‘জেলে তো গুলি চলে না তাহলে জেলজীবন কি স্বাভাবিক?’

কাশ্মীরের কমিউনিস্ট নেতা ইউসুফ তারিগামি

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-সিপিআইএম নেতা ও সাবেক বিধায়ক মুহাম্মদ ইউসুফ তারিগামি বলেছেন, জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের মধ্যেকার ঐক্য নষ্ট হচ্ছে সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফলে জম্মু-কাশ্মীরের নেতা ও জনসাধারণের মধ্যে যে বন্ধন তৈরি হয়েছে তা আজ বিপন্ন। জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ, সরকারের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটার সুযোগ চান, সরকারের সঙ্গে বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ চান। আমরাও বাঁচতে চাই, আমাদেরও বাঁচার অধিকার আছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে সিপিআইএমের দলীয় কার্যালয়ে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে সঙ্গে নিয়ে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইউসুফ তারিগামি এসব মন্তব্য করেন।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও কেউ মারা যায়নি বলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছে। সরকারের এই দাবির তীব্র সমালোচনা করেন সাবেক এই বিধায়ক। কমিউনিস্ট নেতা তারিগামি প্রশ্ন তুলেন, ‘একে স্বাভাবিক অবস্থা বলে? গুলি তো কারাগারেও চলে না, তবে কি কারাবাস স্বাভাবিক জীবন?’

‘উপত্যকায় ৪০ দিনের বেশি মোবাইল-ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখাটা স্বাভাবিক? দিল্লি বা অন্য কোনো শহরে সাত দিনের জন্য এমন করে দেখুন, কী অবস্থা হয়! রুটি-রুজি কোথা থেকে আসে! ব্যবসা কিভাবে চলে! হাসপাতালে কিভাবে চিকিৎসা পাওয়া যায়! স্কুলের শিশুদের কী অবস্থা হয়!’

সংবাদ সম্মেলনে ইউসুফ তারিগামি বলেন, আমি কোনো বিদেশি নই, ফারুক আবদুল্লাহ বা অন্য নেতারাও সন্ত্রাসবাদী নন। কাশ্মীরের মানুষ বলে কাশ্মীর পরিস্থিতি খারাপ নয়, কাশ্মীরের অবস্থা খারাপ হয়েছে আমাদের, রাজনীতিবিদদের জন্য ও রাজনীতির কারণে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট অসুস্থ সিপিআইএম নেতা ইউসুফ তারিগামিকে চিকিৎসার জন্য শ্রীনগর থেকে নয়াদিল্লির এইমস হাসপাতালে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। নয়াদিল্লিতে ইউসুফ তারিগামি এখন গৃহবন্দি হয়ে রয়েছেন। কাশ্মীরে যেসব নেতারা আটক রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তারিগামিই প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। যদিও ১৬ সেপ্টেম্বরই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, তারিগামি এবার শ্রীনগর ফিরে যেতে পারেন। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, এস এ বোবডে এবং এস এ নাজিরকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে প্রাক্তন বিধায়ককে এইমসে চিকিৎসকরা যদি সুস্থ ঘোষণা করেন, তাহলে তাঁকে দিল্লি থেকে স্বগৃহে ফেরার জন্য কোনো অনুমতি নিতে হবে না।

কাশ্মীরের মানুষকে বাঁচতে দেওয়া হউক, এভাবে তাঁদের ‘তিল তিল করে মারবেন না’- সরকারের প্রতি এমন আহ্বান জানিয়ে সিপিআইএম নেতা ইউসুফ তারিগামি বলেন, কাশ্মীরিরা ধীরে ধীরে মরছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভারতের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের ঐক্যের ভিতেই ঘা পড়ে গেছে। আমি তো বিদেশি নই। ফারুক আবদুল্লাহ বা অন্য নেতারা তো সন্ত্রাসী নন। কিন্তু আমাদের তো সন্ত্রাসবাদীদের মতো করে দেখানো হচ্ছে। ফারুক আবদুল্লাহর দল ন্যাশনাল কনফারেন্স কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়, তার নেতাও কোনো সন্ত্রাসবাদী নন।

জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল ও রাজ্যটি ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরির সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সিপিআইএম নেতা তারিগামি বলেন, মানুষকে কারাবন্দি করে, ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ করে, দৈনন্দিন জীবনধারণের পথ রুদ্ধ করে আদৌ কি কাশ্মীরবাসীর বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব? এতে কি দেশের শত্রুরা খুশি হবে নাকি দেশের মানুষই আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন? এতে জম্মু-কাশ্মীরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে, সংবাদ সম্মেলনে সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জম্মু-কাশ্মীরে যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যাতে উপত্যকা সম্পর্কে আরো কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছতে না পারে।

সীতারাম ইয়েচুরি আরো জানিয়েছেন, দলের পক্ষ থেকে ইউসুফ তারিগামি ৩৭০ ধারা বিলুপ্তি ও জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিভাজনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.