চীন-রুশ মৈত্রীঃ আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের মডেল

বিপ্লব রঞ্জন সাহা

সম্প্রতি ইউক্রেনে রাশিয়া পরিচালিত বিশেষ সামরিক অভিযান, যেটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ‍্যবাদী দুনিয়া তাদের প্রচার মাধ‍্যমে আগ্রাসন বলে প্রচার ও প্রমাণ করার জন‍্য উঠে পড়ে লেগেছে এবং বর্তমানে চীনের উপর চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে যাতে চীন রাশিয়ার উপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত‍্যাহার করে নেয়; সেই সামরিক অভিযানের পেছনের বাস্তব চিত্রটির ব‍্যাপক প্রচার-প্রচারণা এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যেকোন মানুষের কাছেই গোয়েবলসীয় পদ্ধতিতে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে যেন সারা পৃথিবীতে রাশিয়া চরম অমানবিক আচরণের প্রকাশ হিসেবে একটা যুদ্ধকে চাপিয়ে দিয়েছে বা আগ্রাসনাত্মক কাজে লিপ্ত রয়েছে আর যারা সত‍্যিকার অর্থে অস্ত্র বেঁচা টাকায় শান-শওকতের জীবন যাপন করে, যাদের কাছে নিজেদের ভালো থাকার জন‍্য যুদ্ধ বাধানোর কোন বিকল্প নেই সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নাকি বিশ্ব ত্রাতার আসনে আসীন। অতএব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধন‍্য ধন‍্য করে যাচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ‍্যবাদী দেশসমূহের প্রতি সমর্থন করে এইসব হাস‍্যকর কথা যারা বিশ্বাস করে এবং প্রচার করে আনন্দ পায় তারা কোন না কোনভাবে সাম্রাজ‍্যবাদের দোসর।

পশ্চিমা গোষ্ঠীর জন‍্য এটা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন তারা রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ‍্যেকার চলমান সংকট বিষয়ে চীনকে কিছুতেই পাশে টানতেতো পারছেই না বরং চীন রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের আনা অপ্রমাণিত অভিযোগ সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাণিজ‍্যের উপর আস্থা কমাতে চীন ও রাশিয়া স্বাধীন স্বতন্ত্র বানিজ‍্য ব‍্যবস্থা তৈরির প্রয়াস গ্রহণ করার প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিন একমত হয়েছেন যে এখন থেকে তারা তৃতীয় শক্তির প্রভাব বলয় মুক্ত হয়ে একটি বানিজ‍্য ব‍্যবস্থা চালু করবেন। এবং তারা এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এখন থেকে নিজস্ব মুদ্রায় বানিজ‍্যকে উৎসাহিত করতে, বিশ্বে নতুন অর্থ ব‍্যবস্থা চালু করবেন যাতে ডলারের অপ্রত‍্যাশিত চাপ মুক্ত থেকে সবাই বানিজ‍্য করতে পারে।

যে প্রক্রিয়ায় রাশিয়া এবং চীন নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে ইতিহাসের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে

জর্জ অরওয়েলের বিখ‍্যাত উপন‍্যাস ‘১৯৮৪’ থেকে নেওয়া সেই বিশ্ববিখ্যাত উক্তি, ‘যারা অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে তারাই ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করবে; যারা বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে তারাই অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে’ একটিমাত্র বাক‍্য রাজনীতিতে ইতিহাসের গুরুত্বকে তুলে ধরে এবং সেই উক্তিই বর্তমানে শি জিনপিং এবং পুতিনের অনুসৃত নীতির ন‍্যায‍্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

পুতিন একটি কঠিন সত‍্যকে বিশ্বের কাছে শুধু তুলেই ধরেননি বরং সেটাকে সকলের গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে একই চেতনাকে ধারণ করে। শুধুমাত্র পশ্চিমা দেশসমূহই ইউক্রেনকে রাশিয়া বিরোধী করে তুলতে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিচ্ছে। রাশিয়া কিছুতেই তা হতে দিবে না এবং প্রয়োজনে অস্ত্রের ভাষায় তা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করবে। প্রতিবছরই রাশিয়া ৯ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের পরাজিত করার বার্ষিকী উদযাপন করে থাকে। এ বছর সেই বিজয় উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, মানবজাতিকে রক্ষাকারী সেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা গোষ্ঠী আজ আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। তাই যখন তারা রাশিয়া-ইউক্রেন ঐক‍্যকে প্রত‍্যাশিত বলে বিবেচনা করছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলো এই চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করাটা অত্যন্ত জরুরি যে এক সময় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থেকে কিছুটা বিচ‍্যুতির পরিণতিতে নিজেরা যে ক্ষতির শিকার হয়েছিল এবং বিশ্বব‍্যাপী যে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ তা সংশোধনের সুযোগটি যাতে হাতছাড়া না হয় তার জন‍্য নিজেদের উপলব্ধির প্রয়োগ করে চলেছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। তাই, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক, শি জিনপিং, অপরাপর নেতৃবৃন্দ ও সামগ্রিকভাবে চীনা জনগণ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও রাশিয়ার জনগণের পাশে অবিচল থাকতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

ঐক্যবদ্ধ ইতিহাস গড়ে তোলার যে আকাঙ্ক্ষা তাড়িত হয়ে আজকের রাশিয়া ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে উঠে এসেছে তা আজ এমন এক পূর্ণতা পেয়েছে যে চীনের মতই দৃঢ়তার সাথে ঐতিহাসিক সত‍্যকে ধারণ করে পুতিন স্পষ্টাক্ষরে ইতিহাস থেকে সরে না আসার অঙ্গীকার ব‍্যক্ত করে ঘোষণা করেছেন যে রাশিয়ার জনগণ ও ইউক্রনের জনগণ একই উত্তরাধিকার বহন করছে। আর এখানেই চীন ও রাশিয়ার মধ‍্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক‍্যের বীজ নিহিত।

বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানকে ভুলভাবে চিত্রিত করে যে প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো ত্বড়িৎগতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছে তা কিন্তু চীনের জন‍্যও এক হুমকি এবং নিশ্চিতভাবেই দুশ্চিন্তার কারণ এই ঐক‍্য চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস চালাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই যদিও তাইওয়ানের সাথে চীনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের থেকে ভিন্নতর। তবে ঘটনার পরম্পরায় মিলও যে রয়েছে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

হোক রাশিয়া অথবা চীন এই দেশ দুটির যে কোনটিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে এমন একটা চাল দেওয়ার পায়তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন‍্য নতুন নয়।

আর তাই ২০২০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ আগ বাড়িয়ে বলে রেখেছিল যে চীনা সামরিক বাহিনী ‘তাইওয়ানকে জোর করে মূল ভূখণ্ডের সাথে ঐক‍্যবদ্ধ করার জন‍্য একটি দল গঠন করছে।’ তার জবাবে চীনের রাষ্টদূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছিল যে তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে গেলে তাদেরকে হয়তো চীনের সাথে ‘সামরিক সংঘাতে’ জড়াতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন সেই সামরিক সংঘাতেই আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়েছে।

এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে প্রক্রিয়ায় আর দলবলকে সংগঠিত করছে তার বিপরীতে রাশিয়ার সাথে চীনের তথা চীনের সাথে রাশিয়ার ঐক‍্য মানবজাতির জন‍্য ভীষণভাবে ইতিবাচক পরিণতির জন্ম দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভার্চ‍্যুয়াল আলোচনাটি সকলের কাছে তুলে ধরার আবশ‍্যকতা বিবেচনায় সেই বৈঠকের মূল মূল বিষয়গুলো অনেকটা সময়ের ব‍্যবধানে হলেও অত‍্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেই বৈঠকটিকে সকলেই চীন-রাশিয়ার সম্পর্ককে মেনে নিয়েছিল আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের মডেল হিসেবে।

আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের মডেল

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সভায় মিলিত হয়েছিলেন।

সেই সভার আলোচ‍্যসূচীতে ছিলো অগণিত প্রসঙ্গ। দুই নেতা কিছু আন্তর্জাতিক বিষয়, ন‍্যাটোর আগ্রাসী বাগাড়ম্বর এবং ইউরোপের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। এই মত বিনিময়ের সময়ে, দু’পক্ষই জ্বালানি, উচ্চতর প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা, যৌথ বিনিয়োগ ও বাণিজ‍্যসহ দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের পুরো বিষয়টা নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছিলেন। ঐতিহ্যগতভাবে নেতৃদ্বয় আঞ্চলিক বিষয়েও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন।

এর আগে ক্রেমলিনের মুখপাত্র ডিমিট্রি পেসকভ বলেন যে, এই আলাপ আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সংবাদ মাধ‍্যমের কাছে শুধুমাত্র প্রাথমিক আলাপ-আলোচনাটুকুই তুলে ধরা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.