ছদ্মবেশী

মূল: মন্তেরিও  লোবাতো 

অনুবাদ: মনির তালুকদার 

লেম্বারডির রাজা প্যাডো ডি সিলভা এক অনিন্দ্য সুন্দরী, বুদ্ধিমতি এবং সৎ চরিত্রের বিধবাকে বিয়ে করে পরম সুখে-শান্তিতে আছেন। এমন সময় কপাল দোষে প্রাসাদের এক পরিচালকের ভাল লেগে গেল একেবারে রাজপত্নীকে। ভৃত্য হলেও সে কিন্তু আর পাঁচ দশটা লোকের মত নয়। বুদ্ধিসুদ্ধি তার ভালই ছিল, চোহারায় এবং ব্যক্তিত্বে রাজার চেয়ে কোনও অংশে খাটো নয় সে।

বুদ্ধিমান ছিল বলেই সে বুঝে গিয়েছিল যে, ওই ভালবাসা একেবারে খাপছাড়া এবং এই এক তরফা ভালবাসা তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। লোক জানাজানির ভয়ে এ নিয়ে না পারবে সে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আলোচনা করতে, না পারবে খোদ রাণীর কাছে গিয়ে মনের কথা বলতে। রানীকে ভালবাসার কথা বলতে যাওয়া আর ফাঁসির কাষ্ঠে চড়তে যাওয়া একই ব্যাপার। আবার ভৃত্যের চোখের ভাষা পড়ে রাজপত্নী যে তাকে আদর করে কাছে টেনে নেবেন এ রকম আশা করাও অবাস্তব। তবে তার সন্তুষ্টি একটাই সে এমন একজনকে ভালবেসেছে যাকে ভালবাসা উচিত।

রাণী যখন ঘোড়ায় চড়তেন তখন এই ভৃত্যের ঘোড়াটাই তিনি বেছে নিতেন, এটাই ছিল ভৃত্যের বড় একটা পাওনা। ঘোড়ায় চড়বার সময় রানীর জামা-কাপড়ের একটু ছোঁড়া পেলেই সে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করত। ব্যাস, এটুই ছিল তার সান্ত¡না। রাণীর সঙ্গে কথা বলে বা চিঠি লিখে মনের কথা জানানোর কী পরিণাম হতে পরে সে বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহাল ছিল বলে ওই পথে না গিয়ে মনের আশা বা বেদনা সে মনেই রেখেছিল। কাউকে সে মনের হদিশ দেয়নি। সাধারণত দেখা যায়, আশা সেখানে ক্ষীণ ভালবাসা সেখানে তীব্র। রাজভৃত্যের দশা হলো তাই। প্রেমাস্পদকে পাবে না জেনেও সে মন ফেরাতে পারল না। কিন্তু না ভালবাসার মানুষটিকে, না অন্য কাউকে বলতে পেরে নিদারুণ মনোকষ্টের শিকার হলো সে। শেষে ভাবল, এইভাবে বেঁচে থেকে কি লাভ- মরে যাওয়াই ভাল। তবে মরতেই যদি হয় তো মৃত্যুর কারণটা অন্তত রানীকে সে জানিয়ে যাবে। তাহলে মরেও শান্তি পাবে খানিকটা।

মনে মনে এত কথা ভাবলেও রানীকে চিঠি লেখা বা সামনাসামনি প্রেম নিবেদন করা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। শেষটায় সে ঠিক করল ‘রানীর মন পাওয়া এ জীবনে হবে না, তবে তার সঙ্গে একবার এক শয্যায়-’ এটা সম্ভব যদি সে কোনওভাবে একবার রাজার জায়গাটা নিতে পারে। রাজা যে প্রতি রাত্রে রাণীর কাছে যান না সেই খবর ভৃত্যের কাছে ছিল। তাই রাজা কখন রানীর কাছে যান, কিভাবে যান, কোন পোশাকে যান এ বিষয়গুলোর ওপর সে খুব ভালভাবে নজর রাখতে শুরু করল।

রানীর এবং রাজার খাস কামরার দূরত্ব ছিল অনেকখানি, আবার রাণীর খাস কামরার বাইরে বেশ একটা লম্বা হলঘর ছিল। ওই হলঘরে আত্মগোপন করে পরিচালক রাজার চালচলন লক্ষ্য করল বেশ কয়েকদিন ধরে। সে দেখল, রাজা নিজের ঘর থেকে খুব সুন্দর একটা পোশাক পরে বের হন। তার এক হাতে থাকে একটা আলো, অন্য হাতে থাকে ছোট একটা লাঠি। রাণীর কামরার সামনে পৌঁছে হাতের লাঠি দিয়ে দরজার ওপর দু’বার হালকা করে টোকা দেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে কেউ দরজা খুলে দিয়ে রাজার হাত থেকে আলোটা নিয়ে নেয়। রাজা কিংবা ওপাশের কেউ কোনো কথা বলে না। কয়েক রাত্রি এভাবে রাজার গতিবিধি লক্ষ্য করে একবার সে মৃত্যুকে বরণ করার জন্য তৈরি হলো।

প্রথমে খুব ভাল করে স্নান করল যাতে তার শরীরের কোনো অচেনা গন্ধ রানী না পায়। তারপর রাজা যে ধরনের পোশাক পরে রানীর ঘরে যান সেই পোশাক পরে এক হাতে একটি আলো এবং অন্য হাতে একটি ছোট লাঠি নিয়ে রানীর শোবার ঘরের দরজায় টোকা দিল। হলঘরে লুকিয়ে থেকে নাটকের ওই দৃশ্য পর্যন্ত সে দেখেছে। কিন্তু তার পরের দৃশ্যগুলো তো তার অজানা। ভয়ে তার বুক টিপ টিপ করতে লাগল। এক বা দু’বার টোকা দিতেই ঘুম জড়ানো চোখে এক পরিচালিকা দরজা খুলে দিয়ে তাড়াতাড়ি ছদ্মবেশী রাজার হাত থেকে আলোটা নিয়ে ওখান থেকে সরে চলে গেল। ছদ্মবেশী একটি কথাও না বলে পর্দা ঠেলে রানীর ঘরে ঢুকল।

রানীর পালংকের পাশে একটুখানি চুপ করে দাঁড়িয়ে হয়তো সে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা চিন্তা করে নিল। তারপর সোজা একেবারে বিছানায় রানীকে বুকে টেনে নিয়ে সে কী আদর। ভাবভঙ্গিতে রাজা সাহেব যেন বোঝাতে চাইলেন যে আজকের মধুরাতে কথা বলতে বা শুনতে তার কোনও স্পৃহা নেই। আজ তিনি যা চান তা একান্তাই ভালবাসা, এরপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লান্ত ছদ্মবেশীকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হলো নতুবা যে আশাতীত আনন্দ সে আজ বুদ্ধিবলে লাভ করেছে তা চিরস্মরণীয় বিষাদে পরিণত হয়ে যাবে। বিছানা পরিত্যাগ করে পুনরায় পোশাক ছড়িয়ে হাতে আলো নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব রাণীর শয্যাগৃহ ছেড়ে সে নিজের ছেঁড়া কাঁথার উপর গা এলিয়ে দিল।

ছদ্মবেশী বিদায় নেবার কয়েক মিনিট পর আসল রাজাকে দেখা গেল রানীর ঘরে ঢুকতে। অত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজাকে পুনরায় ফিরে আসতে দেখে রানীও কম আশ্চর্য হলেন না। তিনি তো বলেই বসলেন, ‘মহারাজ আজ সত্যিই অবাক করলেন আমাকে। এতক্ষণ আমার সঙ্গে কাটিয়ে আবার ফিরে এলেন। তা তখন যাবার দরকার কী ছিল? থেকে গেলেই তো পারতেন।’

রানী যতটা না অবাক রাজা সাহেব তার চেয়েও বেশি অবাক হলেন। বুদ্ধিমান হবার সুবাদে তিনি বুঝে গেলেন অন্য কেউ রানীকে প্রতারণা করে গেছে। এত বড় লজ্জার কথা যখন রাজমহলের কেউ এমনকি রানীও জানেন না তখন এ নিয়ে হৈ চৈ করে লাভ নেই। অন্য বোকা লোক হলে তখনই প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুরু করে দিত- ‘না’ আমি তো আগে আসিনি, তা হলে কে এল? কী করে এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল? যদি বাইরের লোক রানীর ঘরে ঢুকে যেতে পারে তাহলে রাজার নিরাপত্তা কোথায়? রাজা ভেবে দেখলেন এসব নিয়ে এখনই ঘাঁটাঘাটি করে লাভ নেই। রানী হয়তো নিজেকে কলুষিত ভেবে চির জীবনের জন্য মনমরা হয়ে থাকবেন অথবা ওই ধরনের সুযোগের কাঙালি হয়ে যেতেও পারেন। সেটা কখনও কাম্য হতে পারে না। তাই রাণীর একটা লোকলজ্জায় ভয় থাকা ভালো। ভেতরের অশান্ত ভাব চেপে রাখতে না পেরে রাজা বললেন, ‘তোমার কি মনে হয় আমার এত তাড়াতাড়ি আবার তোমার কাছে আসা উচিত হয়নি।’ রাণী সলজ্জ হেসে উত্তর দিলেন, ‘না, আমি তা বলছি না, তবে নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও দরকার আপনার?’

রাজা তখন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার কথাই থাক। আজ আর তোমাকে বিরক্ত করছি না।’ কার এত স্পর্ধা যে রাজার সঙ্গে এই ধরনের চালাকি করে? ওই শয়তানকে জনমের মতো উচিত শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রাজা শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। শয়তানটা যে রাজ প্রসাদেই থাকে সে বিষয়ে রাজা একবারেই নিঃসন্দেহ। তাই যদি হয় তাহলে সে তো এখনো প্রাসাদের মধ্যেই অবস্থান করছে। বাইরে যেতে পারেনি। শয়তানটাকে খুঁজে বের করতেই হবে এবং যথেষ্ট গোপনীয়তা বজায় রেখেই খুঁজতে হবে। ওই কাজ হাসিল করতে একটা টিমটিম লণ্ঠন হাতে নিয়ে রাজা ঢুকলেন আস্তাবলেন পাশে লম্বা হলঘরটাতে। ওই ঘরটা পরিচালকদের জন্য সংরক্ষিত এবং সেখানে সারি দিয়ে তাদের খাট-বিছানা পাতা ছিল।

রানীর মুখে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে রাজার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে অত পরিশ্রমের ফলে শয়তানটার বুকের ধরফড়ানি খুব দ্রুত গতিতে হতে বাধ্য। তাই প্রতিটি ভৃত্যের বুকে হাত রেখে প্রকৃত অপরাধী কে তা জানবার সিদ্ধান্ত নিলেন। হল ঘরে ঢোকার মুখেই ছিল প্রধান পরিচালকের শয্যা। তাকে দিয়েই রাজা তার পরীক্ষা শুরু করলেন। এইভাবে একের পর এক নিদ্রিত পরিচালকের ওপর চলল পরীক্ষা।

রাজার এমন পরীক্ষণ দেখে তো ছদ্মবেশীর অবস্থা খারাপ। রানীর সঙ্গে পরিশ্রমের ফলে তার বুকের ওঠানামা বেশিতো ছিলই, এখন ঢুকল মৃত্যুভয়। রাজা বুকে হাত দিলেতো সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলবেন, আর ধরা পড়া মানেই মৃত্যুদণ্ড। ছদ্মবেশীর ঘুম উড়ে গেলেও চোখ বুঝে নিদ্রার ভান করে পড়ে রইল সে। যথাসময়ে রাজা এলেন, বুকে হাত রেখে পরীক্ষা করলেন, যা বোঝবার বুঝলেন।

পরের দিন সকালে তাকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার জন্য তার মাথার একপাশের চুল কাঁচি দিয়ে কেটে দিলেন। আস্তাবল পাশেই ছিল বলে ঘোড়ার লোম কাটার জন্যে কয়েকটা কাঁচি ভৃত্যদের হলঘর সবসময় রাখা থাকতো। চুল কাটা হয়ে গেলে রাজা আবার নিজের খাসকামরায় ফিরে গেলেন। রাজা কেন তার মাথার এক পাশের চুল কেটে নিলেন তা বোধগম্য হতে ছদ্মবেশীর একটুকুও সময় লাগল না। রাজা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই কালবিলম্ব না করে হাতের সামনে যে কাঁচিটা পেল সেটা দিয়ে ছদ্মবেশী ওই ঘরে ঘুমিয়ে থাকা সব পরিচালকের মাথার এক পাশের চুল কেটে নিল। কাজ সমাধা হয়ে গেল, চুপচাপ নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল সে।

পরের দিন সকালে প্রাসাদের সদর দরজা খোলার আগেই সমস্ত পরিচালকদের ডাক পড়ল রাজার সামনে। হুকুম হয়েছে মাথায় টুপি না পরে যেতে হবে। সব পরিচালকদের মাথার এক পাশের চুল কাটা দেখে রাজা বুঝলেন হীন অবস্থা সম্পন্ন হলেও প্রতারক কিন্তু অন্য দশটা ভৃত্যের মতো নয়। যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে সে। প্রতারককে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে না পেরে রাজা একবার ভাবলেন সব কটাকে কঠোর শাস্তি দেবেন। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন সেটা ঠিক হবে না। তাতে গুঞ্জন খুব তাড়াতাড়ি ছড়াবে এবং রানীর সুনাম নষ্ট হবে। রক্ত-মাংসের শরীরের মানুষ এ ধরনের একটা দোষ করে ফেলতেই পারে। একজনের একটা ছোট অপরাধের জন্য দশটা প্রাণ নেয়া রাজধর্ম নয়। তাই তিনি অপরাধীকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভীত এবং হতবুদ্ধি পরিচালকদের দিকে এক পলক তাকিয়ে রাজা হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর দেয়া শান্তিতে যদি থাকতে চায় তাহলে ওই কাজ যে করেছে সে যেন এর পুনরাবৃত্তি না করে।’

একজন ছাড়া অন্য সকলে রাজার সতর্কবাণীর অর্থ বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। তবে যে লোকটি এর অর্থ বুঝেছিল সে মনেপ্রাণে তা বুঝেছিল। রাজাও যতদিন বেঁচে ছিলেন ঘুণাক্ষরেও সে রাতের কথা প্রকাশ করেননি। ভৃত্যও ওই রকম জীবনের ঝুঁকি দ্বিতীয়বার আর নেয়নি।

[মন্তেরিও লোবাতোর জন্ম ব্রাজিলে। আধুনিক যুগের ব্রাজিলীয় সাহিত্যে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। তাঁর গল্প সংগ্রহের নাম ‘উরুপেস’]

Leave a Reply

Your email address will not be published.