চা বাগানে আন্দোলন ও জাতপাত জটিলতা

আহমদ সিরাজ

অবিভক্ত ভারতবর্ষে চা বাগান পত্তনের ইতিহাস অনেকটা লোমহর্ষক। ব্রিটিশ বেনিয়ারা মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চা বাগান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশেষত সিলেট ও আসামে চা বাগান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। এসময় স্থানীয় লোকজন চা শিল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে অনীহা দেখায়। তখন শ্রমিক নিয়োগের জন্য ব্রিটিশরা দালাল নিয়োগ করে বিভিন্ন স্থানে লোভনীয় প্রচার দ্বারা লোকজনকে আকৃষ্ট করতে থাকে- যারা ব্রিটিশের এই কাজে যোগদান করবে তাদের গরিবী অবস্থা পরিবর্তন হবে, তারা অনেক অনেক টাকা রোজগার করতে পারবে- যা তারা নিজস্ব এলাকায় কিছুতেই করতে সক্ষম হবে না।

দালালদের এমন লোভনীয় প্রস্তাবে ঝাঁকে ঝাঁকে লোকজন অভিবাসী হয়ে উঠে। ভারতবর্ষের আসাম ও সিলেটের নিগূঢ় জঙ্গলে তাদের পাঠানো হয়- সাহেব বাবুরা তাদের তত্ত্বাবধানে কাজে বাধ্য করে। এখনকার মতো তখন পথঘাট, চলাচল, শহর-বন্দর, ঘর-বাড়ি, মানুষজন ছিল না। একেবারে জগৎ ও জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল চা বাগানের জীবন। চা বাগানের বাইরে যে কোনো জগৎ আছে তা তাদের ধারণায় নেওয়ার সুযোগও ছিল না। একেবারে বৃত্তাবদ্ধ জীবন। সময় গড়িয়ে তারা অভিজ্ঞতায় যখন দেখতে পেল দালালরা যে কথা বলে তাদের নিয়ে আসে তার সঙ্গে কাজের ও মজুরির কোনো মিল নেই। কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তারা যে মজুরিটুকু পেত তা দিয়ে জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল না। তখন তারা স্বভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগও অনেকটা হারিয়ে ফেলে। বিদ্যমান অসহ্য পরিস্থিতিতে চা শ্রমিকরা ক্ষোভে দ্রোহে বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করে। স্থানে স্থানে শ্রমিকদের আন্দোলন যে হয়নি তেমন নয়, কিন্তু তাতে তেমন সুফল হয়নি। অনেকে রোগে শোকে বিনা চিকিৎসায়, মেলেরিয়ায়, আমাশয়ে, নিউমোনিয়ায়, টাইফয়েড ইত্যাদিতে মৃত্যুবরণ করে।

ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে নানাভাবে পল্লবিত হয়ে আসছিল। কংগ্রেসের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বামপন্থি আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, খেলাপত আন্দোলন, এমনকি মুসলিম লীগের আন্দোলনসহ নানা পর্বের আন্দোলনের সবকটি তখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দিকে প্রবাহিত ছিল। অর্থাৎ ব্রিটিশের বিদায়ে মধ্য দিয়ে সকল সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছিল। শ্রমজীবী গরিব মেহনতি মানুষের আন্দোলনও এই জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পড়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ, জীবন ও জীবিকা প্রশ্নেও তখন আলাদাভাবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগও থাকেনি। যদিও বামপন্থি কমিউনিস্টরা গরিব মানুষের আন্দোলন সংগ্রাম শ্রেণির স্বার্থ বিবেচনায় এগিয়ে নিতে চাইলেও তা কিন্তু শেষাবধি ভারত পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের জন্মের ভিতর দিয়ে ভাগ হয়ে গেছে। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে ভারতবর্ষে তখন কংগ্রেস রাজনীতির নেতৃত্বের একটা বড় অংশ ধর্মাশ্রিত রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। খোদ গান্ধীও এই চেতনার বাইরে ছিলেন না। এমনিতেই ভারতবর্ষ ধর্মের ভেতর অসংখ্য উপধর্মের মতো মানুষ খণ্ডিত হয়ে জাতপাত বর্ণে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ধর্মাশ্রিত রাজনীতির জাতপাত বর্ণ লালন করে মানুষ মুক্তি খুঁজেছে- তাতে মানুষের মুক্তি আসা দূরে থাক মানুষের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র, ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে চা বাগানের আন্দোলন সংগ্রাম কিন্তু সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দ্বারা আবর্তিত হয়েছে। তার প্রভাব ও স্বভাবে শ্রমজীবী শ্রেণি মানুষের শ্রেণি আন্দোলনের চরিত্র হিসেবে গড়ে উঠেনি। এমনিতেই ভারতবর্ষে জাতপাত বর্ণ ইত্যাদির জটিলতা অতিক্রম করে বিপ্লবী চরিত্র পরিগ্রহ করা সহজ ছিল না। এর মধ্যে চা বাগানের অবস্থান ছিল জটিল। অর্থাৎ কোম্পানির নাগপাশে ছিল বাঁধা। এমনি চা বাগানে যারা অবস্থান করে তারা চা শ্রমিক হিসেবে অভিন্ন অংশের মনে হলেও বাগানে তারা ‘পানি চল পানি অচল’ ব্যবস্থা- জাতপাতের মতো ব্যবধান তৈরি করে রেখেছে। চা বাগানে কী পরিমাণ জাতপাত বর্ণ গোষ্ঠী ইত্যাদি আছে তা বোঝে নিলে ‘শ্রেণি’ কোথায় লুকিয়ে আছে তা বোঝে নিতে মোটামুটি গবেষণার বিষয়। যারা অধুনা বাগান শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী তাদের এসব বিষয় আমলে নেওয়ার বিবেচনার দাবি রাখে।

এখানে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিশেষত সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাগানসমূহে চা শ্রমিকরা জাতপাত, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, সংস্কৃতি লালন করে থাকেন, তারা শ্রমিক হিসেবে বাগানে অভিন্ন অবস্থানে থাকলেও এসব ক্ষেত্রে তারা আলাদাভাবে চিহ্নিত হন। তাদের একই সোনাতন ধর্মের অনুসারী ভাবা হলেও গোত্র, ভাষা, সংস্কৃতি, জাতবর্ণে আলাদা অবস্থান রাখেন। এখানে কতিপয় বিষয় উল্লেখ করা হলে তা পরিষ্কার হতে পারে। যেমন: ধরে নেওয়া যায়-

উড়িয়া জনগোষ্ঠী: উড়িষ্যা প্রদেশ থেকে আগত জনগোষ্ঠী যারা তাদের উড়িয়া জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়? তা হলো: বোনার্জি, তাঁতি, মিশ্র, গোস্বামী, প্রধান, ছত্রী, ক্ষত্রী, চাষা, গৌড়, মোহান্তি, গোয়ালা, তেলি, কুর্মী, নায়েক, তংলা, ঘাসি, জেনা, পাইক, সত্তরা, সবর, কন্দ, খদাল, হাড়ি, রাজবল্লভ, শুক্লবৈদ্য, বেত্রা, ভুঁই, বারিক, মাড়িয়া।

এভাবে ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে যারা এসেছেন তাদেরও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন:

ভোজপুরি জনগোষ্ঠী: চৌবে, ত্রিবেদী, তেওয়ারি, দোবে, পাঁড়ে, শর্মা, সোনার, বর্মা, কৈরী, কানু, কুর্মী, আহির, রাজভর, সিং, লালা, কালোওয়ার, তেলী, দোসাদ, পাসি, গড়, শীল, কেউট, গোঁসাই, কাহার, প্রজাপতি, বিন, ভর, রজক, বারই, লোহার, বেনবংশী, রবিদাস, সতনামী, দেশওয়ারা, মণ্ডল, চৌহান, নুনিয়া ও ছত্রী।

অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগতদের তেলেগু জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন- নাইডু, রাও, রেড্ডি, কুর্মী, ছালিয়া, অলমিক, তাঁতি, রেলি, তেলেঙ্গা, তেলি, গোয়ালা ও মান্দ্রাজি।

ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগতদের সাঁওতাল জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন- সরেন, মাড্ডি, টুডু, বেশরা, মুর্মু, কিস্কু, হেমব্রম, হাসোদা ও চড়ে।

এছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে যারা এসেছে তারা গারো জনগোষ্ঠী। যেমন- সাংমা, মানকিং, আসাক্রা, রিচিল, চিসিমি, চাম্বুগং, নক্রেক, দ্বীয়, আরেং, সিসাং ও দাফো।

এছাড়া সাদরি জনগোষ্ঠী, বাংলা জনগোষ্ঠী, মুণ্ডা জনগোষ্ঠীও এভাবে জাতি, বর্ণ, গোষ্ঠীতে চিহ্নিত হয়ে আছে। যে যেখান থেকে এসেছে তারও প্রভাব বহন করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব জনগোষ্ঠী চা বাগানের বাসিন্দা হলেও তাদের নিজস্ব প্রথা, রীতিনীতি, ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য রয়েছে। এর মাঝে হিন্দি প্রভাব আছে। বাংলা ভাষার প্রভাব আছে। এসব ভাষার প্রভাব স্বভাবেও মিশ্রণ ঘটেছে।

এছাড়া বিয়ে-শাদি, জন্ম-মৃত্যু, শ্রাদ্ধ, সামাজিক বিষয়াদি, উৎসব অনুষ্ঠানে পার্থক্য রয়েছে। পাশাপাশি তাদের সমাজ পরিচালনায় রয়েছে নিজস্ব রীতিনীতি, নিয়ম-কানুন ও নানা পদ-পদবির আধিক্য- যা আলাদা পার্থক্য চিহ্নিত করে। আবার কোথাও কোথাও মিল খোঁজে পাওয়া যায়। ছোট ছোট জাতগোষ্ঠী, গোত্রে বিভক্ত এসব জনগোষ্ঠী এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগ হয়ে আছে যে বিপুল বিস্তৃত বিচিত্র জীবন সংস্কৃতিতে তারা অভ্যস্ত হয়ে আছে। এসব বেড়াজাল থেকে তারা বের হয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বা শ্রমজীবীর অংশ তা ভাবা সহজ হয় না। জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে তারা স্বতঃস্ফূর্ততায় আন্দোলিত হলেও আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবস্থানে অবগুণ্ঠিত হয়ে পড়ে।

এখানে ‘শ্রেণি মানুষ’ জাতপাতের ভেতরে কীভাবে লুকিয়ে আছে তা বের করে আনতে নিরন্তর চেষ্টা ও উদ্ভাবনী ভাবনার দরকার। ভারতবর্ষে এ বিষয়টি জটিল হয়ে আছে। সমাজতান্ত্রিক, সাম্যবাদী আন্দোলনের জন্য বিপ্লবী কর্মীদের নিজস্ব কায়দায় নিজস্ব ধারায় ভাবনার সুযোগ আছে। এখানে সরলরেখায় শ্রেণি আন্দোলন বা শ্রেণি মানুষ সহজে পাওয়া যাবে না। বিশেষত চা বাগান শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। চা বাগানে ধর্মাশ্রিত সংস্কৃতির এতই দাপট যে কোনটি সংস্কৃতি কোনটি ধর্ম আলাদাভাবে বোঝে নেওয়ার সুযোগ নেই। এজন্য সম্প্রদায়ের ভেতর কত সম্প্রদায়, গোষ্ঠীর ভিতর কত গোষ্ঠী, জাতপাতের ভিতর কত জাতপাত তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, লুটপাট, দুর্নীতি তাদের চিরায়ত অনড় জীবন ও পশ্চাতপদ অবস্থানকে আরও টেনে রেখেছে।

অথচ বাংলাদেশে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরাপর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের চেয়ে তাদের জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের অবস্থান হেলাফেলার নয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তারা এখনও মূলস্রোতের মানুষ হয়ে উঠেনি। মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে তাদের অংশগ্রহণ বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা ভাবা যায় না। কিন্তু তারা এখনও নিজেদের পরবাসীর মতো ভেবে থাকে। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও যেন একই কোম্পানির আইন কানুনের অংশ হিসেবে তারা গণ্য হয়ে রইল। শত বছরেরও আগে সাদরি ভাষায় উঠে আসা গানে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল তাদের দুঃখের কাহিনি- স্বাধীন বাংলাদেশেও যেন শোনা যায় তার প্রতিধ্বনি। যেমন-

রাচিকের বাঙ্গাল কুলি

দে দোলাই টুকরি

ঝুমরি ঝুমরি পাতা তুলেলা

চারাবাড়ি

হায়রে দেইয়া

কাহা গেলাক হামনিকের

ঘরবাড়ি।

অর্থাৎ,

রাচি থেকে এলো কুলি

দেওয়া হলো পাতি টুকরি

সারাদিন চা বাগান ঘুরে ঘুরে পাতি তুলি

হে ভগবান,

কোথায় গেল আমাদের

ঘরবাড়ি।

(তথ্যসূত্র: চা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি: পরিমল সিংহ বাড়াইক)

এখানে তাদের ফেলে আসা জন্মভূমির গভীরতর আকুতি ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

লেখক: লোক গবেষক ও সদস্য, সিপিবি সদস্য, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.