চারিদিকে সংকট: উত্তরণে চাই বামপন্থিদের উত্থান

ডা. মনোজ দাশ  

সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদের একই পথে দেশ এখনও পরিচালিত হচ্ছে। এই লুটেরা পুঁজিবাদের স্বার্থে ও তার অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে গণতন্ত্রহীনতা। ক্রমাগত গণতন্ত্রের ভিত্তিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। সৃষ্টি করা হয়েছে অবাধ লুটপাটতন্ত্রের। বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠলেও, তার জনকল্যাণমূলক কাজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সম্পদ বৈষম্য ও শ্রেণি বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। জনজীবনে দৈনন্দিন সমস্যা-সংকটগুলো নতুন নতুন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে। নারীর ওপর সহিংসতা অব্যাহত আছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-হামলা বন্ধ হয়নি। ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি রাষ্ট্র ও শক্তির হস্তক্ষেপের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

করোনার কারণে দেশে গত দেড় বছরে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ গভীর সংকটে। টিকে থাকার জন্য তারা চড়া সুদে এনজিওদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারণে এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অন্য এনজিওর ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। দারিদ্রমুক্ত হওয়ার বদলে গ্রামের মানুষ ঋণের জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে। দেশে দুই ডোজ টিকা পেয়েছে মাত্র ৪.৫% মানুষ। করোনায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি খাত, যার মূল ব্যবস্থাপনা রয়েছে ঔপনিবেশিক কাঠামোর এক চরম দুর্নীতিগ্রস্থ আমলাতন্ত্রের হাতে। চিকিৎসা পাওয়ার দ্বিতীয় উৎস বেসরকারি খাতের ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভার বহন করা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের ভাবনা সবসময়ই ছিল অযৌক্তিক। করোনাকালে এটা আরো স্পষ্ট হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ এখনও ঘোষিত হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে যাচ্ছে। অনেক অপশক্তি প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।’ তার এই বক্তব্যের পরে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সরকার কি এত দিন আন্দোলনের ভয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে?

সাম্প্রদায়িকতার বিপদ কমেনি। বরং তাকে গ্রামে-গঞ্জে সমাজের অনু-পরমাণুতে ছড়িয়ে দিতে শাসক দলের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সহায়তা পাচ্ছে সাম্প্রদায়িক শক্তি। বিএনপি তো আছেই। কোনো ঘটনার বিচার হচ্ছে না। খুলনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। জড়িতদের মধ্যে শাসক দলের লোকজনও আছে। তার থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, যেসব পরিবার অসাম্প্রদায়িক ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী হিসেবে এলাকায় বিবেচিত, সে সব পরিবারের কিছু যুবককে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভিন্ন মাত্রায় নারী নির্যাতন বেড়েছে। পরিমণির ওপর রাষ্ট্রের অমানবিক নিপীড়ন কয়েকটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, এটা স্পষ্ট হয়েছে, আমাদের দেশের লুটেরা ধনিকশ্রেণি ও আমলাতন্ত্র শুধু দুর্নীতিগ্রস্থই না, তারা মিলেমিশে আছে, তারা ঐক্যবদ্ধ এবং তাদের যৌনজীবন লাম্পট্যে ভরা। দ্বিতীয়ত, পরিমণির ঘটনায় নিম্ন আদালতের ‘ক্ষমতার অপব্যহার’-এর বিষয়টি নিম্ন আদালতের ওপরে জনগণের আস্থার সংকট আরো তীব্রতর করেছে। তৃতীয়ত, এসব ঘটনায় অনেক মধ্যবিত্ত পিতৃতান্ত্রিকতা ও লুটেরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারীমুক্তির সংগ্রামকে আরো জোরদার করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে।

রাষ্ট্র ও সমাজের উপর নাগরিকবৃন্দের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে আসছে। বরিশালে আমলাতন্ত্র ও আওয়ামী লীগের মধ্যে যে সহিংস দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করেছে, সেটা হঠাৎ করে ঘটেনি। ২০১৮ সালের রাতের নির্বাচনের পর জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোভাব একদম বদলে গেছে। তারাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। আওয়ামী লীগকে তারা এখন আর পাত্তা দিচ্ছে না। তারা ক্ষমতার অধিকতর আমলাতন্ত্রীকরণ ঘটিয়েছে। আওয়ামী রাজনীতিবিদদের সাথে তাদের বহুমুখী স্বার্থের দ্বন্দ্ব সহিংস রূপ নিয়েছে।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দুর্নীতি স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগসহ বুর্জোয়া রাজনীতিতে অনেক আগেই দুর্নীতিপরায়ণতা, বাণিজ্যিকীকরণ, দুর্বৃত্তায়ন ও আদর্শহীনতা আত্মপ্রকাশ করেছে। এই সময়ে আমলাদের দুর্নীতিও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অর্থ-ক্ষমতা ইত্যাদি ভাগাভাগি নিয়ে আমলাতন্ত্র ও দেউলিয়া বুর্জোয়া রাজনীতির দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে আরো নানাভাবে আত্মপ্রকাশ করবে।

চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ অতিষ্ঠ। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে এলপি সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রে জনজীবনের সংকট বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। জনজীবনের সংকটসহ আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরাতে অনাবশ্যকভাবে জিয়ার কবর নিয়ে সরকার প্রধান বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। ফলে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের উপাদান তৈরি হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের মনে বিরাজ করছে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে, প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে ও গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রিত রাখার মাধ্যমে সরকার পরিস্থতিকে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও প্রকৃত অবস্থা মোটেও তা নয়।

মানুষ আওয়ামী লীগের শাসন পছন্দ করছে না। কিন্তু বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় ফিরে আসুক, সেটাও তারা মন থেকে চায় না। এই দুই শক্তির বাইরে একটি বিকল্প সৎ প্রগতিশীল রাজনৈতিক সরকার তারা চায়। এটাও জনগণ অনুভব করছে, দুটি বুর্জোয়া দলের হাতে দেশের সরকার ও রাজনীতি বন্দি থাকার ফলে গণতন্ত্রহীনতা-লুটপাট-অনাচার-দুর্ভোগ ইত্যাদির বেড়াজালে দেশ ও জনগণ আরো বেশি করে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে। জনগণ এই দুঃসহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায়। যে বামপন্থি শক্তির দ্বারা মানুষের সামনে বিকল্পের আশা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব তারা এখনও বৃহত্তর বাম ঐক্য তৈরি করে তাদের সেই কর্তব্য পালন করতে পারছে না। কিন্তু সংকট উত্তরণে বামশক্তির ঐক্য ও উত্থানের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

বুর্জোয়া রাজনীতির দেওলিয়াপনা ও সংকটের কারণে বিদেশি শক্তি দেশের অভ্যন্তরের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ আগেও করেছে, এখনও সেই সুযোগ বিদ্যমান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রভৃতি দেশ রাজনীতিসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি থেকে আমাদের বুর্জোয়ারা শিক্ষা নিতে রাজি নয়। আফগানিস্তানে আমেরিকা ও তালেবানের গোপন সমঝোতায় এখন যা দেখা যাচ্ছে, সেটা কেবল মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়। এটা আমেরিকার নতুন ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। তালেবানের মাধ্যমে তারা আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী চীন ও রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করে রাখতে চায়। সংগত কারণেই চীন ও রাশিয়াকে আফগানিস্তানে সক্রিয় ভূমিকায় নামতে হয়েছে। আমাদের দেশেও আমেরিকা তার চীনবিরোধী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। জনসমর্থনহীন সরকারকে টিকে থাকতে সাহায্য করে, তালেবানের আদর্শিক প্রভাব এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আমেরিকা এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল গ্রহণ করবে। দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক শক্তির কার্যকলাপ এবং বুর্জোয়া দলগুলোর দ্বন্দ্ব-হানাহানি-সংঘাতের সুযোগে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ গ্রহণ করবে। সেই সুযোগে তারা বুর্জোয়া দলগুলোর নিকট থেকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি স্বার্থ আদায় করে নিতে সক্ষম হবে। …এভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হবে বাংলাদেশ।

দেশি বিদেশি শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দল বিএনপি-আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে সরকার গঠন করলেও তারা কেউ দেশবাসীর ভাগ্যের কোনো গুণগত মৌলিক পরিবর্তন তো দূরের কথা, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যূনতম বুর্জোয়া গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। অভিজ্ঞতা এ কথাই বলে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শক্তির শ্রেণিগত চরিত্র বদল না হলে এবং আর্থসামাজিক নীতি দর্শনের প্রগতিমুখী মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলে সংকট নিরসন হবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বুর্জোয়া রাজনীতির দ্বি-দলীয় মেরুকরণের বেড়াজাল ভেঙ্গে বামপন্থিদের বৃহত্তর ঐক্য ও তাদের নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি এবং গণশক্তির সচেতন সংগঠিত উত্থান ছাড়া বর্তমান সংকট ও দুঃসহ অবস্থার মৌলিক স্থায়ী কোনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব হবে না। তাই দেশের এই সংকটময় সময়ে জনজীবনের সংকট মোচনের জন্য ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে এবং গণতন্ত্রহীনতা-লুটপাটতন্ত্র-সম্প্রাদায়িকতা-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র গণসংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.