জাতীয় বীর কৃষকরা উপেক্ষিত জাতীয় বাজেটে

আবিদ হোসেন

যাদের শ্রম আর ঘামের ওপর এই বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যেও দেশের খাদ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ রাখার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছে সেই জাতীয় বীর কৃষকদের অবদানের কোনো স্বীকৃতি ঘোষিত ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত কৃষি। সরকারের আর্থিক নীতিতে ব্যক্তিখাতকে প্রাধান্যের কথা বলা হলেও দেশের বৃহত্তম ব্যক্তিখাত হচ্ছে কৃষিখাত-বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন নেই। সারাদেশ যখন মহাদুর্যোগ করোনা থেকে রক্ষা পেতে লকডাউন আর সাধারণ ছুটিতে– তখন এদেশে কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ করোনাকে উপেক্ষা করে ক্ষেতে-খামারে ফসল উৎপাদনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল। ফলে খাদ্যাভাব চরম আকার ধারণ করে নাই।

দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় নিরলস নিয়োজিত কৃষক এ বছরও উপেক্ষিত থেকে গেল।

২০২১-২২ সালের বাজেটের শিরোনাম ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেই সাথে ঘোষণা করেছেন ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট। স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থান খাতকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষি খাতে বরাদ্দ রেখেছেন মাত্র ২৪, ৯৪৮ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ সালে ২৪, ৬৮২ কোটি টাকা। মাত্র ২৬৬ কোটি টাকা বেশি। মোট বাজেটের ৫.৩%।

কৃষিখাতে ঘোষিত বাজেট আপাত উন্নত মনে হলেও মূলত কৃষি ক্ষেত্রে সরাসরি কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের সাধারণ রূপরেখা এই বাজেটে নেই। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশে’ হাঁটার যাত্রী মূলত ব্যবসায়ীরা। যাদের কৃষির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা কেবল ব্যক্তি মুনাফার উদ্দেশ্যে।

করোনার এই সময়কালে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে প্রায় ৮০%। নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি মানুষ। দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করার জন্য প্রণোদনা বরাদ্দ করলেও দরিদ্রদের সাহায্য করা বা প্রণোদনা প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলো চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

গত বছর সরকার করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সৃষ্ট-সংকট মোকাবেলায় কৃষকের অনুকূলে প্রণোদনা সুবিধার আওতায় শস্য ও ফসল খাতে ৪% রেয়াতি সুদ হারে কৃষিঋণ বিতরণে ৫, ০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। যার মেয়াদ ১ এপ্রিল ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১ সাল পর্যন্ত। ব্যাংকগুলো এই প্রণোদনা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পেরে সময়সীমা বৃদ্ধি করেছিল ৩১ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত। এই সময়কালে বিতরণ করতে পেরেছে মাত্র ৩, ৫৬৩ কোটি টাকার ঋণ। যা বরাদ্দের প্রায় ৭১%। ঋণ পেয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫১ হাজার ৭১৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য এই প্রণোদনা বরাদ্দ হলেও অভিযোগ আছে, শাখা পর্যায়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ঋণ সুবিধা পায়নি। কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পেয়েছে দ্রুত ঋণ পরিশোধে সামর্থবান ব্যক্তিরা।

২০২০-২১ অর্থবছরের কৃষিতে ভর্তুকি বরাদ্দ ৯, ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালের জন্যও একটি পরিমাণ রাখা হয়েছে। গত এপ্রিল ২০২১ সাল পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ৩, ৪৬৩ কোটি টাকা। প্রতি বছরই ভর্তুকির টাকা খরচ না করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ভর্তুকির টাকা জনগণের সরাসরি করের টাকা। ভর্তুকি যতো কম হবে, জাতীয় অর্থনীতির জন্য তা মঙ্গলজনক। কিন্তু অর্থের অভাবে গরিব কৃষক ফসল উৎপাদনে নিরুৎসাহী হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম না পেয়ে প্রতিবছর লোকসান গুণে ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো সঠিক সময়ে ঋণ উত্তোলন করতে না পারার আশঙ্কায় ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করে। অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক কৃষিকার্ড করতে না পারায় কৃষি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রকৃত প্রাপ্য কৃষকদের ভর্তুকির টাকা ফেরত যাওয়া গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।

ঘোষিত বাজেটে কৃষিখাতে ন্যূনতম ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে ১ জুলাই ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তন নিশ্চয় হবে। কিন্তু এই সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী ধনিকশ্রেণি গড়ে উঠবে। কৃষি ক্ষেত্রে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। কৃষি যন্ত্রের ক্রয়মূল্যের ৫০-৭০% সহায়তার মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ হচ্ছে।

এর আওতায় ২০১০-২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৯, ৮৬৮টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রিপার, সিডার, পাওয়ার টিলারসহ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। এই কৃষি যন্ত্রপাতির মালিক মূলত অর্থশালী, ক্ষমতাশীল ব্যক্তিরা।

সরকার কৃষি সেচ মূল্য নির্ধারণ না করে দেয়ায় কৃষিযন্ত্রের মালিকরা ইচ্ছে মতো মূল্য নির্ধারণ করে ব্যবসা করছে। সুতরাং কৃষকের জন্য যে ভর্তুকি বা প্রণোদনা তা ভোগ করে সুবিধাবাদী শ্রেণি।

পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রতিটি ইউনিয়নে ৩২টি করে সবজি-পুষ্টি বাগান সৃজন হচ্ছে। ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৯২ কৃষক ও কৃষক পরিবারের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য থাকলেও পরিবার ও কৃষক বাছাই হচ্ছে দলীয় ও স্বার্থ বিবেচনায়।

বাংলাদেশে মোট পরিবার ২৮৬, ৯৫, ৭৬৩টি। এর মধ্যে কৃষি পরিবার ১৫১, ৮৩, ১৮৩টি। ২০১০ সালের শ্রমশক্তির জরিপ অনুযায়ী মোট শ্রমশক্তির মধ্যে কৃষিশ্রমিক ৪০.৬৭%। এর মধ্যে ৭৫% অদক্ষ কৃষিশ্রমিক এই অদক্ষ কৃষিশ্রমিকদের দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করার কোনো রূপরেখা ঘোষিত বাজেটে অনুপস্থিত। প্রতিবছর কৃষিখাতে লোকসান, সরকারি সহায়তা প্রান্তীক কৃষকরা সরাসরি না পাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিতে নিরুৎসাহিত হয়ে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে প্রতিবছর কৃষিশ্রমিক কমছে প্রায় ২.৭৬%। এই হিসেবে বছরে কমছে ৭ লক্ষ। কৃষিশ্রমিক শহরমুখী হচ্ছে। শহরেও জীবিকার অনিশ্চয়তার মুখোমুখী হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী পেশা টিকিয়ে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এই ঝরে পরা শ্রমশক্তি স্বপেশায় স্থায়ীভাবে নিযুক্ত রাখার কোনো পরিকল্পনা বাজেটে নেই।

জিডিবি-তে কৃষিখাতের অবদান ১৪.১০% অথচ জাতীয় বাজেটে মাত্র ৫.৩% বরাদ্দ দিয়ে কৃষিখাতকে টিকিয়ে রাখা আগামীতে সম্ভব হবে না। শ্রম শক্তির মধ্যে মোট নারী শ্রমিক ১ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে গ্রামীণ নারী শ্রমিক ৭৭%। গ্রামীণ মোট নারীর কৃষি কাজে ৭১.৫%। বিনা শ্রমে ৪৫.৬% এবং টাকার বিনিময়ে ৫৪.৪% কাজে নিযুক্ত। বাজেটে নারী শ্রমিকদের শ্রম শক্তিকে গ্রামীণ অর্থনীতি মূল অংশে যুক্ত করে কৃষি অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। সম্ভব হবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা। বাজেটে নারী শক্তিকে ভিত্তিমূল করার কোনো উদ্যোগ নেই। নারী শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি নেই। সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ কৃষিকার্ড বিতরণ করা হলেও নারী শ্রমিকরা এই কার্ডের আওতাভুক্ত হয়নি। দলীয় বিবেচনায় আর্থিক সুবিধা নিয়ে অকৃষকদের কার্ড দেয়া হয়েছে। প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক কার্ড না পাওয়ায় সরকারিভাবে কৃষি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঘোষিত বাজেটে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লোপাট করে দিচ্ছে। জনগণের টাকা সরকার লুটপাটকারীদের কাছ থেকে আদায় করতে পারছে না। এই পর্যন্ত কোনো লুটপাটকারীর শাস্তি দিতে পারে নাই সরকার। প্রতি বছর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে মূলত লুটপাটকারীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। ২০২০-২১ সালে কর প্রণোদনা কাজে লাগিয়ে ১৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা প্রথম ৯ মাসে বৈধ করা হয়েছে। মাত্র ১০% করের বিনিময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে সম্পদের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়নি। সাধারণ করদাতা ক্ষেত্র বিশেষে ২৫% পর্যন্ত কর দিতে বাধ্য সেখানে ১০% কর সুযোগ রীতিমত কালো টাকাকে উৎসাহিত করবে।

বোরো ধান উৎপাদন বাড়াতে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের অতিরিক্ত চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০.৫৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে মাত্র ৬ লাখ টন ধান চাতাল মালিকদের কাছ থেকে ১০ লাখ টন সেদ্ধ ও দেড় লাখ টন আতপ চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও লটারি সিস্টেমের কারণে প্রকৃত বিক্রেতা কৃষক ধান বিক্রি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, দালাল, সরকারদলীয় সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছে না। বাজেটে প্রান্তিক কৃষকের ফসল উৎপাদন, লাভজনক মূল্য নির্ধারণ, বাজারজাতকরণের কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

কৃষকের ধানসহ অন্যান্য ফসলের লাভজনক দাম নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করার জন্য কৃষকরা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে।

আগামী বাজেটে জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে কতিপয় বিষয়কে বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকসহ গ্রামীণ শ্রমজীবীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে করোনা ভ্যাকসিন দিতে হবে, করোনাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বজ্রপাতে নিহত কৃষকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, প্রান্তিক কৃষকসহ গ্রামীণ মজুরদের ব্যাংকসহ এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ মওকুফ করতে হবে। প্রকৃত কৃষকদের তালিকা হালনাগাদ করে ব্যাংক একাউন্ট ও কৃষিকার্ড প্রদান করতে হবে। লটারি সিস্টেম বন্ধ করে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়, ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী ধানের গুদাম নির্মাণ ও সরকারি ক্রয় কেন্দ্র চালু করতে হবে। ধান ও গম বিক্রির টাকা কৃষককে নগদ পরিশোধ করতে হবে, মোট উৎপাদনের ২০% ধান সরকারিভাবে ক্রয় করতে হবে।

গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট চূড়ান্ত করতে হবে। প্রান্তিক কৃষককে বাঁচাতে হবে। কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে। বাঁচবে বাংলাদেশ। জীবন ও জীবিকা চলমান হয়ে দেশ এগিয়ে যাবে সূদৃঢ় আগামীর পথে।

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, কৃষক সমিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.