গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে –সিপিবি

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। অভ্যুত্থাণের

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মহান ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থাণের অন্যতম মহানায়ক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক, গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম নেতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, সাবেক সাংসদ কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এসব কথা বলেন।

সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে গতকাল (০৯ অক্টোবর) শনিবার ঢাকার মুক্তিভবন ও মিরপুরে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় দুটি আলোচনায় অনুষ্ঠিত হয়।

বিকাল সাড়ে চারটায় মুক্তিভবনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও ও মিরপুরে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম।

আলোচনা সভায় কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমান দেশের গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে। দ্রব্যমূল্য প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে। সরকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ না করে আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের কল্যাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সরকারের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে আনা এবং দুঃশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার সম্মান রক্ষায় লাখ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের লড়াই আরও জোড়দার করতে হবে। তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ আজীবন এদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়াই করে গেছেন। মাত্র ৪৯ বছরের জীবনের তিনি এদেশের মেহনতী মানুষের মুক্তির আন্দোলন করতে গিয়ে বার বার কারাবরণ করেছেন, আত্মগোপনে থেকেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, কমরেড ফরহাদ অসাধারণ কোনো তাত্ত্বিক ছিলেন না। প্রায়োগিক অবস্থান থেকে তিনি তত্ত্বের দিকে হাত বাড়াতেন। বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বাস্তব জ্ঞানের সঙ্গে তত্ত্বকে যুক্ত করে কাজ করতেন। কমরেড ফরহাদের কাজে প্রয়োগের দিকটি প্রাধান্য পেত। এর কারণ হলো, তাঁর দৈনন্দিন রাজনৈতিক কাজগুলো এত বহুমাত্রিক, বিস্তৃত ও প্রসারিত ছিল যে তত্ত্বচর্চায় আরও মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় তিনি পেয়ে উঠতেন না।

কমরেড সেলিম আরও বলেন, রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি নির্ধারণে ফরহাদ ছিলেন অসাধারণ ধী-সম্পন্ন। রাজনৈতিক ট্যাকটিশিয়ান হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য প্রতিভার অধিকারী। রাজনৈতিক, সাংগঠনিক সব বিষয়কে তিনি যেমন তাৎক্ষণিকতার মাপকাঠিতে বিচার করতেন, তেমনি সময়ের আরও বিস্তৃত ক্যানভাসে বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারতেন। কমরেড ফরহাদ স্বপ্ন দেখতেন বিপ্লবের। সময় যেন তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াসে তিনি তাঁর সর্বসত্তা নিবেদন করেছিলেন। তিনি ঘটনাবলিকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ত্বরিতগতিতে প্রবাহিত করার নানা প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন।

পুরানা পল্টনস্থ মুক্তিভবনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও আলোচনা করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, জলি তালুকদার, সদস্য আব্দুল কাদের ও মো. কিবরিয়া।

এদিকে বিকেল সাড়ে চারটায় মিরপুর ১০নং ওয়াইডব্লিউসিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ষাটের দশকের আইয়ুব শাহির বিরুদ্ধে সংগ্রামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গণ-আন্দোলনের প্রক্রিয়াকে পরিচালনার ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ দক্ষতার প্রমাণ তিনি রাখতে পেরেছিলেন। কমরেড ফরহাদকে তাই বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনের মস্তিষ্ক, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যের স্থপতি, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কন্ট্রোল রুমের নায়করূপে ভূষিত করা হয়ে থাকে।

তিনি একজন বিশাল ক্যারিশমাসম্পন্ন জননেতা না হয়েও জাতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে যেতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন নেতাদের ‘নেতা’। অনেকেই তাঁর কাছে বুদ্ধি নেওয়ার জন্য আসত এবং সবাই তাঁর পরামর্শকে মূল্য দিত।

শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন সর্বাংশে একজন কমিউনিস্ট। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ ও মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের আদর্শের প্রতি তিনি ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আত্মনিবেদিত। তাঁর সমস্ত জীবন, সত্তা ছিল সর্বতোভাবে পার্টির জন্য নিবেদিত।

মিরপুরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম। বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মাহাবুবুল আলম, সম্পাদক আহসান হাবিব লাবলু, রিয়াজউদ্দিন, মোতালেব হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও জয়িতা চৌধুরী।

এছাড়া গতকাল সকালে ৮টায় বননীস্থ কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সমাধিতে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটিসহ বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম, কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, ডা. দিবালোক সিংহ, আব্দুল কাদের, ডা. সাজেদুল হক রুবেল, লুনা নূরসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.