গণ, অঙ্গ ও সহযোগী– আলোচনা নিরর্থক নয়

রফিকুজ্জামান লায়েক 

কয়েক বছর আগে টেলিভিশনে একটি বিজ্ঞাপন দেখতাম, যার কথাগুলি ছিল এ রকম–‘এই টিনের নাম কী, নাম শুনে কাম কী- গরু মার্কা ঢেউ টিন’। প্রচলিত বা প্রকাশ্যভাবে ক্রিয়াশীল প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর ও পেশাজীবীসহ নানা সংগঠন আছে। তার মধ্যে নানা ধরনের তারতম্য বিদ্যমান। সব দলেরই সব ধরনের সংগঠন নেই। আবার একাধিক দল মিলে একই সংগঠন-আন্দোলনে কাজ করার ঘটনাও আছে। শুধু তাই নয়, বিপরীত ধারার অর্থনৈতিক নীতি দর্শনে বিশ্বাসী দল মিলে একই সংগঠনে কাজ করার রেওয়াজও আমাদের দেশে আছে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

গণ, অঙ্গ ও সহযোগী যে নামেই ডাকি না কেন–তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব গঠনতন্ত্র রয়েছে এবং লেখা যা-ই থাকুক না কেন–বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল রাজনৈতিক দলের এজেন্ডার বাইরে যাওয়া কষ্টকর। তবে এ বিষয়ে ঢালাওভাবে বলাটা বাস্তবসম্মত নয়। কেননা শাসকশ্রেণির বুর্জোয়া দলগুলি এবং প্রগতির ধারা ও চেতনায় বিশ্বাসী দলের মধ্যে উক্ত সংগঠনসমূহ পরিচালনার নীতিগত ও কৌশলগত পার্থক্য আছে। আবার একই ধারার দলের ক্ষেত্রেও ব্যবধান রয়েছে। বুর্জোয়া দলগুলির স্বীকৃত সংগঠন ছাড়াও কোনো কোনো নেতা-নেত্রীর নাম ব্যবহার কওে, এমন সংগঠনের অস্তিত্বও আছে।

সোজা কথায় বললে বলতে হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ঐ সকল সংগঠনসমূহের আকার ও প্রকারের তারতম্য ঘটে থাকে। প্রকারের কথা এজন্য যে, কোনো নেতা মূল দলের নেতাকে কতটা খুশি করতে পারল তার ওপর নির্ভর করে তার ভবিষ্যত। আর এর সাথে জড়িত থাকে বৈষয়িক বিষয়। সে জন্য শাসকশ্রেণির বুর্জোয়া দলগুলির পরিচালিত সংগঠনসমূহ নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব হারিয়ে রাজনৈতিক দলের সরাসরি অঙ্গে পরিণত হয়। নেতা-নেত্রীদের নামে স্লোগান থেকে শুরু করে মূল দলের পক্ষে সবই করে থাকে। দলের কর্মসূচির বাইরে যাবার কোনো সুযোগ নাই। দলের নেতৃত্ব ও তাদের ব্যবহার করে নিজের পছন্দ মতো। এমনকি তাদের কমিটি শেষ পর্যন্ত কী হবে তাও রাজনৈতিক দলের সরাসরি হস্তক্ষেপে করা হয়ে থাকে। প্রচলিত ধারার শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলির পরিচালিত সংগঠনসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার জন্য এই লেখাটি নয়। বরং আলোচনা করতে চাই শাসকশ্রেণির লুটপাটের কারণে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত শ্রেণিসমূহের জন্য যে সকল দলগুলি ঐ শ্রেণিসমূহের জীবনের লড়াইকে অগ্রসর করতে চান, তাদের পরিচালিত সংগঠন বিষয়ে। প্রথমেই বলে রাখতে চাই, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষে মানুষে সম্পদের ব্যবধান বাড়ছে, ন্যায্য পাওনা থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন– তার থেকে মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া হবে না। এর বড় উদাহরণ হলো ২৫টি সরকারি পাটকল বন্ধের পূর্বাপর ঘটনাসমূহ। আবার একথাও ঠিক যে, রাজনৈতিক সংগ্রামকে চূড়ান্তভাবে যৌক্তিক জায়গায় নিতে হলে শ্রেণি বা শ্রেণিসমূহের সচেতন লড়াইয়ের মাধ্যমেই যেতে হবে। যেকোনো দেশের বিদ্যমান শ্রেণিসমূহের যারা জীবনের প্রয়োজনে সমাজের আমূল রূপান্তর চান–তাদের ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে গড়ে উঠবে সচেতন রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী। কিন্ত তা তো স্বংক্রিয়ভাবে বা কোনো মেশিনের মাধ্যমে কিংবা নিপীড়িত মানুষের ভেতরে ২/৪টি বক্তৃতা দিয়ে হবে না। হবে না লোক দেখানোর সভা-সমাবেশ করে। হবে না শুধু তাৎক্ষণিক কিছু বৈষয়িক দাবির কথা বলে। তা করতে হলে পরিকল্পিত সচেতন প্রয়াসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার দায়িত্ব কে নেবেন– নিতে হবে নেতৃত্বকে ধৈর্য ধরে সাহসের সাথে। কিন্তু এভাবে না করার কারণে বকাউল্লারা মাঠ গরম করার সুযোগ পেয়ে যান।

বুর্জোয়া দল ও নেতৃত্বের সমালোচনা আমরা করতে পারি। তাদের কীর্তি আমরা সাধারণের সামনে তুলে ধরতে পারি। কিন্তু শুধু তাতে লাভ কী? আমরা কী করতে চাই, কী করা উচিত–তা শ্রমজীবী-মেহনতি সাধারণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কিন্তু তুলে ধরবে কে? গণআন্দোলনের সংগঠনসমূহকে সে দায়িত্ব নিতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ নানা পেশার শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত ও সংগ্রামমুখী করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেতৃত্বের কাজ। আমাদের দেশের বামপন্থিদের দীর্ঘকালের সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। তবে ঐতিহ্যকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখার সময় এসেছে। পরাধীন আমল আর স্বাধীন-সার্বভৌম আমল এক নয়। আবার শ্রমজীবী সাধারণের জীবনের সমস্যা অনেক বেড়েছে। এর আগে আমি এক লেখায় (৩০ মে ২০২১ এ একতায় প্রকাশিত) উল্লেখ করেছিলাম পূর্বে কৃষকের সমস্যা ছিল জমির মালিকানা ও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য হিস্যা নিয়ে। আর এখন একজন কৃষকের নিজের জমি থাকলেও ফসল উৎপাদন ও বিপণন নিয়ে বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমার সামান্য অভিজ্ঞতা মতে অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরও কৌশলী আমাদের হতে হবে। কিন্তু পরিস্থিতির কথা বলে গা এলিয়ে দিলে হবে না। বরং প্রয়োজন দৃঢ়তার।

সাম্প্রতিক ৩০/৪০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখছি যে, দেশের বামপন্থি দলগুলিও তাদের সংগঠনসমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্মকৌশল বাতলে দেবার ক্ষেত্রে দৈন্যতার পরিচয় দিচ্ছে। কেউ কেউ মূল দলের চূড়ান্ত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংগঠনসমূহের নামকরণ করছেন। ফলে সেখানে স্বাধীন গণআন্দোলনের চরিত্র থাকার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম। এতে সংগঠন বা আন্দোলনসমূহ দলের অঙ্গে পরিণত হয়। তাতে হয়তো সাময়িক জমায়েত ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু আখেরে তা হবে কাঁচা আম ধোয়া বা কেমিক্যাল দিয়ে পাকা করার সামিল। সুদীর্ঘ কাল হতে দুনিয়াব্যাপী গণআন্দোলনের যে ফলপ্রসূ ঐতিহ্য তা আর থাকে না। বুর্জোয়াদের পরিচালিত বা শাসিত সমাজে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গ্রাম্য পুলিশ সবারই লক্ষ্য শ্রেণিবিভক্ত, শ্রম শোষণ বা শ্রম দাসত্বের সমাজ টিকিয়ে রাখা। সব দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও রয়েছে প্রশিক্ষিত আধুনিক বিশাল সেনা বাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী। কিন্তু তার বিপরীতে পরিবর্তনের জন্য, সমাজের আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষই গণসৈনিকের ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু প্রত্যেক বাহিনীরই অধিনায়ক থাকে; এই বাহিনীর অধিনায়ক কে? অধিনায়ক হলো পার্টি। তবে তা গড়ে উঠতে হবে স্ব-স্ব শ্রেণির অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রহণের মাধ্যমে। গণআন্দোলনকে সরাসরি পার্টিসানসিপ করা হলে তা কাঁচা আম জোর করে পাকা করার মতো হবে। এরকম কৌশল নিয়ে ক্রিয়াশীল বামপন্থি দলগুলি সম্পর্কে বাস্তবতার প্রেক্ষিতে অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, ‘দলের সদস্য সংখ্যা গণআন্দোলনের সদস্য হতে অনেক কম হতে পারে, নেতৃত্ব বেশ অভিজ্ঞ ও জানাশোনা হতে পরেন; কিন্তু পার্টি সংগঠন শেষ পর্যন্ত সুসংবদ্ধ হবে না।’ হতে পারে না। কেননা এসব দলে সৈনিক তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও মাঠের কাজের চাইতে যান্ত্রিকভাবে তত্ত্বচর্চার চর্চা করা হয়। চর্চা করতেই হবে। চর্চা টেবিলের চাইতে মাঠে কম করলে সমস্যা থেকেই যাবে। মাঠের কোনো কাজ শ্রেণিস্বার্থের অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের নাকি জাতীয় স্বার্থের কোনো আন্দোলনের কাজ। দু’টোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটি হবে না। তবে কখন কোন কোন কাজটাকে অধিক গুরত্ব দিতে হবে– তা যথাযথ পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দেয়। আরো একটা মৌলিক কৌশলগত সমস্যা বামপন্থি দলগুলির ক্ষেত্রে বিদ্যমান। কমরেড স্ট্যালিনের ভাষায়- ‘নিজস্ব কার্যক্রম, নিজস্ব রণকৌশল ও নিজস্ব সাংগঠনিক ধারণার ঐক্যের মাধ্যমে পার্টি গড়ে উঠবে’। প্রায়শ এই থিওরি দিয়ে গণআন্দোলন বা গণসংগঠন গড়তে গিয়ে তা অঙ্গে পরিণত হয়ে যায়। ফলে আর গণচরিত্র থাকে না। আবার গণচরিত্রের নাম করে অনেক সময় যা করা হয়, তা কোনোক্রমে পার্টি গড়ে তোলার পক্ষে সহায়ক হয় না। ‘গণ’ করার বুলি আওড়িয়ে অনেক সময় বড় বড় কথা বলে মনের গভীরের রাজনৈতিক লাইনটাকে ধীরে ধীরে সামনে আনতে সচেষ্ট থাকেন। গণ আন্দোলনে লাইন পুস করা ভাল-মন্দ দুইই হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি ‘ভালোর’ সাক্ষ্য বহন করছে না। এবং এই উভয় ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার্টি ও গণসংগঠনের অর্থাৎ হয় ‘ঢিলেঢালা গণচরিত্র নয় কঠোর যান্ত্রিকতা’র মধ্য দিয়ে পার্টি ও গণআন্দোলনে কমরেড স্টালিনের ভাষায় বাক্যবাগিশদের জন্ম হবে। স্টালিন আরও বলেছেন- এই বাক্যবাগিশেরা পার্টির কার্যক্রম, রণকৌশল-নীতি ও সাংগঠনিক বিষয় ‘মেনে নেবে’– কিন্তু গলাবাজি করা ছাড়া কিছুই তাদের করার নেই। এরকম গলাবাজ-বাক্যবাগিশ-তত্ত্ববাগিশদের পার্টি ও গণআন্দোলনের নেতা হিসাবে মেনে নেয়ার অর্থ হলো গৌরবময় সোনালী ঐতিহ্যের পবিত্রতাকে নষ্ট করা। তাতে একথাও ঠিক যে, কোনো মানবশিশু নষ্ট মানুষ হিসেবে জন্ম নেয় না। ব্যবস্থাই মানুষকে নষ্ট মানুষে পরিণত করে। ঠিক তেমন কোনো কর্মীই গণআন্দোলনে গলাবাজ-বাক্যবাগিশ হিসেবে আসে না। গণসংগঠন ও গণআন্দোলন পরিচালনায় রাজনৈতিক দলের ভুল কর্মকৌশলই মূলত দায়ী।

অবশ্য ব্যতিক্রম নাই– তা নয়। আছে গণসংগঠন-গণআন্দোলনের গণচরিত্র বজায় রেখে স্ব স্ব শ্রেণির মেহনতি মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় গড়ে তুলতে হলে নতুন নতুন ক্যাডার তৈরি করতে হলে দল ও গণআন্দোলনে কর্মরত নেতৃত্বকে দায়িত্ব নিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য সময়ের জন্য সাময়িক এবং সামনের জন্য দূরবর্তী কর্মকৈৗশল নির্ধারণ করা। ভুল হতে পারে– সংশোধনেরও তো সুযোগ আছে। ‘ভুলের ভয়ে করব না ভুল– এটা হবে সর্বনাশা ভুল’। শাসকশ্রেণির বর্জোয়া ক্ষমতাশীলদের দ্বারা সৃষ্টি ঘটনার প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ জানানো আর গণমানুষের জীবনের সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক লড়াই নিশ্চয় এক নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ সব সময়ই দল জানাবে বা সব সময়ই গণদের দ্বারা করা হবে এরকমটা ঠিক নয়। এখানে পার্টি নেতৃত্বেকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোন প্রতিবাদ কোন ব্যানারে হবে বা কোন মঞ্চ থেকে তা বিচক্ষণতার সাথে ঠিক করতে হয়। তবে কোনো ক্রমেই অহেতুক চাপিয়ে দেবার প্রবণতা ভুল। স্ব স্ব শ্রেণি স্বার্থের কাজ ও জাতীয় স্বার্থের কাজ বা আন্দোলনের দ্বান্দ্বিকতাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ হলো পার্টি ও গণসংগঠনের সম্মিলিত ও যৌথতার সাথে জড়িত।

গণসংগঠন স্বাধীনভাবে কাজ করবে নাকি অন্যভাবে। অন্যভাবে বলতে আবার দু’ধরনের পদ্ধতিরই প্রবণতা বিদ্যমান। একটা হলো সরাসরি দল দ্বারা বাদলের নেতৃত্ব দ্বারা– যার কিছু প্রবণতার কথা আগেই সংক্ষেপে বলেছি। অন্যটি হলো গণসংগঠনের স্বাধীন সক্রিয়তা বজায় রেখে পার্টি ও গণসংগঠনের নেতৃত্বের যৌথ প্রবণতা। কিন্তু স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছে, তাই করা নয় বা হঠাৎ মনে হলো করে বসলাম সব সময় তাও নয়। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, নির্যাতিত নালী, ছাত্র, যুব পেশাজীবী শ্রমজীবী মানুষ দীর্ঘ মেহনত দ্বারা যেমন সভ্যতার বিনির্মাণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করছেন। ঠিক তার পাশাপাশি স্ব স্ব শ্রেণি দীর্ঘ লড়াইয়ের দ্বারা তার ভবিষ্য লড়াইকে অগ্রসর করার জন্য আইনি অধিকার অর্জনের সাথে সাথে নিজস্ব সংগঠন সংগ্রাম পরিচালনার ও নিয়মনীতি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জন করেছেন। অর্জিত নিয়মনীতির প্রতিপূর্ণ আস্থা রেখে সততার সাথে কাজ করার বা সংগঠন পরিচালনার নাম হলো গণসংগঠনের ‘স্বাধীনতা’। কিন্তু সর্বাগ্রে প্রয়োজন হলো নিজস্ব শ্রেণির সক্রিয় ঐক্যবদ্ধ গণসংগঠন। ঐক্যবদ্ধ হওয়া মানে নিছক কমিটি গঠন অফিস নির্মাণসহ কিছু লোক এক হয়ে বৈষয়িক কোনো বিষয় নিয়ে এক সুরে কথা বলা, ‘ধরো-মারো’–তা কিন্তু নয়। যদিও এসবেরও প্রয়োজন আছে। কিন্তু এগুলো চূড়ান্ত কথা নয়। তাহলে বারবার হাজার বার আমাদের ফিরে যেতে হবে মহামতি লেনিনের কাছে। ঐক্য প্রসঙ্গে লেনিন বলেছেন, “আলোচনার সময় নিজের মত প্রকাশ করা, অন্যের মত মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়ে শ্রবণ করা, সংগঠিত অধিকাংশের মত নির্ণয় করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সে মত ব্যক্ত করা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সততার সাথে বাস্তবায়ন করা– একেই বলে ঐক্য। এরূপ ঐক্য মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে অসীম মূলবান ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ”। কমিউিনিস্ট পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টিসহ যে সব দল তার কাজের জন্য শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি জনগণকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে, মতাদর্শ হিসেবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে গ্রহণ করেছে এবং চূড়ান্ত লক্ষ হিসেবে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদকে স্থির করেছে– সেসব দলের পক্ষে লেনিন নির্দেশিত উক্ত ‘ঐক্যের’ বাইরে যাবার সুযোগ নাই। গেলে কী হয় তা আমরা বুঝতেছি। আমাদের সাংগঠনিক কাহিলতাই বড় উদাহরণ।

গণআন্দোলন-গণসংগঠন পরিচালিত হবে বাস্তব কাজের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে স্ব স্ব গণসংগঠনের নিজস্ব গঠনতন্ত্রের দ্বারা। ভালো কথা– সমস্যা কোথায়? আছে সমস্যা। আন্দোলনের কাজ আর সাংগঠনিক কাজ তো এক নয়। আন্দোলনের মাধ্যমেই সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। আবার গঠিত সংগঠনকে দায়িত্ব দিয়ে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু মুশকিল হলো আন্দোলন ছাড়াই বিভিন্ন সংগঠনের কাঠামো গড়ে তোলা। কেউ যদি আন্তরিকতা দিয়ে গড়ে তোলেন এবং পরে ন্যূনতম আন্দোলনে না নামান– তা হলে তা ঠিকে থাকে না বা বোঝা হয়ে উঠে। সাংগঠনিক কাজের দক্ষতা দ্বারা গণসংগঠনের প্রকাশ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনের কাজ পরিচালনা করাই শ্রেয় বলে মনে হয়। হঠাৎ তন্ত্র সব সময় ঠিক নয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় কখনও কখনও করা লাগতে পারে।

কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বামপন্থি দলগুলি অঙ্গ সংগঠন বা সহযোগী সংগঠনের দারায় বিশ্বাসী নন। গণসংগঠনের গণআন্দোলনের মাধ্যমে নতুন ক্যাডার বের করে আনার দায়িত্ব স্থানীয় পার্টি সংগঠনের। আর এ কাজ করতে যেয়ে নীতি-নৈতিকতা, আদর্শবাদিতা শেখানোর আগে মতাদর্শগত চর্চা করা যক্তি যুক্ত নয়। টার্গেট ক্যাডারকে সমাজের কাছে আগে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারাটা হলো দায়িত্ব।

গণসংগঠনের অগ্রসর কর্মীদের জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলিকে স্থানীয় পার্টি নেতৃত্বকে আত্মস্থ করে তার সাথে জীবন্ত যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারাটা হলো বড় কাজ। হরহামেশা হুকুম দিয়ে যান্ত্রিকভাবে কাজের চেকআপ করে এ দায়িত্ব যথার্থ হয় না। এভাবে তো গণ আর গণ থাকে না, অঙ্গে পরিণত হয়। ধরে নিচ্ছি মনের অজান্তে করা হয়। ফলে চলুন গড়ে তুলি লেনিনীয় ‘গণ’ ধারা। যে সকল বামপন্থি দল চূড়ান্ত লক্ষ হিসেবে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে মূল কাজ হিসেবে দৃঢ়ভাবে স্থির করেছেন, সেসব দলগুলির গণসংগঠনগুলি ও তাদের লক্ষ হিসেবে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছে। পার্টি ও গণসংগঠনের আন্তঃসম্পর্ক শুধু এই সমাজতন্ত্র লেখার মধ্যে কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দল বুর্জোয়া শ্রেণির সবল উচ্ছেদের জন্য রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবে আর গণসংগঠনসমূহ সমস্ত শ্রেণি-পেশার নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ ঐক্যবদ্ধ করে সাধারণের জীবনসংগ্রামকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে মানুষের মনোজগতে মতাদর্শগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করবে। এভাবেই দল ও গণসংগঠনের আন্তঃসম্পর্ক দৃঢ় হয়। তারও আগে প্রয়োজন দলের পক্ষ থেকে যারা হেড কোয়াটারে ও স্থানীয়ভাবে গণসংগঠনের দায়িত্বে তাদের বিপ্লবের প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং উন্নত সংস্কৃতিসম্পন্ন মনোভাবের মানুষ হওয়া। কোনো রকম গোজামিল, পছন্দ-অপছন্দ লোক দেখানো কিছু করা অবশ্যই পরিহার করা। আবার গণসংগঠনসমূহ যাতে সাময়িক কিছু দাবি বা অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের মধ্যেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য পার্টি নেতৃত্বকে দৃঢ় থাকতে হয়। সমাজ-সংস্কৃতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ নগদ কিছু চায়।

কিন্তু এ ধরনের তথাকথিত বাস্তবতায় গা এলিয়ে দেয়া বিপ্লবীদের সাজে না। অতীত ঐতিহ্য এবং নানা জনবিরোধী কার্যকলাপের বিরোধিতা করার কারণে বামপন্থিদের প্রতি কিছু মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা তাকে কাজে লাগাতে পারছি না। শাসক বুর্জোয়াদের কুকর্মের প্রতিবাদ করছি, কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারছি না। গার্মেন্ট সেক্টর ছাড়া অন্য কোনো গণসংগঠনই স্ব স্ব শ্রেণির স্বার্থের কার্যকর কোনো লড়াই করতে পারছে না। কথা না বাড়িয়ে বলতে হবে নানাবিধ দুর্বলতার কারণে আমাদের জমায়েত ক্ষমতা কমতির দিকে। তবে মূল কারণ আমাদের বিবেচনায় গণসংগঠনসমূহের নিজস্ব লড়াই কমে যাওয়া। নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কমিটি-সর্বস্বতা বিদ্যমান।

একদিকে চর্চার অভাব অন্যদিকে বাস্তব লড়াইয়ের শিক্ষার দুর্বলতা– এ দুই মিলে বামপন্থি দলগুলি চিকন মানুষের রূপ নিয়েছে। সবই আছে– প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নাই। নেতা আছে কর্মী নাই, কর্মী থাকলেও কাজের ধারাবাহিকতা নাই। ফলে দল ও গণসংগঠনের নেতৃত্বের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ বলবেন আমরা স্বাধীন আবার কেউ বলবেন স্বাধীন হলেও দায়বদ্ধতা আছে। এ ধরনের তর্কে কোনো লাভ নাই। যে কোনো উপায়ে কাজে নামতে হবে। সামনে থেকে সাহসিকতার সাথে মানুষের লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে হবে। কাজ হলো মূল কথা। নাম হলো উপলক্ষ মাত্র।

লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি। 

One thought on “গণ, অঙ্গ ও সহযোগী– আলোচনা নিরর্থক নয়

  • September 3, 2021 at 10:57 pm
    Permalink

    কমরেড লাল সালাম। ভালো থাকবেন।
    একতায় আপনার সুন্দর উপ-সম্পাদকীয়
    লেখা পড়লাম। সময়োপযোগী এবং বাস্তবতা
    প্রতিফলিত হয়েছে।গরু মার্কা ঢেউ টিন না হয়ে,
    গণ-সংগঠনের স্বাধীনতার চর্চা এবং অস্হিত্ব-
    বিকাশের তাগিদে রাজনৈতিক দিশায় সচেতন
    কর্মীবাহিনী গড়ে তোলে নতুন পথ নির্মাণ আবশ্যকীয় পূর্ব শর্ত বটে। ধন্যবাদ কমরেড।

Leave a Reply

Your email address will not be published.