকা বেশ কয়েকটি আইন। ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পেস রিসার্চ’ একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে
যেখানে বোলসোনেরোর সময়ে বন উজাড়ের হার কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়।

তারা বলছেন, বোলসোনেরোর নীতির কারণে বনে কাঠুরে ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেড়েছে। কর্পোরেটদের চোখ আরও বিস্তৃত হয়েছে। আমাজনকে শিল্প এবং বিভিন্ন স্থাপনার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ারও তৎপরতা চলছে। বামপন্থি লুলা দ্য সিলভাকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিয়ে কট্টর ডানপন্থি বোলসোনেরোকে ক্ষমতায় আনার পেছনে এ চত্রের ভূমিকা দৃশ্যমানই ছিল। বোলসোনেরো এখন সেই দায় শোধ করছেন।

কেবল তাই নয় বিশ্লেষকরা, নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর মতে আমাজনের তিনটি সংরক্ষিত এলাকায় স্বর্ণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; সেই এলাকা ২ লক্ষ ৪৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, অর্থাৎ আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড়। উপগ্রহের ছবি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই অঞ্চলগুলোতে অবৈধ খনি ও খনির শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রোরাইমা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য স্বর্ণ তবে রাজ্যটির অনুমোদিত একটাও বৈধ খনি নেই। নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর মতে সেখানে এখন অন্তত ১০০০০ শ্রমিক অবৈধ খনন কাজ চালাচ্ছে।

লাতিন আমেরিকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থা গত বছর দেয়া এক প্রতিবেদনে জানায়, সংরক্ষিত এলাকায় অন্তত ১৮টিতে অবৈধ খনন বেড়েছে। বোলসোনেরো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অনেক জায়গাতেই ‘অনধিকার প্রবেশকারীদের’ যাতায়াত উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। গাছ কাটার পাশাপাশি এই ধরণের খননকাজ নদীর স্রোত ও গতিপথকেও প্রভাবিত করে। শুস্ক মৌসুমে আমাজনে প্রায়ই অগ্নিকা- হলেও এবারের মতো ভয়ঙ্কর কোনোবারই দেখা যায়নি। স্থানীয় পরিবেশবিদদের ধারণা, এই আগুন প্রাকৃতিক নয়। দাবানল নয়। বরং আমাজনের এই আগুনের পিছনে রয়েছে মানুষের
ষড়যন্ত্র। চাষ ও বাসের জমি পাওয়ার জন্য স্থানীয় লোকজন জঙ্গলের গাছ কাটা ও আগুন ধরানো শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

স্যাটেলাইট ইমেজ দেখাচ্ছে, আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে ধোঁয়া প্রায় ১৭০০ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আমাজনের আগুনের উপর নজর রাখছে নাসা। স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে আগুনের তীব্রতার ছবি পাঠাচ্ছে নাসার একাধিক স্যাটেলাইট।

আমাজনের এ আগুন নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। ফ্রান্স বলছে, তারা শিল্পোন্নত দেশগুলোর জি-৭ সম্মেলনে এ বিষয়টি উত্থাপন করবে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনেরো আবার এ ঘটনায় নাখোশ। তার মতে, আমাজন বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেবল ব্রাজিলসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বৈধ সরকারই নিতে পারে। প্রথমদিকে অগ্নিকা-ের জন্য এনজিওদের দোষ দিয়েছিলেন তিনি, পরে অবশ্য সেই অবস্থান থেকেও সরেও এসেছেন। এখন বলছেন, কৃষক কিংবা কর্পোরেটের পোষা লোকেরাও বনে আগুন দিতে পারে।

আমাজনকে রক্ষা করা যাবে কিনা, তা নিয়ে এমনিতেও উদ্বেগ বাড়ছিল। এ বছরের অগ্নিকা- সেই উদ্বেগে ঘিঢেলে দিয়েছে। তবে একইসঙ্গে মানবসভ্যতাকে বোলসোনেরো এবং তার মিত্র কর্পোরেটদের হাত থেকে বাঁচাতে একজোট হওয়ারও আহ্ধসঢ়;বান দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.