জনগণের অভ্যুত্থানই সম্পদ লুটেরা ও ভোট লুটেরাদের পরাজিত করবে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন  

বহু আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়ে গেল। উদ্বোধনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েক লাখ লোক সমবেত করা হয়েছে। এখনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট ‘পদ্মা সেতু জ¦র’-এ কাঁপছে দেশ। অতিবৃষ্টি ও পাশের দেশ ভারতে অতিবর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ী ঢলের কারণে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাসমূহের অধিকাংশ বন্যার পানির নীচে। সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের ১৫ জেলার ৭৩ উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। সারাদেশে লাখ লাখ মানুষ বন্যায় বিপর্যস্ত। করোনা অতিমারির চতুর্থ ঢেউ আবার ধেয়ে আসছে। সনাক্ত উঠে এসেছে ১৩ শতাংশে। এক দিকে আড়ম্বর, উৎসব। অন্যদিকে দুর্গতি, আহাজারি। গত সপ্তাহটা গেল এভাবেই।

চলমান বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার সবকটিই প্লাবিত হয়েছে। ঘর-বাড়ি, ফসল, ধান, চাল, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের গোলার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। টানা কয়েক দিন পানির নিচে থাকায় সেই ধান থেকে চারা গজিয়েছে। শাল্লা, দিরাই, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ এই পাঁচটি উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং খাবারের অভাবে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়কর অবস্থা চলছে। ইতোমধ্যে ২৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

মানবিক এই বিপর্যয়কালে সরাকারের অগ্রাধিকার নিয়ে জনমানসে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরকার বন্যার্তদের জন্য সাহায্যের যে পরিমাণ ঘোষণা করেছে তা খুবই অপ্রতুল, হাস্যকর ও অমানবিক। সিলেট বিভাগে বন্যার্তদের জনপ্রতি বরাদ্দ ৬ টাকা পঞ্চান্ন পয়সা, আধা কেজি চাল।

হু হু করে মাথাপিছু আয় বাড়ছে। গত বছর যা ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার। বর্তমান ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা বা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। কৃষক-ক্ষেতমজুর, গার্মেন্ট শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিকের কল্যাণে মাথাপিছু আয়ের এ বৃদ্ধি সম্পন্ন হলেও সাধারণভাবে দেশের সাধারণ মানুষ এর লাভ পাচ্ছে না। বন্যা বা অন্য কোন দুর্যোগ দেখা দিলে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব প্রকটভাবে ফুটে উঠে। তখন ধনিক লুটেরাগোষ্ঠীর সরকারকে মাথাপিছু আয় বাড়ানো বিপর্যস্ত মানুষগুলোর পাশে পাওয়া যায় না।

২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে দেশ থেকে বিভিন্ন উপায়ে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ৭ শতাংশ হারে কর প্রদানের মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে বৈধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে এ বাজেটে। গত ১৬ বছরে এ দেশ থেকে ১১ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। দেশের গরিব মানুষরা দেশে-বিদেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের জন্য আয় করে। অপরদিকে লুটেরা ধনিকশ্রেণির সরকারের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে লুটেরা ধনিকরা ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস, রপ্তানিমূল্য দেশে প্রত্যাবাসন না করে, হুন্ডির মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে ৬৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্রাঁ। প্রতি ফ্রাঁ ৯৫ টাকা করে ধরলে দেশী মুদ্রায় যা ৮ হাজার ২৭৫ কোটি। গত বছর এই টাকার অঙ্ক ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ২ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫৫ শতাংশ। ২০০২ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল মাত্র ৩ কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ। গত দুই দশকে বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছে। তাদের আমলে ২০১২ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্রাঁ। মাত্র ৯ বছরে সুইস ব্যাংকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ২৮০ শতাংশ। অর্থাৎ এ সরকার তাদের শ্রেণি মিত্রদের এ দেশের মানুষের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছে। আবার সে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা শুধুমাত্র ৭ শতাংশ কর প্রদানের মাধ্যমে বৈধ করে দিচ্ছে। যেখানে একজন দেশপ্রেমিক মানুষকে তার আয়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে প্রদান করতে হয়। দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ হলে ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান করতে হয়। এ জন্যই এ সরকারকে সিপিবি লুটেরা স্বার্থের সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র কায়েমের। এর জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। দুই লাখ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। কিন্ত স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরের ২৫ বছর আওয়ামী লীগ, ১২ বছর বিএনপি, ৯ বছর জাতীয় পার্টি, বাকী সময় সামরিক বাহিনী দেশ শাসন করেছে। এরা বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে সমাজে, রাষ্ট্রে বৈষম্যবৃদ্ধি করেছে।

১৯৭১ এরপর সদ্য স্বাধীন দেশ পরিচালনার ভার পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। তাদের হাতে দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষমতা ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী তাজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীন দেশে অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন অঙ্গীকারে দেশ পরিচালনা করার ব্যর্থ প্রয়াস করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া সম্পদ দখল ও কালোবাজারির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে গঁজিয়ে ওঠা নব্য ধনিকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ফলে মন্ত্রিত্ব হারিয়ে দলীয় রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বিরোধীশক্তির প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি বঙ্গবন্ধুকে অসহায় করে ফেলে। তাই তিনি নিজের দলের লোকদের চোর, চাটার দল বলে আক্ষেপ করেছিলেন। এ ধরণের পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে সিপিবি ত্রিদলীয় ঐক্যজোটের সদস্য হয়েও ‘ব্যর্থ সরকার বাতিল কর’ ডাক দিয়েছিল। ’৭৪ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায়, দেশের সামগ্রিক সংকটজনক অবস্থা, জনজীবনের গভীর সংকট, দুর্ভিক্ষ, দ্রব্যমূল্যের অবিশ্বাস্য ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, শাসকদল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব সংকট, জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্নতা, কতক প্রগতিশীল নীতির ক্ষেত্রে সরকারের নতি স্বীকার ও নীতির পরিবর্তন প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে ‘ব্যর্থ সরকার বাতিল কর’ ডাক দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির ঐ একই প্রস্তাবে বলা হয়- ‘এভাবে দেশ চলতে পারে না। জনসাধারণ আওয়ামী লীগ দলের কাছে আর কিছু আশা না করলেও বঙ্গবন্ধুর উপর জনগণের আস্থা শেষ হয়ে যায়নি।’ সে কারণেই ব্যর্থ সরকার বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিকল্প বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সৎ, যোগ্য, দৃঢ়চিত্ত, দক্ষ ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক প্রগতিশীলদের নিয়ে সরকার গঠন করার দাবি উত্থাপন করা হয়। পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভার মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যর্থ সরকার বাতিলের দাবিতে প্রচারণা শুরু করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রহাতে যারা যুদ্ধ করেছিল তারা গ্রামের কৃষক-ক্ষেতমজুর, শহরের শ্রমজীবি মানুষের সন্তান। তারা দুই তিন সপ্তাহের ট্রেনিং সম্বল করে হাতে গ্রেনেড আর থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ে অকাতরে জীবন দিয়ে মুক্তি ছিনিয়ে এনেছিল। আজকে দেশের ‘সমৃদ্ধিযোদ্ধা’ সেই একই কৃষক-শ্রমিক, আর তাদের সন্তানগণ যারা গার্মেন্ট কারখানার ফেøারে আর প্রবাসে নিজের যৌবনকে বলিদান করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেরা থাকছে বঞ্চিত। সেই ’৭১ এরই পুনরাবৃত্তি। নিজের বোনা ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে লুটেরা হার্মাদরা। বঞ্চিত মানুষকে ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে চমকপ্রদ পরিসংখ্যান আর চটকদার প্রকল্পের মাধ্যমে। সেই কারণেই বন্যায় অনাহারি মানুষ অগ্রাধিকার পায় না। অগ্রাধিকার পায় পদ্মা সেতুর উদ্বোধন দেখতে জড়ো করানো মানুষের টয়লেট নির্মাণ। এই যে লুটেরা ব্যবস্থা, তার অবসান জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন গণসংগ্রাম, গণ অভ্যুত্থান। হতাশার কিছু নাই। শাসক যত জৌলুস দেখাক তা তার উৎখাতকে ঠেকাতে পারবে না। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। নিলে শাসকরা দেখতো, আইয়ুব খান ’৬৮ সালের অক্টোবরে ক্ষমতারোহণের দশ বছরপূর্তির জাকজমকের মাত্র তিন মাস পর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। জনতাই ভরসা। সম্পদ লুটেরা ও ভোট লুটেরাদের জনগণের অভ্যুত্থানই পরাজিত করবে।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.