জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশের স্বাভাবিকতা অপরিহার্য

আকমল হোসেন

প্রতিবারের মতো ৫ জুন এবারও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক অবদানের জন্য অনেকেই পরিবেশ পদক পাবেন, সরকারপ্রধানের হাত থেকে। মানুষের পারিপার্শ্বিক অবস্থাই তার পরিবেশ। পরিবেশের দ্বারাই মানুষ প্রভাবিত হয়। ভালো পরিবেশ পেলে সে যেমন ভালো হয় তেমনই খারাপ পরিবেশ হলে তাকে কষ্ট ভোগ করতে হয়। এই পরিবেশ প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম। প্রাকৃতিক পরিবেশের ইতিবাচক এবং নেতিবাচকতার উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও সতর্কতা অবলম্বন করে ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে পারে। কিন্তু লোভ-লালসা আর বৈষয়িক স্বার্থের জন্য এবং প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে বিপদগামী করে মানুষের জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। সামগ্রিকভাবে পুরো পৃথিবীর জন্য আজ এই সমস্যা তবে নগরবাসীর জন্য এর তীব্রতা আরো প্রকট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ পানিদূষণ ও জলাবদ্ধতা। অট্টালিকার শহর বানাতে যেয়ে কোথাও একটু জায়গা রাখা, ছেলে-মেয়েদের খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র কারোই মাথাতেই নেই। শুধু অপরিকল্পিত নগরায়নই নয়, নদী শাসন, খাল-বিল নদীর যেখানে-সেখানে বাঁধ, সেতু তৈরি করে পানির স্বাভাবিক গতি রোধ করে মানুষকে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই আমলেও এ ধরনের অপরিকল্পিত পরিকল্পনা সত্যিই বেদনাদায়ক। অথচ পৃথিবীর সূচনালগ্নে মানুষের চিন্তার জগত এই রকম সমৃদ্ধ না হলেও তাদের আবাসন এবং নগরায়নের চিন্তা সত্যিই কত সুদূর প্রসারিত এবং কল্যাণকর ছিলো। নদীর অববাহিকা এবং বন-জঙ্গল ছিলো আদিম মানুষের জীবন-জীবিকার প্রথম এবং প্রধান অবলম্বন। বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন পানি, খাদ্য আর অক্সিজেন, যা ঐখান থেকে পাওয়া সহজ ছিলো। বন-জঙ্গল থেকে জীবনধারণের জন্য গাছ লতা-পাতা ফল জলাশয় থেকে মাছ এবং পানি পাওয়া যেতো বলেই তাদের আবাসন নদীর আববাহিকা এবং বন-জঙ্গলের পাশেই গড়ে তুলেছিলো। যাতায়াতের ব্যবস্থা হিসেবে নদীপথকে ব্যবহার করতো, যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকার কারণে হাট-বাজার এবং লোকালয় নদীর তীরেই গড়েছিলো। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো যেমন রয়েছে তেমনই লন্ডনের গ্লাসগো, ভারতের কলকাতা, বাংলাদেশের ঢাকা এবং চট্টগ্রাম প্রধান প্রধান নদীর অববাহিকতায় গড়ে উঠেছিলো। বিশ্বায়নের এ যুগেও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড়-বড় মালের চালান নদীপথেই সংগঠিত হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক জীবন কাঠামোতে জনগণের সক্ষমতার কারণে কৃত্রিমভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাহিদা তখনো সৃষ্টি হয়নি। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে একই জমিতে এক ফসলের পরিবর্তে দুই/তিন ফসলের চিন্তা না করে চাষের জমি বাড়াতে প্রাকৃতিক বন কাটার বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনায় সারা পৃথিবীতেই বন ধ্বংসের মহা আয়োজন হয়েছিলো। তবে এই তত্ত্বের আলোকে সারা পৃথিবীতে ২ শতাংশ বন কাটা হয়েছিলো, আর এ তত্ত্বের আবিষ্কারক সবুজ বিপ্লবের জনক বলে খ্যাত নরম্যান বোলগারকে ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো। এ আমলেও বৈষয়িক লাভের আশায় জনমতকে উপেক্ষা করে সুন্দরবনের পাশেই কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে।

এর আগে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপে দ্রুতই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তির কারণে যুদ্ধের জন্য মজুত গোলাবারুদ আর বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানের বাজারজাতকরণের চিন্তা থেকে কীটনাশকের ব্যবহার শুরু করেছিলো ধনিক দেশগুলো। তারা ফসলের পোকা মারতে কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার জমিতে প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে স্লোগানের জন্ম দিয়েছিলো, “বোকার ফসল পোকায় খায়”। আর সেই পোকা মারতেই কৃষিপ্রধান দেশে রাসায়নিক সার আর বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার বৃদ্ধি করতে প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছিলো। ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই গড়ে উঠেছিলো। ফসলে নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করায় জমির উর্বরতা যেমন কমেছে তেমনই খাদ্যে ভেজালের কারণে মানুষের মধ্যে নিত্যনতুন রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়েছে। সাধু পানির মাছ নিঃশেষ হয়েছে, ফসলের মাঠে বসতো এমন নানান জাতের পাখির বিলুপ্তি ঘটেছে, বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি হ্রাস পেয়ে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। শুধুই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অনেক কিছুকেই হারাতে হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ুর স্বাভাবিকতার জন্য ২৫ শতাংশ বন থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে আছে মাত্র ১৬ শতাংশ, যার ফলে বাতাসে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুতে বিরূপ পরিবেশের জন্ম হয়েছে। এ অবস্থা দূরীকরণে বাংলাদেশে ৯০-এর দশকে সামাজিক বনায়নের আওতায় গ্রাম- গঞ্জের রাস্তা-ঘাট রেলপথ ও খালের পাশ দিয়ে এমনকি ফসলি জমির আইল (সীমানা) দিয়ে গাছ লাগানোর কর্মসুচি নেওয়া হয় অনেকটা সফলও হয় তবে বিশ্বায়নের কারণে একের সমস্য অন্যের ওপর এসে যাওয়ায় কেউই পরিবেশ ও জলবায়ুগত সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। আদর্শিক, কল্যাণমূলক ও স¦াধীনতা প্রাপ্ত একটি দেশের জন-মানুষের জন্য জলবায়ুর সহনশীলতা তৈরি করা একটি অপরিহার্য কাজ হলেও সেটি যেমন উপেক্ষিত হয়েছে তেমনিভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভৌগলিকভাবে সুষম উন্নয়ন, কর্মসংস্থান স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিকল্পিত স্থানীয়করণ না করায় শহরাঞ্চলে প্রতিনিয়তই মানুষের চাপ বাড়ছে, ফলে শহরগুলোতে ধারণ ক্ষমতার বাইরের মানুষগুলোর জন্য আবাসন পরিবহন, কর্মসংস্থানসহ স্বাস্থ্য সমস্যা দিন-দিন বাড়ছে। প্রাকৃতিক জলাধার, পরিবহন ও চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা যেমন নেই, তেমনই মেয়াদ পার হওয়া গাড়ির কালো ধোঁয়া, বিকট শব্দ, এসকল গাড়ি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, সালফারডাই অক্সসাইড, কেøারোফ্লেরো কার্বন (সিএফসি গ্যাস), হাসপাতালের বর্জ্য, অব্যবহৃত প্লাস্টিক ও ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্য, কেমিক্যালের জন্য সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মানুষকে বিড়ম্বনায় ফেলেছে। নিত্যদিনের ব্যবহারে নানা পণ্যের সাথে প্রদত্ত প্লাস্টিকসহ একবারই শুধু ব্যবহার হয় এমন প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পরিবেশ রক্ষায় ১৯৯৫ সালে আইন হয়েছে (সংশোধিত-২০১০), পরিবেশের ক্ষতিকারকদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল জরিমানারও বিধান রয়েছে। শব্দদূষণ হ্রাসে ২০০৬ সালে আইন হয়েছিলো, অতিরিক্ত শব্দ করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও সেটা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে গেছে। নতুন-নতুন আবাসনের জন্য নির্মাণসামগ্রী পরিবহনকালে অসতর্কতা, যত্রতত্র মালামাল ফেলে রাখা, যেখানে সেখানে ময়লা আর্বজনা ফেলা, এমনকি সিটি কর্পোরেশনগুলো গৃহস্থালির বর্জ্যসহ অনান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় লোকবলের সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। ঢাকার বাতাসে বালিকণা, ধুলিকণা সহনীয় মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে। অতি ক্ষুদ্র কণা মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রা যেখানে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম সেখানে ঢাকার বাতাসে এর উপস্থিতি ৩০০ মাইক্রোগ্রাম। ক্ষুদ্র বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা যেখানে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম, সেখানে রয়েছে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম। মানুষের অজান্তেই এ সকল ধুলিকণা ফুসফুসের সমস্যা, হাঁচি-কাশি, এ্যালার্জি ও অ্যাজমার মত কষ্টকর রোগের জন্ম দিচ্ছে। এসব ক্ষতিকর ধুলিকনার প্রধান উৎস হলো ইটভাটা (৩৮ শতাংশ), যানবাহন (১৯ শতাংশ), (রাস্তার ধুলাবালি (১৮ শতাংশ) মাটির খোলা অবস্থা (৯ শতাংশ) এবং অন্যান্য (১৬ শতাংশ)। ঢাকা নগরীতে ধুলাবালির যে আধিক্য তাতে করোনা থেকে রক্ষা পেতে যেমন মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে তেমনি রাস্তার ধুলা-বালি থেকে রক্ষা পেতেও মাস্ক ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-ট্রাক রাস্তায় চলাচলের কারণে বিকট শব্দে শব্দদূষণের যেমন সৃষ্টি হচ্ছে তেমনই কালো ধোঁয়া সৃষ্টি করে বাতাসকে দূষিত করছে। ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর পানির রং ঘন কালো হয়ে পড়েছে, এতে প্রচুর পরিমাণ দূষক পদার্থের মিশ্রণ রয়েছে। এই দুষণের মুখ্য উৎস হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াসা এবং বেসরকারিশিল্প প্রতিষ্ঠান। ইদানিং বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতার মতো আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়। রাজধানীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৩টি খালের কোনো কার্যকারিতা না থাকায় শুধু বন্যার সময়ই নয়, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই রাস্তা এবং নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে জনগণের বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। খালগুলোর ১৭টির কোনো চিহ্নই নেই, ৩৬টি, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনীতিকের ছত্রছায়াই এবং তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজসে দখল হওয়ায় তারও কোনো কার্যকারিতা নেই। পানি নিষ্কাশনের অভাবে বৃষ্টি হলেই ঢাকার রাস্তায় পানি জমে এবং নৌকা চলে আর রসিক মানুষেরা স্লোগান বাঁধে- ‘উন্নয়নের জোয়ারে নৌকা এখন শহরে’। বড় বড় শহর নগর এবং শিল্পায়ন এলাকায় সরকারি জলাশয় নদীর তীর এবং খাল দখল করে স্থাপনা তৈরি চলছেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষের নামে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে ফসলহানি ঘটাচ্ছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এটি প্রতিকারে আইন আছে, তবে সকল ক্ষেত্রে সমভাবে আইনের প্রয়োগ নেই। পরিবেশবাদীদের সোচ্চারে এবং মিডিয়ার প্রচারণার কারণে মাঝে মাঝে পরিবেশবিধংসী স্থাপনার উচ্ছেদ করলেও আবার নতুন করে দখল শুরু হয়। কখনও কখনও প্রভাবশালীদের সুবিধা নিশ্চিত করেই নীতিমালা করা হয়। আগে শোনা যেত হাকিম (বিচারক) নড়লেও হুকুম (রায়) নড়ে না, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখন হাকিমও নড়ে হুকুমও নড়ে। এই নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে না আনলে জীববৈচিত্র্য রক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এতে পরিবেশ দিবস পালন শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে। সেটা না হোক- সচেতন মানুষের এমনটিই প্রত্যাশা।

লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.