”ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা বুয়েটকে অবরুদ্ধ করবে”

ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা বুয়েটকে অবরুদ্ধ করবে তাই রাজনীতি বন্ধ না করে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতৃবৃন্দ।

শনিবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ১২ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন কেন্দ্রীয় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর সভাপতি আল কাদেরী জয়, আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভপতি মেহেদি হাসান নোবেল, ছাত্র ফ্রন্ট (মাকর্সবাসী) এর সভাপতি মাসুদ রানা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন সন্ত্রাস বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে এ ধরণের নিষেধাজ্ঞা বুয়েটকে অবরুদ্ধ করবে, বিরোধী মত দমনের প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে। অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সকলের জন্য অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির দাবিও জানান তারা।

সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে নেতৃবৃন্দ বলেন:

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার নৃশংসতায় সারা দেশের মানুষ স্তম্ভিত। এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে সারা দেশে পাবলিক শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপর কী নির্যাতন-নিপীড়ন সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ চালায় তার একটা চিত্র আপনাদের মাধ্যমে উঠে এসেছে। যদিও আমরা বহু আগে থেকেই গণরুম- গেস্টরুমে ছাত্র নির্যাতন বন্ধের দাবি করে আসছিলাম, দাবি করেছিলাম সিট বন্টনে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কিন্তু সেসব কোন কিছুই কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কানে তোলেনি। যার ফলশ্রুতিতে প্রাণ হারাতে হল নিরীহ শিক্ষার্থী আবরারকে, ধ্বংস হয়েছে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন।

আবরার এর মৃত্যুর পর গত প্রায় ৫ দিন ধরে বুয়েট এর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছে। গতকাল ১১ অক্টোবর বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রশাসনের সাথে এক সভায় বসে সেখানকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সভায় বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় প্রগতিশীল ছাত্র জোট এই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

আমরা মনে করি, এটি একটি ভয়ংকর অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং সকল ধরণের বিরোধী মত এবং তার ভিত্তিতে সংগঠিত শক্তিকে দমনের একটি হাতিয়ারমাত্র। এটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে একটি প্রতারণাও বটে। কার্যত বুয়েট চলে ’৬১ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যে অধ্যাদেশে বুয়েটে ইতোমধ্যেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, বুয়েটে গত এক দশকে ছাত্র রাজনীতি ছিলই না। শুধু ছিল রাজনীতির নামে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আর নির্যাতন। বিরোধী কোন ছাত্র সংগঠনই ক্যাম্পাসে কাজ করতে গেলে নির্মমভাবে তাদের দমন করা হয়েছে। ২০১১ সালে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বুয়েট শাখার তৎকালীন আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের চাঁদাবাজির বিরোধিতা করায় তাদেরকে দফায় দফায় নির্মম আক্রমণের শিকার হতে হয়। বুয়েটে কর্মসূচীর প্রচার চালাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় প্রগতিশীল ছাত্র জোট নের্তৃবৃন্দকেও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। আবরার ফাহাদ হত্যাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ছাত্রলীগের এই একচ্ছত্র সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, অগণতান্ত্রিক আচরণ, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। বাস্তবে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছাত্র রাজনীতি নয়, শাসক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের রাজনীতির বিরুদ্ধে। ক্যাম্পাসে, হলে হলে টর্চার সেলগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। প্রশাসনের নির্লিপ্ততা যা প্রকারান্তরে পৃষ্ঠপোষকতারই নামান্তর, সে কারণেই এই টর্চার সেল গুলো গড়ে উঠেছে এবং টিকে থেকেছে এতদিন ধরে। আমরা এর আগেও দেখেছি বিভিন্ন সময়ে এভাবেই প্রকাশ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন তকমা দিয়ে মারধর করার ঘটনা। এর বিরুদ্ধে প্রশাসন কখনোই কোন ব্যাবস্থা নেয়নি। এখানে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই ঘটনার মূল উৎস যে অগণতান্ত্রিক চর্চা, সেই অগণতান্ত্রিক চর্চাকেই আড়াল করে আরো শক্তিশালী করবার আয়োজন করেছে বুয়েট প্রশাসন। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।

নিহত আবরার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল ভারত বাংলাদেশ সমঝোতা চুক্তি নিয়ে, যেটি একটি রাজনৈতিক বিষয়, তার রাজনৈতিক অধিকার এই চুক্তির বিরোধিতা করা। এই খুনের জন্য দায়ী এই রাজনৈতিক অধিকারকে যারা দমন করে তারা। কিন্তু রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে এই খুনের দায় চাপানো হল আবরারের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার উপরেই। এবং এই নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজের যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদ, যেকোন রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য, মতামত দেওয়ার অধিকার দমন করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বুয়েট প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হল। অতীতে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে বুয়েট শিক্ষার্থী সাবেকুন্নাহার সনি হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন দমন করতেও বুয়েট প্রশাসন ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে কি শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ হয়েছে? বরং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বা হত্যাকান্ডের দায় ছাত্ররাজনীতির উপর চাপিয়ে এরা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রতি ছাত্রদের অসন্তোষকে আড়াল করতে চাইছে। শাসকদলগুলো এর মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয় কেননা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এরা তাদের কার্যক্রম ঠিকই পরিচালিত করে কিন্তু সকল প্রতিবাদের শক্তির পথকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ কিন্তু তাতে কি সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম কমেছে? এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক ভাবে চমকপ্রদ মনে হলেও এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বদ্ধ পানিতে যেমন শ্যাওলা-কীট জন্মায় তেমনি রাজনীতিহীন বদ্ধ পরিবেশে জন্ম নেবে কূপমন্ডুক-মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল নানা চিন্তার উপাদান।

এর আগেও আমরা দেখেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জোবায়ের এর লাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকর, হাফিজুর মোল্লার লাশ। গত ৪৫ বছরেই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে খুন হয়েছে ১৫১ জন শিক্ষার্থী। ক্ষমতার আন্তকোন্দলে ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হল দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়েছে ৮ জন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকান্ড ৫ টি। ২০১২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বহহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড। এই তালিকায় আরো নাম রয়েছে
রুয়েট, যবিপ্রবি, শাবিপ্রবি, হাবিপ্রবিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। বিচার কার্যকর হয়নি একটিরও। প্রশ্ন হচ্ছে এই যে খুন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এইগুলো কি একদিনে তৈরি হয়েছে? এই সংস্কৃতি বন্ধের পথ কোনদিকে? এসব কিছু জানতে হলে আসলে চোখ দিতে হবে ঘটনাগুলোর উৎসে । উৎস বা উৎপত্তি স্থান টিকিয়ে রেখে আর যাই করা হোক না কেন, এই লাশের মিছিল বন্ধ হবে না। শাসকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভয় পায়, তারা জানে এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে প্রতিরোধের শক্তি আছে তা যেকোন মুহুর্তে ক্ষমতার মসনদকে কাপিয়ে দিতে পারে। তাইতো তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আর এ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সৃস্টি করে টর্চার সেল। ইতিমধ্যেই ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৮টি টর্চার সেলের কথা পত্রিকায় এসেছে। এই টর্চার সেলগুলোতে চলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, শারীরীক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। এর মাধ্যমেই তারা একদল মৃত মেরদন্ডহীন মানুষ তৈরি করতে চায়, একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখে। যেন কেউ কোন প্রতিবাদ করতে না পারে। শিক্ষার্থীদের এই ভয়ই ক্ষমতাসীনদের শক্তি। শাসকদের এই পরিকল্পনা তাদের লুটপাটের রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা। প্রতিরোধের রাজনীতিই এই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে পারে। তাই ছাত্ররাজনীতিকে তাদের এত ভয়।

আবরার হত্যাসকান্ডসহ বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সকল ক্যাম্পাস হত্যাকান্ডের বিচার কার্যকর করা এ মূহুর্তে জরুরি, তার সাথে সাথে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হলগুলোতে সন্ত্রাস, অস্ত্র, দখলদারিত্ব, টর্চার সেল, গেস্টরুম ও গণরুমে নির্যাতন বন্ধ করার আরো বেশি জরুরি, তা না হলে পূর্বের মতই প্রশাসন যদি নির্বিকার থাকে, যদি হলের সিটের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের কাছে না থেকে সন্ত্রাসীদের কাছেই থাকে, তবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও খুনি উৎপাদন বন্ধ থাকবে না, অত্যাচার বন্ধ হবে না। এই অত্যাচার বন্ধের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংগ্রাম। আমরা দাবি জানাচ্ছি অবিলম্বে আবরার সহ সকল ক্যাম্পাস হত্যাকান্ডের বিচার ও রায় কার্যকর করতে হবে, হলে হলে টর্চার সেল, গেস্টরুম গণরুমে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে, প্রথম বর্ষ থেকেই প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে সকল শিক্ষার্থীর হলের সিটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক ভাবে সকল ছাত্র সংগঠনকে বুয়েটসহ সকল ক্যাম্পাসে রাজনীতি করার অধিকার দিতে হবে, রাজনীতির নামে অপরাজনীতির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.