গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরে পেতে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে হবে

ভাষ্যকার 

গত কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদের ভিতরে ও বাইরে করোনা বিপর্যয় মোকাবিলায় জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে সরকারের আমলা নির্ভরতায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তার এই মতামত কতটা হতাশাজনিত আর কতটা রাজনৈতিক এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল মহল সন্দেহ পোষণ করে। তিনি মাঝে মাঝে সরব হন আবার পরক্ষণে মিইয়ে যান। কেন সরব হন আবার কেনইবা মিইয়ে যান এ বিষয়ে দেশবাসী অন্ধকারেই থাকে। তবে তিনি যে ‘আমলা নির্ভরতা’র প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন তা বর্তমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতা, কর্তৃত্ববাদী-ফ্যাসিবাদী শাসনের চরিত্রটিকেই উন্মোচিত করেছে।

দৈনিক পত্রিকাসমূহে রিপোর্ট বেরিয়েছে জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘জেলায় জেলায় সচিবদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষ মনে করে সংসদ সদস্যরা করোনার সময় যেসব সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, সেগুলো প্রশাসন দিয়েছে।’ তিনি নিজের এলাকার অবস্থা জানিয়ে ক্ষোভ দেখিয়ে বলেছেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব কিন্তু এলাকায় একবারও যাননি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা যারা এই জাতীয় সংসদের সদস্য, এমন একজনও নেই, যিনি এই করোনাকালীন সময়ে নিজস্ব অর্থায়নে বা যেভাবেই হোক গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াইনি। সবাই দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু, মানুষ মনে করে প্রশাসন এসব দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা সচিবদের ওপরে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা থাকবে, কিন্তু রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে নয়।’ তোফায়েল আহমেদ আরো বলেছেন, ‘১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। তখন মন্ত্রীরা জেলার দায়িত্ব পালন করতেন। সেখানে গেলে কর্মীরা আসতো। মন্ত্রীরা গ্রামে-গঞ্জে যেতেন। কোথায় যেন সে দিনগুলো হারিয়ে গেছে। দেশ রাজনীতিশূন্য। কোথাও রাজনীতি নেই। প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের সঙ্গে কথা বলেন। আর সংসদ সদস্যরা দূরে বসে থাকেন। তারপর বলে ডিসি সাহেব, আমি একটু কথা বলব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এই হচ্ছে রাজনীতিবিদদের অবস্থা।’ তোফায়েল আহমেদের কথার প্রতিধ্বনি করে জাতীয় সংসদে আরেকজন সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘রাজনীতির মঞ্চগুলো ব্যবসায়ীরা দখল করে নিয়েছেন। দেশ চালাচ্ছেন জগৎশেঠরা আর আমলারা। রাজনীতিবিদরা এখন তৃতীয় লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।’

ক্ষোভে হোক আক্ষেপে হোক আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ শত কথার মাঝে খাঁটি যে কথা বলেছেন তাহলো– ‘একটি রাজনৈতিক সরকার এবং রাজনীতিবিদদের যে কর্তৃত্ব, কাজ, সেটি আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে।’ তোফায়েল আহমেদের নিজের স্বীকৃতি অনুযায়ি দেশ রাজনৈতিক দল চালাচ্ছে না দেশ চালাচ্ছে অন্য কেউ। এর জবাবও জাতীয় সংসদ থেকেই পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে সামনে রেখে লুটেরা ব্যবসায়ী ও সাবেক-বর্তমান সামরিক-বেসামরিক দুর্নীতিবাজ আমলারা দেশ চালাচ্ছে।

আজ তোফায়েল আহমেদ সাহেব হতাশা ব্যক্ত করছেন কিন্তু তিনি কি আজকের পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারবেন। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে তিনি দলের ভেতরে কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন? যারা উদ্যোগ নিতে চেয়েছিল তাদের যখন অপদস্ত করা হয় তখন তিনি নিস্পৃহ ছিলেন। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের সহযোগিতায় ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সময় কি বলেছিলেন আখেরে গণতন্ত্রের জন্য এটা ভাল হবে না? অবশ্য ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনদের ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নে সহযোগি হওয়ার কথিত অভিযোগে তখন তিনি সংসদ সদস্য থাকলেও ছিলেন সাইড লাইনে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনে তিনি নিজেও নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির নির্বাচনেও তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এ ধরণের নির্বাচন যে গণতন্ত্র হরণকারী- এ কথা বলেছেন বলে কেউ শুনেনি। নতুন করে ষড়যন্ত্র হচ্ছে ২০২৩ সালের নির্বাচন নিয়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এ ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এখানেও তোফায়েল আহমেদরা চুপ।

সবাই জানে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ তে আওয়ামী লীগ ও তার জোটকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে সামরিক-বেসামরিক আমলাচক্র। নাটের গুরু বা সমস্ত ঘটনার পরিকল্পনাকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পরের দিন খুনী মোস্তাকের রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী সাবেক এক আমলা। থানা-পুলিশ-র্যা ব-সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় উপজেলা নির্বাচন অফিস ও তার কর্মকর্তাদের নিস্ক্রিয় রেখে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মিদের হতবিহ্বল করে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে দিনের ভোট রাতে করে যে নির্বাচনে তোফায়েল সাহেব নির্বাচিত হয়েছেন। আমলা বাহিনীর সে নির্বাচন দখল নিয়ে তোফায়েল সাহেব কোনো বক্তব্য জাতির সামনে রাখেননি।

আজকে আমলা বাহিনী যখন তাদের কাজের স্বাদ উপভোগ করছে তখন রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদদের ‘শীতনিদ্রা’ ভঙ্গ হচ্ছে। ততদিনে ক্ষমতার দণ্ড চলে গেছে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের হাতে। ষাট বছর রাজনীতি করা তোফায়েল সাহেবদের হা-হুতাশ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়াই এখন একমাত্র কাজ।

তোফায়েল সাহেবদের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য যেভাবে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করে গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করার অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করেছে তা জাতির ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছে। ঘোর করোনা অতিমারিকালে পাশের দেশ ভারতের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৭.৩%। অথচ আমাদের কৃষক, পোশাক শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের কারণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪%। এ প্রবৃদ্ধির পরেও সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর তথ্য অনুযায়ি করোনাকালে নতুন করে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে নেমে গেছে অর্থাৎ এদের দৈনিক আয় ১.৯ ডলার বা ১৬০ টাকার নীচে নেমে গেছে। নতুন-পুরাতন মিলিয়ে দেশে বর্তমান ৪ কোটি ৯৬ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। ৭৭% মানুষের আয় কমে গেছে। লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ী, বাটপার রাজনীতিকদের আয় বাড়ছে। করোনাকালে দুর্নীতির মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটিপতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কানাডায় বাংলাদেশী দুর্নীতিবাজদের নতুন বেগমপাড়া গড়ে উঠেছে। করোনাকালে নিজের প্রিয় ব্যবসায়ীকে করোনা টিকা থেকে মুনাফা করার সুযোগ দিতে এ সরকার ভুলেনি। এর সবকিছুই হচ্ছে যেনতেন প্রকারে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা কব্জা করে রাখার মানসিকতা থেকে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে আমলাদের সহযোগিতায় নতুন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা রচনা করছে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল ফলে সকল বিরোধীদলের নির্বাচন বর্জনের কারণে আওয়ামী লীগ ওয়াকওভার নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল। ২০১৮ সালে ভিন্ন পরিকল্পনা। দিনের ভোট রাতে করার মধ্য দিয়ে ভোটারবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়েছে। ২০২৩ সালের নতুন পরিকল্পনা ইভিএম ম্যনিপুলেট করে পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগকে স্বরাষ্টমন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত করার মধ্য দিয়ে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সামরিক-বেসামরিক আমলাচক্রের প্রত্যক্ষ মদদে ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কবর রচনা করেছে। সহযোগি সাবেক-বর্তমান সামরিক-বেসামরিক আমলাদের প্রমোশন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, অবাধ দুর্নীতির সুযোগ, জাতীয় সম্পদ সুলভে বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে কমিশনভোগ, হত্যাকাণ্ডের দণ্ডপ্রাপ্ত স্বজনের সাজা মওকুফ ইত্যাদি সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাদের ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।

জাতির সামনে নেমে আসা এই ঘোর অমানিশা থেকে মুক্তি পেতে দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক আমলাচক্র ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের মধুচক্রকে ভাঙ্গতে হবে। কর্তৃত্ববাদকে পরাজিত করে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। সামরিক-বেসামরিক আমলা ও লুটেরা রাজনীতিক এই তিন মাস্কিটিয়ার্সকে পরাজিত করতে হলে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরে পেতে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.