চল্লিশ বছরে শ্রমিক আন্দোলনে কমিউনিস্টরা

সুনীল রায়  

কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে এদেশে যে শ্রমিকদের সংগঠন এবং শ্রমিক আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরিচালিত হয় তা বিভাগপূর্ব সংগঠন ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যেমন বিচ্ছিন্ন নয় এদেশে কমিউনিস্ট পার্টির ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৭ সালপূর্ব উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য থেকে।

ভারতের এ অঞ্চল বরাবরই শিল্প, কল-কারখানার বিকাশের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। ঢাকার নারায়ণগঞ্জের সুতাকল, পাট ব্যবসা এবং সারাদেশে রেল পরিবহনে এ অঞ্চলের শ্রমিকরা জড়ো হয়েছিল। এছাড়া ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়া এবং খুলনায় ১টি করে সুতাকল ছিল।

কমিউনিস্টরা নারায়ণগঞ্জের সুতাকলগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল আগেই। পার্টির পক্ষ থেকে অনিল মুখার্জী, নেপাল নাগ সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ব্রজেন দাস, নলীন্দ্র সেন, গোপাল বসাক, বারীণ দত্ত (নারায়ণগঞ্জের) প্রমুখও এতে জড়িত ছিলেন। প্রথমে গ্রুপ গ্রুপ করে সংগঠিত করে পরে ১৯৪২ সালে ঢাকা জেলা টেক্সটাইল ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন নামে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে এ অঞ্চলে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। শ্রমিকদের মধ্য থেকে এ সময় বিভিন্ন সুতাকলের নেতা ছিলেন ঢাকেশ্বরী ১ নং-এ মৃণাল চক্রবর্তী, কার্তিক গোপ, সতীশ ভদ্র প্রমুখ, ঢাকেশ্বরী ২ নং-এ নরেন দে, গিরিন ঘোষ, লক্ষ্মীনারায়ণ, ব্যোমকেশ ভট্টাচার্য, গুলজার হোসেন প্রমুখ, চিত্তরঞ্জনে সুনীল রায়, আফসার মিয়া, রমণী গোস্বামী প্রমুখ। পরে শ্রমিকদের মধ্য থেকে ঢাকেশ্বরী ২ নং-এ নাড়ু মুখার্জী এবং ঢাকা কটনে সুশীল সরকারও ইউনিয়ন গঠন ও আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। আদর্শ কটন মিলে ৪২ সালের বেশ পরে ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। এর আগে এসব সুতাকলে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না। বস্তুতঃ ৩৮ সাল থেকে এসব কল-কারখানায় শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলন পার্টির উদ্যোগে গড়ে ওঠে।

এর বাইরে নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসায় নিয়োজিত শ্রমিকদের মাঝে মাঝে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে রেল পরিবহনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন আসাম-বেঙ্গল রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ছিল শ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন। ঢাকায় সুকুমার চক্রবর্তী, ধরণী রায় রেল শ্রমিকদের নেতা ছিলেন। পরে বিপ্লবী সাহিত্যিক শহীদ সোমেন চন্দ এতে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে ঢাকার সূত্রাপুরে ফ্যাসিবাদবিরোধী এক সমাবেশে রেল শ্রমিকদের একটি মিছিল নিয়ে আসার পথে সোমেন চন্দ হিটলার সমর্থক ফরোয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।

১৯৪২ সালে আমি পার্টির সদস্যপদ অর্জন করি। একইসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এসকল সুতাকলের প্রায় ৮০ জনকে পার্টির সদস্যপদ প্রদান উপলক্ষে ২ নং ঢাকেশ্বরী ভলান্টিয়ার মেসে এক অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। এসময় টেক্সটাইল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের অধিকাংশ নেতা পার্টি সদস্যপদ অর্জন করেন।

১৬৪৭ সালের আগে বেশ কয়েকবার সুতাকলে শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ায়। তবে সে সময়ের ধর্মঘটগুলো ছিল পৃথক বৈশিষ্ট্যের, যা আজকের দিনে দেখা যায় না। তখন ধর্মঘটের জন্য তহবিল গঠন করা হতো, আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে চাল-ডাল, টাকা সংগ্রহ করা হতো। একবার ১৯৪৬ সালে ৩ মাসব্যাপী ধর্মঘট চলাকালে তহবিল সংগ্রহের জন্য উত্তরবঙ্গ এমনকি কলকাতায়ও যাওয়া হয়েছিল। এছাড়া ধর্মঘট পালনকালে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হতো যারা কারখানায় গেটে গেটে ডিউটি দিতেন। এই ডিউটি চলাকালে স্বেচ্ছাসেবকরা কেন ধর্মঘট করা উচিত তা শ্রমিকদের বোঝাতেন। রাজনীতি, রাষ্ট্র, সংগঠন, আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হতো। দেখা যেতো প্রতিটি ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে সংগঠনে অনেক নতুন কর্মী যোগ দিত। এছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন শুধু শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনই করেনি, শ্রমিকদের সচেতন করে তোলা, পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরি গঠন করেছিল। শ্রমিকদের নিয়ে গানের দলও গঠন করা হয়েছিল। অনেক সৃজনশীল সঙ্গীতশিল্পী শ্রমিকদের মধ্যে ছিলেন। ইউনিয়নগুলো বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করতো। এ সময় মুসলমান শ্রমিকদের মধ্য থেকে লক্ষ্মীনারায়ণে চান মিয়া (পরে ৫৪ সালে তাকে ঢাকায় রিকশা চালাতে দেখি), তোফাজ্জল মিয়া, ঢাকেশ্বরী ১ নং-এ আবুল হাশেম, কমরেড আজিমউদ্দিন (তাঁকে সবাই কমরেড নামে ডাকতেন) শ্রমিক নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন।

৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ’৪৮ সালে এদেশের পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোও ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে থাকে।’৪৮ সালে রেশনে খুদ চাল দেয়ার প্রতিবাদে সুতাকলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে মিছিল করে নারায়ণগঞ্জে শহর রেশন কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিতে গেলে কর্মকর্তার অফিসের সামনে অপেক্ষমান শ্রমিকদের ওপর মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনী আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী হামিদুল চৌধুরী লক্ষ্মীনারায়ণ মিলে এক সভায় যখন বলেন, এখানে কাজ করতে গেলে খুদ খেতে হবে। তখন শ্রমিকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। শ্রমিকদের পাকিস্তানের সোনালী স্বপ্নটি ভেঙে যায়।

’৪৭ সালের শেষদিকে পার্টির উদ্যোগে পূর্ব বাংলার লেবার ফেডারেশন গড়ে তোলা হয়। এর সভাপতি ছিলেন ডা. মালেক (মুক্তিযুদ্ধকালের কোলাবোরেটর ঠ্যাটা মালেইক্যা), সহ-সভাপতি নেপাল নাগ, সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ (শ্রমিকনেতা), সহ-সাধারণ সম্পাদক অনিল মুখার্জী। আমি ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলাম। ’৪৮ সালের শেষ দিকে ডা. মালেক শ্রমমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এসময় থেকে ফেডারেশনের ভূমিকা, সরকারি নির্যাতন ইত্যাদি মিলিয়ে আর কমিউনিস্টদের কাজ করার মতো অবস্থা থাকেনি।

[আগামী পর্বে সমাপ্য]

Leave a Reply

Your email address will not be published.