গণআন্দোলন, গণসংগ্রাম গড়ে তুলে সংকট মোচন করতে হবে

একতা ভাষ্যকার

একটা বড় রকমের অস্থিরতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যে দেশ ও দেশের মানুষ সময় পার করছেন– এ কথা কমবেশি সবাই বুঝতে পারছে।

করোনার ধাক্কায় দেশের ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষের কমে যাওয়ার তথ্য বেরিয়েছিল। ঐ মানুষদের অধিকাংশের আয় বাড়েনি। তারপর সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাতে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে বলে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট তার গবেষণায় জানিয়েছিল দু’সপ্তাহ আগে। এর মধ্যে দেশে সার ও ডিজেল, কেরোসিনসহ জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অতিষ্ট করে তুলেছে।

বিশ্বমন্দা, সংকট ও দেশের নানামুখী সংকটের মধ্যে আমাদের অন্যতম রক্ষাকবচ হলো দেশের কৃষি। এ বছর সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ বেশ কিছু এলাকায় ভয়াবহ বন্যা, আবার বৃষ্টি না হওয়াসহ জলবায়ু পরিবর্তন, সবসময় উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম না পাওয়ায় কৃষি সংকটে পড়েছে। এরপর বিদ্যুতের লোডশেডিং, সার ও ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কৃষির উৎপাদন খরচ বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য ব্যয় আবারও বেড়ে যাওয়ায় বাজারে আসার পর তা থাকবে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। ইতোমধ্যে এর প্রতিফলন হাড়েহাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষুদ্র শিল্পসহ শিল্পে এর প্রভাবে কর্মহানীসহ নানা সংকট সামনে আসবে।

সরকার শুরু থেকে ‘উন্নয়ন’, ‘ভালো আছি’, ‘ভালো থাকব’ ‘কোন সংকট নেই’সহ নানা কথা বললেও লোডশেডিং করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়নের গল্প যে গলার কাঁটা তা জনসম্মুখে প্রকাশিত হলো।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় খবর প্রকাশিত হলো: গত ৬ মাসে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বনিম্ন। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকার সময় দেশে দাম না কমিয়ে গত ৮ বছরে সরকার যেখানে ৪৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছিল। সেখানে মাত্র ক’মাসে ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচের ভার সহ্য না করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে মানুষের পকেট কাটার উৎসব করলো। এর মধ্যে দিয়ে নাজুক আর্থিক অবস্থার চিত্র আবার ফুটে উঠল।

বিদ্যুৎ খাতে গত ১২ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিভিন্ন কোম্পানিকে ৮৬ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হলো ক্যাপাসিটি চার্জের নামে। আর এসব ভুলনীতি, দুর্নীতি, কমিশন ভোগী আর গোষ্ঠী স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দায় সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চাপানো হলো। লোডশেডিং এরপরেও বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানোর ঘোষণা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসের দাম আবারও বাড়ানোর কথা হচ্ছে।

এসবের অভিঘাতে দেশ ও দেশের মানুষ শঙ্কা ও সংকট নিয়েই থাকছে। এই সংকট কখন আরো তীব্র হবে, সংকট কখন শেষ হবে–এসব ভাবতেই সময় পার করছেন সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে আরেক অংশ মানুষ আছেন বহাল তবিয়তে। এসব সংকটে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা মানুষকে উপহাস করে চলেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে আরেক মাইলফলক অতিক্রম করছে। সুইস ব্যাংকে পাচারকারীদের টাকার পরিমাণ বেড়েই চলছে। নামমাত্র ট্যাক্স দিয়ে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার অনৈতিক ঘোষণা, ঘোষণাই থেকে যাচ্ছে।

এসব পাচারকারী ও দুর্নীতিবাজদের বিচারের কথা নেই। দুর্নীতি-লুটপাট থেমে নেই। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, দখলদারিত্ব বেড়েই চলেছে। হতাশা, আত্মহত্যা, সমাজে অস্থিরতা, মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এর থেকে উত্তরণের পথ দেখা যাচ্ছে না। বরং সব সংকট চোখবুজে সহ্য করার নসিহত করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এই সংকটজনক অবস্থায় যুক্তিহীন কথাবার্তার বিপরীতে যুক্তির কথা শোনায়ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। সরকারি দলের হুমকি-ধামকি আরও প্রকাশ্যে আসছে। ভয়ের রাজত্বে নতুন মাত্রা যুক্ত করে মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে নানা ফন্দি  আঁটা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি নানা সংস্থার কার্যক্রম বৃদ্ধির খবরাখবর শোনা যাচ্ছে। অনেক বিষয়ে এসব শক্তি সরাসরি হস্তক্ষেপও করছে।

বিশ্ব পরিমণ্ডলে শুধু অর্থনৈতিক মন্দা নয়, এ সময়ের বেশকিছু ঘটনাবলী গোটা বিশ্ব এবং দক্ষিণ এশিয়াকে আলোড়িত করছে। যা বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। আমাদের দেশের ওপর সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তির নানামুখী চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ স্বার্থে বিভিন্ন জোটে আমাদের দেশকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা জোরদার করছে।

এরকম একটা গুমোট আবহাওয়ার মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। রাজপথে মানুষ নামছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নামার কথা বলা হচ্ছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি বাস্তবায়নে কোনো কথা বলা হচ্ছে না। রাজনীতিতে নানা ভাঙা গড়া চলছে। এসব পরিচালিত হচ্ছে প্রধানত ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বি-দলীয় ধারাকে কেন্দ্র করে। এই ধারার দুই পক্ষতো আগেই জানিয়ে দিয়েছে যারা এদের সাথে থাকবে তাদের নিয়ে আগামী দিনে সরকার গঠন করা হবে। অনেকে নানা জোট গড়ে তুললেও বা নিজেদের দৃশ্যমান করার চেষ্টা করলেও প্রধানত কোনো না কোনোভাবে ওই দ্বি-দলীয় ধারার কোনো না কোনো অংশে যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অধিকাংশ প্রচার মাধ্যম এই দুই ধারাকে সামনে নিয়ে আসছে। কিন্তু এর বিপরীতে রাজনীতিতে নীতিনিষ্ঠ বাম গণতান্ত্রিক শক্তির ধারা তাদের বক্তব্যকে সামনে এনে রাজপথে আছে। এই ধারার কথা প্রচার মাধ্যমে কম এলেও সচেতন মহল এদের উপক্ষো করতে পারছে না।

বর্তমান সংকট উত্তরণে এবং দেশ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ২৫, ২৬, ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ শেষ হওয়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “….বহুদিন ধরে চলতে থাকা রাজনীতির বাজারিকরণ, দুর্বৃত্তায়ন, নীতি-আদর্শ নির্বাসিত ‘বাজারি’ লেনদেন ও লাভ লোকসানের আত্মস্বার্থবাদী ভাবনায় নিমজ্জিত করা ইত্যাদি প্রক্রিয়া রাজনীতির সর্বনাশ ঘটিয়ে চলেছে। এমন একটা ‘বিরাজনীতিকরণের’ ফলশ্রুতিতে দেশ আজ কার্যত রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও মুষ্ঠিমেয় লুটেরা ধনিকদের অনেকটা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।….রাজনীতিতে লুটেরা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদী- আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির বিপদ বেড়েই চলেছে। বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা ও বিপদ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

ঐ প্রস্তাবে বলা হয়েছে “দেশের এমন হাল হঠাৎ করে হয়নি। বর্তমানে যে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে, পরিস্থিতির রুগ্ণতা তারই স্বাভাবিক ফলাফল।….পাঁচ দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বায়নমুখী বাজারি ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণের ফলে, রুগ্ণতার ভয়াবহ প্রকোপ দেখা যাচ্ছে এবং অব্যাহত সংকটজালে দেশ নিমজ্জিত হয়ে থাকছে। যে পথে দেশ চলছে, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতমুখী এবং বৈরী চরিত্রের। দেশকে রুগ্ণতা ও সংকট থেকে মুক্ত করতে হলে, বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা তথা রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতির পথে দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে।”

গৃহীত প্রস্তাবে, এই সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করা এবং বাম গণতান্ত্রিক কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করা এবং বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির জাগরণ ও উত্থান ঘটানোর প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে।

গত ৬ ও ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায়ও চলমান দুঃশাসনের অবসানের সাথে ব্যবস্থা বদলের সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য গণআন্দোলন-গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়ছে।

বর্তমান সংকট উত্তরণে এসব পদক্ষেপ ও এ জন্য জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি কর্তব্য হিসেবে সামনে এসেছে। জনগণের শক্তিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন, গণসংগ্রাম পারে বর্তমান সংকট উত্তরণে ভূমিকা রাখতে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে।

সাধারণ মানুষের রাজপথে থাকা ছাড়া নানা শক্তি তাদের নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারে সামনে আসবে। এতে মানুষের মুক্তি মিলবে না। এ জন্য দৃঢ়তার সাথে নিজেদের শক্তি সংহত করে দ্বি-দলীয় ধারার বিপরীতে বাম গণতান্ত্রিক জোটকে অগ্রসর করা এবং এই জোটে অন্যদের শরিক করতে যুগপৎ ধারায় বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল, ব্যক্তিবর্গ, সংগঠনকে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.