ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ‍্যবাদের বাগাড়ম্বর

বিপ্লব রঞ্জন সাহা 

ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ‍্যবাদ যখন তার দিনগত পাপক্ষয়ের মাধ‍্যমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার উপায় খুঁজতে ব‍্যস্ত, ঠিক তখনই দৃশ‍্যপটে ক্রিয়াশীল উদীয়মান সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব যাদের আশু ও চূড়ান্ত লক্ষ‍্যের কেন্দ্রবিন্দুতে মানব জাতিকে শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে পুরো বিশ্বকে সমাজতান্ত্রিক ব‍্যবস্থায় উন্নীত করা। এই বৈর বিপরীত ধারায় একদিকে নেতৃত্বে ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অপরদিকে ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগী হিসেবে ছিলো সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে ছিলো পুঁজিবাদী-সাম্রাজ‍্যবাদী দেশসমূহ। এই দুপক্ষের মধ‍্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধের প্রত‍্যক্ষ স্বাক্ষী এবং পরিণতি ভোগ করেছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিকামী জাতিসমূহের শোষণমুক্তির সংগ্রামে সহযোগিতা করতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশে দেশে শাসক-শোষক হিসেবে অধিষ্ঠিত পুঁজিপতি শ্রেণীকে শাসন ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ও দেশে দেশে বিরোধ জিইয়ে রেখে অস্ত্র ব‍্যবসার হীন মানসিকতায় জারি রেখেছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা। সেই বাস্তবতার এক পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটলেও বিশ্বজুড়ে কয়েক দশক যাবৎ মার্কিন সাম্রাজ‍্যবাদী শক্তির একচেটিয়া আধিপত‍্য ছিলো নিকট অতীতের বাস্তবতা। কিন্তু সমাজ ব‍্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে ঠেকিয়ে রাখা শেষ পর্যন্ত সম্ভবপর হয়নি কারণ দৃশ‍্যপটে হাজির হয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, যারা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আক্ষরিক অর্থেই এক চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানোর ফলে আবারো সাম্রাজ‍্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়া মহাসংকটের মুখোমুখি যার চরম পরিস্থিতির শিকার স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বাণিজ‍্য, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ সবদিক থেকে চীনের ছুঁড়ে দেওয়া কঠিন চ‍্যালেঞ্জের মুখোমুখি তখন করোনা মহামারি তাদের অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়েছে। প্রায় দেড় বছর ধরে মার্কিন মদদপুষ্ট প্রচার মাধ‍্যমই এই তথ‍্য তুলে ধরছে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে। নিজেদের অভ‍্যন্তরীণ সংকটকে তারা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে চীনের ঘাড়ে। একই পরিস্থিতির মধ‍্যে থেকেও যেখানে চীন করোনাকে মোকাবেলা করে ফিরে এসেছে স্বাভাবিক জীবনের ধারায়, যেখানে তারা তাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ধরে রেখেছে, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের করুণ মৃত‍্যুর পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবন যাপন, ব‍্যবসা-বাণিজ‍্য, কল-কারখানার উৎপাদন রাখতে হয়েছে কখনো আংশিক আবার কখনো পুরোপুরি বন্ধ। এই নাজুক পরিস্থিতেই সম্পন্ন হয়েছে তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যে নির্বাচনে প্রাক্তন ট্রাম্প প্রশাসনের কাঁধে ব‍্যর্থতার দায় চাপিয়ে, রিপাবলিকানদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধিত্বকারী জো বাইডেন।

ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্প প্রশাসনের যে সব পদক্ষেপকে ভুল বলে ঘোষণা দিয়ে নতুন ধরণের আমেরিকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জো বাইডেন মানুষের আস্থায় এসেছিলো, তা বাস্তবায়ন করার পরিবর্তে সেও ট্রাম্পের অনুসৃত পথই অনুসরণ করছে, আর তা হলো চরম চীন বিরোধিতা, চীনের উপর বাণিজ‍্যিক সংরক্ষণ নীতির প্রয়োগ, কোভিড-১৯-এর জন‍্য চীনকে দোষারোপ ইত‍্যাদি। এ ছাড়াও যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার সাথে এক বিরোধাত্মক সম্পর্কের প্রকাশ। যে ডেমোক্রেটিক দল বিগত নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের জন‍্য রাশিয়াকে ট্রাম্পের পক্ষে ইলেকশন টেম্পারিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত করে আসছিলো, এবারের নির্বাচনে সেই দল ক্ষমতায় এসে একই সুরে রাশিয়া ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়িয়ে যখন অবস্থা নাজুক বুঝতে পেরেছে, তখন ইউরোপ ভ্রমণকালে এক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অভিপ্রায় ব‍্যক্ত করলে পুতিনের সম্মতিতে সেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দিন ধার্য‍্য হয়েছে ১৬ জুন। ঘোষণার পর থেকেই সারা বিশ্ব তাকিয়ে আছে পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই সম্মলনে আসলে কি হয় তা দেখার জন‍্য।

এই সম্মেলনকে সামনে রেখে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন‍্য সবচেয়ে বড় যে চ‍্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলো হলো-ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছিলো তাকে জো বাইডেন কমিয়ে বিশ্ব পরিসরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিতে সমর্থ হবে কিনা, বা জো বাইডেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, যাকে প্রকারান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত‍্যও বলা যেতে পারে, ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন‍্য আরো যেসব চ‍্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার বিষয় ওতপ্রোতভাবে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সাথে জড়িত সেসব হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের মানে যুক্তরাজ‍্য, জার্মানি, ফ্রান্স ন‍্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাঝে তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা, যা ট্রাম্প প্রশাসনের পুরো কালপর্ব জুড়ে তারা হারিয়ে ফেলেছিলো। নর্ড স্টিম টু গ‍্যাস পাইপলাইন তৈরি করার পরিণতিতে রাশিয়ার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে সুসম্পর্ক ইতোমধ‍্যে তৈরি হয়েছে তার বিপরীতে তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে সমর্থ হবে কিনা। কোয়াড মানে যে বিদেশ নীতির বদৌলতে প্রথমত চীনের সাথে অর্থনৈতিকভাবে পাল্লা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সংরক্ষণ সম্ভব হয় তাকে শক্তিশালী করতে পারবে কিনা। সিরিয়ার সাথে সুসম্পর্কের সূত্র ধরে ইরানসহ মধ‍্যপ্রাচ‍্যের অপরাপর দেশসমূহের উপর রাশিয়ার যে প্রভাব ও সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা মোকাবেলায় আমেরিকার করণীয় নির্ধারণ সম্ভব হবে কিনা। আর্কটিক মহাসাগরে অবস্থিত রুশ বিমানঘাঁটি স্থাপনজনিত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সমর্থ হবে কিনা। বর্তমান বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো ক্ষেত্রে বিরোধ চলমান তার কতগুলো মীমাংসা ও নিষ্ক্রিয় করতে সমর্থ হবে। জো বাইডেন ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ‍্যকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পূর্বেই জুনের ১১ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত জো বাইডেন কর্নওয়ালে জি-৭ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবে আর সেই সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক পুনস্থাপিত করে, আন্তঃআটলান্টিক দেশসমূহের সম্পর্ককে জোরালো করে এবং বহুপাক্ষিক অংশীদারদের সাথে শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক পুনস্থাপন করে নিজেদের স্বার্থকে সংরক্ষণ করতে সমর্থ হলে মার্কিন-রুশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়ে রাশিয়ার উপর আধিপত‍্য বিস্তারের চূড়ান্ত প্রয়াস গ্রহণ করবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সেই সম্ভাবনাকে বাতিল করে দিচ্ছে এই বিবেচনায় যে আমেরিকার এহেন দিবাস্বপ্ন দেখার দিন শেষ হয়ে গেছে। কারণ তার সকল মিত্ররাই বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির প্রতিনিধিত্ব করায় তারা নিজেরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন-রাশিয়ার মুখাপেক্ষী। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘তাস’-এর বরাত দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, ‘মার্কিন সাম্রাজ‍্যের শাসকরা ধারণা করছে যে তারা ভয় দেখিয়ে, আতংক ছড়িয়ে বা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন দেশ ও সম্প্রদায়ের আনুগত‍্য অর্জন করতে সমর্থ হবে এবং এভাবেই তাদের নিজেদের সকল সমস‍্যা সমাধান করে ফেলবে। কিন্তু তাদের স্তুপীকৃত সমস‍্যাগুলো যে পাহাড়সমান হয়ে গেছে যার সমাধান তাদের সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে গেছে। আর সেই অর্থে তারা বর্তমানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই ভুল করছে যার মানে হলো নিজস্ব ক্ষমতার চেয়েও বড় আওয়াজ দেওয়া যার পরিণতি ভালো হয় না।’

চায়না ফরেন অ্যাফেয়ার্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ‍্যাপক লি বলেন যে, আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেশটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় ব‍্যর্থ হচ্ছেন। যখন তারা উপলব্ধি করেন যে তারা দেশের অভ‍্যন্তরীণ সামাজিক বিভাজনকে কিছুতেই ঠেকাতে পারছেন না, তারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে মনোযোগ ফেরানোর উদ্দেশ‍্যে অন‍্য কোন দেশে সংকটের জন্ম দেয় অথবা কোন দেশকে মারাত্মক হুমকি প্রদান করে অথবা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও দুই দেশের মধ‍্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। তাও সম্ভব না হলে নিজ দেশের সংকটের দায় অন‍্য দেশের উপর চাপিয়ে দিয়ে দোষারোপের রাজনীতি শুরু করে। এরই সাথে সুর মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন একটি বৈরী পরিস্থিতিতে অভ‍্যন্তরীণভাবে নিপতিত যে তারা এখন উত্তেজনাকে দেশের বাইরে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর। তবে কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ‍্যে অবিরাম অন‍্যান‍্য দেশের উপর সংরক্ষণ ও হুমকি প্রদান করে চলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ওয়াশিংটনের আজ আর সেই শক্তি নেই, যা দিয়ে এককভাবে পৃথিবীর যেকোন দেশকে ভীতি প্রর্দশন করবে। তাই যখন জো বাইডেন ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ‍্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রসচিব অ্যান্টনি জে ব্লিঙ্কেন বলেন, ‘ক্রিমিয়ার সাথে রাশিয়ার যে অন‍্যায় আচরণ করেছে আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই’, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্পষ্ট জবাব, ‘এ ধরণের বাগাড়ম্বর আমরা ঢের শুনেছি।’

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, মহানগর মহিলা কলেজ, ঢাকা।

ই-মেইলঃ bipi1963@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.