জলবায়ু পরিবর্তন রোধে চির নতুনের ডাক

হাবীব ইমন :

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরেই শুধু দু’হাজার শত স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রী মিছিলে নেমেছে রাস্তায়। তাদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে হবে, পৃথিবী নামক গ্রহটিকে করতে হবে নিরাপদ, মানুষ-প্রকৃতি-প্রাণীর বসবাস যোগ্য। নেপথ্যে, বলে রাখি, আমার খালাতো ভাইও ছিল তাদের কাতারে; আমি ভাই, দূর থেকে গর্বিত। কেন, অনেক কারণের মধ্যে, একটিই এখানে বয়ান করবো।

একই ঘটনা ঘটেছে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহরে। আগামীতে ঘটবে আফ্রিকার দেশে-দেশে, প্রতিটি শহরে; এবং তারপর, একে একে ইউরোপে, কানাডায়, উভয় আমেরিকায় এবং সকল দ্বীপপুঞ্জে। এমন কি সম্প্রতি ঢাকায়ও একটি মিছিল হয়েছে। কী বিস্ময়, আপন অন্তরের তাগিদেই সংগঠিত হয়েছে এই ভবিষ্যতের মানুষ। আগামীতে এরাই বিশ্ব-পরিচালক, বিশ্ববিবেক, নিয়ন্ত্রক শক্তি। সত্যিই, আজ সাড়া দিয়েছে চির নতুন।

ছোটবেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়লো, টেলিভিশনের পর্দায় আবুল খায়ের অভিনীত একটি বিজ্ঞাপনের একটি সংলাপ–‘সব গাছ কাইটা ফালাইছে, আমি ওষুধ বানামু কি দিয়া!’ সেসময় আমরা এটাও পড়তাম, গাছ আমাদের কী দেয়? অক্সিজেন দেয়। এখন আমাদের অক্সিজেনের অভাব। যেভাবে বৃক্ষনিধন করে বিরাট বিরাট অট্টালিকা বানানো হচ্ছে, ওষুধ কেনো, আমাদের তো অক্সিজেন নেয়ার প্রাকৃতিক উৎসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে। তাইতো আমাদের ভেতরে এতো অস্থিরতা, কেবলই অস্থিরতা আমাদের গ্রাস করছে।

২০১৭ সালে উত্তর আমেরিকাতে প্রচণ্ড শীত লক্ষ্য করা গেছে। কানাডা কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশে মাইনাস ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি নিম্নাংকের তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হয়েছে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জার্মানে দেখা গেছে প্রচণ্ড গরম। ক্রমশ সেখানে ঠান্ডার মাত্রা কমে যাচ্ছে।

নতুন একটি জরিপে দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ১৫টি দেশ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। এছাড়া, ১৫টি দেশের মধ্যে ৯টি বিভিন্ন দ্বীপদেশ। ২০১৮ বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদনে ১৭২টি দেশের ভূমিকম্প, সুনামি, হারিকেন এবং বন্যার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। জার্মানির রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখাম এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়ন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি মানবিক সংস্থা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের উপকূলবর্তী যেসব দেশ সবচেয়ে অরক্ষিত ও হুমকির সম্মুখিন, বাংলাদেশ তার একটি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হবে এবং প্রায় তিন কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কিছু কিছু অঞ্চলের আবহাওয়ার সঙ্কটময় অবস্থাকে আরও সঙ্কটময় করে তুলবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী, মোটামুটি ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলবে। দেশের লাখ লাখ মানুষকে নানা সময়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বহুলাংশে শুরু হয়েছে আঠারো শতকের শেষ ভাগে শিল্পায়নের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। সেই থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বেড়েই চলেছে।

এতটাই গরম যে সেখানে তাপ বাড়ার কারণে বনের গাছে গাছে আগুন লেগে গেছে। গত বছর টেক্সাসেও এটা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়াতেও প্রায়ই হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যামাজনে হয়েছে। অর্থাৎ গড় তাপমাত্রাটি বাড়ছে। কিন্তু আবহাওয়ার যে তীব্র অংশ রয়েছে সেগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে হাইড্রোলোজি সাইকেল-এ, আমরা যেটাকে পানিচক্র বলি। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বাষ্পায়ন বাড়বে। বাষ্পায়ন বাড়লে বৃষ্টিপাত বাড়বে।

শুধু এটুকু হলে ভয় ছিল না। ভয়টা হচ্ছে বৃষ্টিপাতের বর্তমান প্রচলিত ধারাতে মারাত্মক পরিবর্তনের বিষয়টি। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন হবে না, যখন হওয়ার কথা নয় তখন হবে। আমরা জানি আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি হয়। জৈষ্ঠের মাঝামাঝিতে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। কিন্তু বিগত বছরে আমরা দেখেছি চৈত্র মাসের বৃষ্টি আষাঢ় মাসের মত রূপ ধারণ করেছে। একই সাথে আমরা অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বৃষ্টি হতে দেখেছি। ফলাফল হাওর অঞ্চলে প্রচণ্ড বন্যা। বন্যার কারণ সরকারি হিসেবে বাধ টপকে পানি ঢুৃকেছে। বেসরকারি হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি ছিল। মূল কথা হচ্ছে, মার্চ মাসের বৃষ্টির কারণে নদীর পানির যে উচ্চতা হয়েছে সেটা এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে সাধারণত নদীর পানির যে স্তর থাকে সেটার তুলনায় তা ছিল অস্বাভাবিক। একইভাবে আমরা অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বৃষ্টি হতে দেখেছি।

অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বৃষ্টির কারণে পানির চাপে দেশের বহু নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। চৈত্র-বৈশাখ মাসের বৃষ্টির কারণে বোরো ধান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি অগ্রহায়ন-কার্তিকের বৃষ্টির কারণে আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হঠাৎ করে এ ধরনের অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টির কারণে পার্বত্যাঞ্চলে ভূমিধস হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে, বজজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে, নদী ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে এবং জীবিকার ওপরে। জীবিকার ওপর প্রভাব পড়লে এবং খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে মানুষ দেশান্তরি হবে।

১৯৯২ সালে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে যখন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন পৃথিবীর ৩টি লক্ষমাত্রা ছিল। প্রথমত জীব বৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঠেকানো, দ্বিতীয়ত খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা এবং তৃতীয়ত টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ২০১৫ সালে এসে পৃথিবীর মাথা ব্যথার কারণ তীব্র খাদ্যাভাব নিয়ে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, উষ্ণায়নের কারণে অচিরেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে মহিলা ও শিশুরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়ন থেকে যেন কার্বন গ্যাস নির্গত কম হয় সে ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয় দায়িত্ব নিতে হবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নানা রোগব্যাধি বৃদ্ধি ছাড়াও হিট স্ট্রোকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, জলবায়ু পরির্তনকে মোকাবিলা করতে পারে এই ধরনের প্রজাতির ফসল উদ্ভাবন করতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তন কিভাবে প্রভাব পড়ছে, তার একটু আলোচনা করছি।

জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি

আমরা যে ব-দ্বীপে আছি এবং সমুদ্রের সঙ্গে যে সম্পর্ক, তাতে আমরা খুব নাজুক পরিস্থিতিতে আছি। এর বিরূপ প্রভাব এমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে যাচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্রের স্তর যদি এক মিটার বাড়ে, তাহলে আইপিসিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ জমি সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়, তাতে প্রায় ২ কোটি মানুষের জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা অনুমান করতে পারি, এত ছোট দেশে যদি ২০ শতাংশ জমি সমুদ্রে চলে যায় এবং যদি প্রায় ২ কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়, তাহলে তাদেরকে দেশের মধ্যে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ নেই। এতে শহর এলাকায় জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়বে। সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলো মানুষের এতটা চাপ সহ্য করতে পারবে না। তাই সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার হুমকি দেখা দেবে।

অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত আট লাখ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ২০১৬-১৭ সালে নির্গত হওয়া কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কার্বন নিঃসরণের বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে বর্তমান শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পবিপ্লব সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার আশংকা প্রবল। এতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়বে। গত অর্ধশতক জুড়ে গবেষণা তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আবহাওয়ার তাপমাত্রা বৃৃদ্ধির সঙ্গে কার্বন ও অন্যান্য ‘গ্রিনহাউস গ্যাস’ নিঃসরণের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির চাঙ্গাভাব বহাল থাকার সময় বাড়তি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বাতাসে বেশি মাত্রায় কার্বন দূষণ হয়েছে। আবহাওয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বৈরি পরিবেশের প্রভাবে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, অসময়ে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ফসলের মৌসুমে বৃষ্টিহীন, মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াসহ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো দুর্যোগ বেড়ে যাবে।

খাদ্য-নিরাপত্তা ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনকে সম্পূর্ণভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সাধারণত বিশ্বে কয়েক হাজার উদ্বাস্তু সৃষ্টি হলেই নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে চলে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্ততি নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ আসছে। ২০ শতাংশ জমি কমবে, জনসংখ্যা বাড়বে। আর লবণাক্ততা যেটা বাড়বে, তার ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে। ইতোমধ্যে মিঠা পানির জলাধারেও লবণাক্ততা এসে যাচ্ছে। তাই খাদ্য উৎপাদনে যে সক্ষমতা এখন আছে, সেখানে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে যে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আছে, সেটা ৮ শতাংশ কমে যাবে। গম উৎপাদন কমবে ৩২ শতাংশ। কমবে কৃৃষিজমি, বাড়বে মানুষ। সুতরাং যে খাদ্য-নিরাপত্তা এখন আছে, সেটা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা হয়তো ধরে রাখতে পারব না।

লবণাক্ততা বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা প্রচণ্ড লবনাক্ত হয়েছে এবং এই লবনাক্ততার সীমা ক্রমান্বয়ে উত্তরাঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খাবার পানির লবনাক্ততা বাড়ছে। খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে মানুষ পানি কিনে খাচ্ছে। সুন্দরবনে লবণাক্ত পানি ভেতরে চলে আসছে, এ কারণে অনেক গাছ-পালা মরে যাচ্ছে, সমুদ্রের স্তর বাড়ার কারণে এর একটা অংশ তলিয়ে যাবে এবং যাচ্ছে।

বঙ্গোপসাগর আর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের এই সংযোগস্থলে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। আমরা দেখেছি সুন্দরবন এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের কিভাবে বর্মের মতো সাইক্লোনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছে। এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাইক্লোনের প্রবণতা বেড়েছে। এবং আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ও ভারতের অন্যান্য সাইক্লোন প্রবণ অঞ্চলের তুলনায় সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল সাইক্লোন দ্বারা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর তাই সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য এক প্রাকৃতিক সুরক্ষা। সুন্দরবন ধ্বংস করার সরকারের পক্ষ থেকে একধরনের ষড়যন্ত্র চলছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মালিকানায় গঠিত বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে তৈরি করতে যাচ্ছে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র। প্রথমে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও ভবিষ্যতে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ২৬৪০ মেগাওয়াট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হতে যাচ্ছে ৫৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অরিওন বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই দুইটি বিদ্যুৎকেন্দ্রই সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে। আমাদের পাশের দেশ ভারত। যার মালিকানা রয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাদের নিজেদের দেশের ইআইএ গাইডলাইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা কারখানা নির্মাণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে সরকার বারবার গণমাধ্যমের কাছে দাবি করছে এই কেন্দ্র সুন্দরবনের কোনও ক্ষতি করবে না। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২০ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও বাড়বে। মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়তে থাকবে। পানিবাহিত রোগ বাড়বে। জনগণের জীবন ও মানের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট বলছে, সাত কোটির বেশি মানুষ আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এটা বিশ্বের বৃহত্তম গণবিষক্রিয়ার ঘটনা।

দিশেহারা প্রজাতি

উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক উদ্ভিদ ও প্রাণী নিজ নিজ স্থান পরিবর্তন করেছে। যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ কামিল পারমেসান বলেন, হাজারো প্রজাতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত শতকে অনেক প্রজাতি এলাকা পরিবর্তন করে মেরু অঞ্চল বা উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে চলে গেছে। সব গবেষণার মধ্যে অর্ধেকের বেশি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রজাতির স্থানান্তর ঘটেছে এবং অধিকাংশ বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অন্যান্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদে আগাম ফুল ফোটা, পরিযায়ী পাখির আগাম আগমন প্রভৃতি। উদ্ভিদ, গুল্ম, প্রজাপতি, পাখি, স্তন্যপায়ী, উভচর, কোরাল, মেরুদণ্ডহীন ও মাছের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রবল ভাবে দেখা যাচ্ছে।

এছাড়া অতিরিক্ত নৌযান চলাচলের ফলে সুন্দরবনের বাস্তুব্যবস্থা (ইকোসিস্টেম) বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, গরান বন ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও প্রকল্প নির্মাণ পর্যায়ে পশুর নদীতে ড্রেজিং করার কারণে নদীর পানি ঘোলা হয়ে নদীর বাস্তুব্যবস্থা বিপন্ন হবে এবং জেটি ও নদীতীর সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামো নির্মাণের সময় গরান বনভূমির অনেক গাছ ও ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করতে হবে। বিভিন্ন পাখি, বিশেষ করে সারস ও বক জাতীয় পাখির বসতি নষ্ট হবে।

কৃষি উৎপাদন হ্রাস

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ঋতুচক্র বদলে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের কৃষি উৎপাদনের ওপরে পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য যেসব ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হচ্ছে তা কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। অনেক প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজও করছে না। বাংলাদেশে এখন আর আগের মতো ষড়ঋতুর বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। শীতের পর গ্রীষ্ম আসলেও বসন্ত যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। হেমন্তের উপস্থিতিও সেভাবে বোঝা যায় না। আবার বর্ষা আসছে নির্ধারিত সময়ের অনেকটা পরে। জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমনের উৎপাদনের ওপর। যার ফলে কৃষকই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ধানের জাত উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে কৃষকেরা ধান উৎপাদন থেকে সরে এসে সবজির দিকে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে পড়বেন। এতে ধান উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ফিড দ্য ফিউচার উদ্যোগের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা মাটির গভীরে সার স্থাপন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের উৎপাদনে নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার কমাতে সহায়তা করছে। এই প্রযুক্তি চালের পুষ্টি বৃদ্ধি ঘটায় এবং চালের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী, সেটা নিয়ে আলোচনা করছি। ১০ বছর আগে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন এই বিষয়ে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান ২০০৯’ নামে যে দলিল অনুমোদন করে, ওই সময়ে পৃথিবীর কোন দেশে ওই পরিমাণ প্রস্তুতি ছিল না।

বাংলাদেশ ২০০৯ এ বলতে পেরেছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের কি করা উচিত, বিশ্বের কি করা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এর পর প্রায় ৮-১০ বছর পার হয়ে গেল এ ব্যাপারে বাংলাদেশের খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। এই না পারার কারণ হিসেবে প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করতে চাই। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছ কাতার। জাকার্তা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিশ্বের কাছ থেকে টেকনোলজি চেয়েছে এবং তারা মডেল করে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে দায়িত্বটা কার? উত্তরটা হচ্ছে সকলের। বিশেষ করে যুব সমাজের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এমন কাজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। সুন্দরবন রক্ষাসহ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য, অখন্ড বিশ্বের অতুলনীয় সম্পদ; এটি রক্ষা করা সব মানুষেরই দায়িত্ব।

মনে হচ্ছে, আমার মত প্রাণিটিকেও নড়ে বসতে হবে, ডাক শুনছি চির নতুনের, ভুবনব্যাপি। যুব সমাজের কাছে অনুরোধ করছি, এই জাগরণের যৌক্তিক পরিণতি কী হতে পারে, কী হবে; সেখানে আমাদের দায় বা দায়িত্ব কতটুকু; ভেবে দেখুন এবং প্রস্তুত হোন। আর কোনো ব্যর্থতা বা পিছুটান, ক্ষমা করবে না ভূ-মণ্ডল।

লেখক : সভাপতি, ঢাকা মহানগর, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

Leave a Reply

Your email address will not be published.