গণতন্ত্রহীনতার কারণেই আজ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন  

আমরা যারা সক্রিয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত আছি, তাদেরকে মানুষের কাছাকাছি যেতেই হয়। সাধারণ মানুষের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সাম্প্রতিককালে এটা বেড়েছে। চেনা-জানা মানুষের মধ্যে থেকে প্রশ্ন করে, কী ভাই, দেশে কী হচ্ছে? জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনতো দুর্বিষহ হয়ে গেছে। এই হাসিনা সরকার তো দেশ ধ্বংস করে দিলো। এই সরকার কি আরও ক্ষমতায় থাকবে? এই সরকার কি পড়বে না? কেউ কেউ বলেন, এই সরকারকে ফেলবে কে? বিরোধী শক্তিতো দুর্বল। প্রধান বিরোধীদল হিসেবে পরিচিত বিএনপির তো মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে। দেশে কি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে নাকি ১৪ ও ১৮ সালের মতো নির্বাচন হবে? আপনারা সরকারের অন্যায়-অবিচার-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন ঠিক কিন্তু আপনাদের তো সেই শক্তি নেই সরকার উচ্ছেদ করার। জনমনে দেশের রাজনীতি নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের দুঃশাসনে সাধারণ মানুষের নাভিঃশ্বাস উঠেছে। মানুষের মধ্যে বাড়ছে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি বাড়ছে অনীহা। কেননা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্বৃত্তায়ন চলে আসছে আমাদের দেশে। বর্তমান সরকারের আমলে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লুটেরা বণিক গোষ্ঠী, সামরিক-বেসামরিক আমলারা তাদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। ফলশ্রুতিতে দেশে বিরাজ করছে একটা অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আগামী নিবার্চনের আওয়াজ তুলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই বিশ্বাস করছে না বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। এদেশের মানুষ ২০১৪ ও ২০১৮ এর ভোটারবিহীন নির্বাচন ভুলেনি। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততোই ঘোলাটে হবে। ইতোমধ্যেই পত্রপত্রিকায় নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের খবর আসছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ও জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছেন। কেউ কেউ জাতীয় সরকারের কথা বলছেন। আবার জাতীয় সরকারের মেয়াদ ও কাঠামো নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে নানা বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে ১০০টি আসন বিরোধী দলগুলোকে ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন সরকারি দল তাদের দখলে রাখবে এবং পুনরায় সরকার গঠন করবে। বর্তমান সরকার সকল গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। গণতন্ত্রহীনতার কারণেই আজ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তার নানা ধরনের এজেন্সিগুলো দিয়ে বিরোধীদলগুলোকে নানা টোপে প্রলোভন এবং দল ভাঙ্গার কাজ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশি বিদেশি চক্রান্তের চাপও তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ভেতরে ও বাইরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই আতঙ্ক ও অস্থিরতা থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নানাভাবে দমিয়ে রাখার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরোধী শক্তিকে দমন করার জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সরকার নানা ধরনের ইস্যু তৈরি করে মানুষের ক্ষোভকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। লুটেরা বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর এই খেলা নতুন নয়। যেভাবে দেশ চলছে তাতে মনে হয় সরকার বলতে কিছু নাই। এক ব্যক্তির নির্দেশে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। দেশে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকারের অন্যায় অত্যাচার লুটপাট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে উঠছে না। বামপন্থি কমিউনিস্টরা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই বামপন্থি শক্তিকে দুর্বল করার নানা ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জোট বামগণতান্ত্রিক জোটের নেতৃত্বে সরকার বিরোধী আন্দোলন যখনই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই বামপন্থিদের সম্পর্কে জনমনে নানা সংশয় তৈরি করা হচ্ছে। এখানে স্পষ্ট মনে রাখা প্রয়োজন, দেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বামগণতান্ত্রিক জোট গড়ে উঠেছে এবং লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

এই জোট শুরু থেকেই দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে লুটেরা ধনিক শ্রেণির রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেমন এই জোট লড়াই করছে পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার আেন্দালন সংগ্রামকেও বেগবান করতে সচেষ্ট রয়েছে। বামপন্থি দলগুলোর মধ্যেও কিছু সমস্যা তো রয়েছে যা অস্বীকার করার উপায় নেই সেই বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে বামপন্থি কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যখনই দেশে দ্বি-দলীয় ধারার শক্তির বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখনই এই শক্তিকে ভেতরে ও বাইরে থেকে আঘাত করা হয়।

সাম্প্রতিককালে আমরা লক্ষ্য করছি বামপন্থি দু-একটি দলের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে যা বামপন্থী আন্দোলনকে কিছুটা ক্ষতি করতে পারে। সে বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে বামগণতান্ত্রিক জোট গড়ে উঠেছে দ্বি-দলীয় ধারার লুটেরা ধনিক শ্রেণির রাজনীতির বিরুদ্ধে। তাই এই দ্বি-দলীয় ধারার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোনো শক্তির সাথে নতুন কোনো জোট বা মঞ্চ বামপন্থিরা গড়ে তুলতে পারে না। বর্তমান সরকারের ফ্যাসীবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বামপন্থিরা যেমন রাজপথে আছে তেমনি অপরাপর উদারনৈতিক দলগুলোও রাজপথে নেমে আসুক। রাজনীতির ক্ষেত্রে অস্থিরতা বামপন্থিদের দেখানোর সুযোগ নেই। সময়ই বলে দেবে কী করতে হবে।

আজ বামপন্থি ও কমিউনিস্টদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হচ্ছে বামগণতান্ত্রিক জোটের ধারাবাহিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখে আমাদের দেশে একটি বামগণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা। যে শক্তি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের শক্তি যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবে। কোনোভাবে লুটেরা বুর্জোয়া রাজনীতির ক্ষমতার খেলার ফাঁদে পা দেবে না। সামনে জাতীয় নির্বাচন আসবে। এই সরকারের অধীনে কোনো অবাধ ও নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তা আমরা সবাই জানি। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে লুটেরা বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বলবে তোমাদের ৫-১০ টা সিট দিবো আমাদের সাথে আসো। আবার কেউ বলবে ক্ষমতায় গেলে তোমাদের সাথে গিয়েই সরকার গড়ব। কেউ নগদ দিবে কেউ বাকি রাখবে। নগদ-বাকির এই রাজনীতিতে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

আমরা বামপন্থি কমিউনিস্টরা আদর্শের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। নীতি আদর্শের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতে পারি না। ধৈর্য্যরে সাথে জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমাদের যেমন থাকতে হবে পাশাপাশি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও সমভাবে থাকতে হবে। এই ধারাবাহিকতা রাখতে পারলে বামগণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। জয় আমাদের নিশ্চিত হবেই।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.