ক্যাম্পাসে বামদের জয়, বিজেপি’র আগুন

একটা টিভি অনলাইন ডেস্ক:দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনের চারটি সেন্ট্রাল প্যানেল পদেই জয়ী হয়েছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলি। কলেজের নির্বাচন কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর একথা ঘোষণা করেছে। এর আগে ভোট গণনা সম্পন্ন হলেও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ফল ঘোষণা করা যায়নি। ইউনিয়নের সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) এর ঐশী ঘোষ। ঐশীর প্রাপ্ত ভোট ২,৩১৩। বিজেপি প্রভাবিত ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এভিবিপি) মণীশ জাঙ্গিদকে পরাজিত করেছেন ঐশী। ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডিএসএফ-এর সৈকত মুন। ৩,৩৬৫টি ভোট পেয়ে এভিবিপির-র শ্রুতি অগ্নিহোত্রীকে পরাজিত করেছেন সৈকত। ২,৫১৮টি ভোট পেয়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন এআইএসএ-এর সতীশ চন্দ্র যাদব। ৩,২৯৫টি ভোট পেয়ে জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এআইএসএ-এর মহম্মদ দানীশ। ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে প্রায় ৬৭.৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। ভোট দিয়েছে প্রায় ৫৭০০ ছাত্র-ছাত্রী।

এদিকে বিজেপি নেতা, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র প্ররোচনায় ১৯ সেপ্টেম্বর বিকাল থেকে উত্তেজনা ছড়ায় পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সুযোগে বাইরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর করে আগুন জ্বালায় বিজেপি, আরএসএস’র লাঠিয়াল বাহিনী। আর এই ঘটনায় পুরোপুরি চুপ রয়েছে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূল কংগ্রেস।

এই ঘটনায় এসএফআই রাজ্য কমিটির সভাপতি প্রতীক উর রহমান এবং সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের সংগঠন কখনই এই দেশের কোনও ক্যাম্পাসে কারোর প্রবেশাধিকার নিয়ে হস্তক্ষেপ করাকে সমর্থন করে না। তা আগেও সোচ্চারে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু, আজ কেন্দ্রের এক প্রতিমন্ত্রী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেভাবে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্ররোচনা এবং উসকানি ছড়ান তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন। ওই মন্ত্রীর প্ররোচনাতেই বহিরাগত দুষ্কৃতীরা তাণ্ডব চালায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ভাঙচুর করা হয় আর্টস ফ্যাকাল্টির ইউনিয়ন রুম। কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক শক্তি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে না। ক্যাম্পাসে ওই ফ্যাসিবাদী শক্তির সন্ত্রাস ছড়ানোর এই ঘটনাকে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে আমাদের সংগঠন। একইসাথে এই ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিচ্ছে এসএফআই।’ এসএফআই’র পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরএসএস’র ছাত্র সংগঠন এবিভিপি বাবুল সুপ্রিয়কে একটি অনুষ্ঠানে অতিথি করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি’র কোনও সংগঠন নেই। গুটিকয় কর্মী আছে। তাদের ডাকা নবীনবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান বাবুল। তার সঙ্গে সহঅতিথি ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ক্যাম্পাসে উপস্থিত হতেই তাদের ঘিরে ধরে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী বিক্ষোভ দেখান। তাদের হাতে কালো পতাকা ছিল। মুহূর্তে মিডিয়া পৌঁছে যায়। অবস্থা বুঝে বাবুল সুপ্রিয় প্ররোচনা তৈরি করেন বলে দাবি ছাত্রদের।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ‘ঠেলাঠেলিতে মন্ত্রীর গায়ে কয়েকজন পড়ে যান। কিন্তু তাঁকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়নি। ঠেলাঠেলিতে আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রীও জখম হয়েছে। উনি চাইলেই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যেতে পারতেন। তিনি তা না করে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন।’ বিক্ষোভকারীদের আরও অভিযোগ, ‘ধাক্কাধাক্কি করতে করতেই বাবুল সুপ্রিয় ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন।’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ক্যাম্পাস থেকে বের করার তেমন প্রয়াস দেখা যায়নি তার দেহরক্ষীদের পক্ষ থেকে। তবু মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে কিল, চড়, ঘুষি মারা হয়েছে। মাটিতে পড়েও যান বলে অভিযোগ করেছেন। মন্ত্রীর এই অভিযোগ মানতে চাননি বিক্ষোভকারীরা। এই ঘটনার রেশ ধরে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসের মধ্যে তৈরি হয় নৈরাজ্য ও বিশৃংঙ্খলা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আটকে পড়েছিলেন।

ছাত্ররা দাবি করছে বাবুল সুপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরনোর কোনও চেষ্টা করেননি। বিক্ষোভকারীরা তাঁকে ঘিরে থাকেন ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে বাবুল সুপ্রিয় বেরোতে পারছেন না দেখে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আরও কিছু পুলিশকে সেখানে পাঠানো হয়। পরিস্থিতি বুঝে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস। তিনি ছাত্রছাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। মন্ত্রীকে নিজের অফিসে নিয়ে যান উপাচার্য। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তি কারণ জানতে রাজ্যপাল জগদীশ ধানখড় ফোন করেন উপাচার্যকে। তিনি উপাচার্যকে নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধার করার জন্য যা করার হয় করুন। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যে পুলিশ ডাকার পরামর্শও উপাচার্যকে দেন রাজ্যপাল। একই পরামর্শ বাবুল সুপ্রিয়ও করেন উপাচার্যকে। উপাচার্য জানিয়ে দেন, ‘পদত্যাগ করতে রাজি আছি, কিন্তু কোনওভাবে ক্যাম্পাসের মধ্যে পুলিশ ডাকবো না।’ সন্ধ্যের পর উপাচার্য অসুস্থবোধ করায় তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এরপর ক্যাম্পাসে মধ্যে রাজ্যপাল আসেন। প্রথমে তাঁর গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। তখন সেই গেটের সামনে এবিভিপি’র সমর্থকরা প্রচ-ভাবে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। রাজ্যপালের গাড়ি তিন নম্বর গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। রাজ্যপালের গাড়ি ক্যাম্পাসে ঢুকতেই ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। কিছুক্ষণের জন্য রাজ্যপাল গাড়ি থেকে নামেন। পুলিশের পরামর্শে ফের গাড়িতে গিয়ে বসেন রাজ্যপাল। বাবুল সুপ্রিয়ও রাজ্যপালের গাড়িতে গিয়ে বসে থাকেন। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ নিরাপদে রাজ্যপালের গাড়ি ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্যপাল ক্যাম্পাসে থাকাকালীনই এবিভিপি’র সমর্থকরা তাণ্ডব চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের সামনে আর্টস ফ্যাকাল্টির ইউনিয়ন রুম ভাঙচুর করে তারা। ইউনিয়ন রুমের ভেতরে থাকা কম্পিউটার, বেঞ্চি, টেবিল ভাঙা হয়। ইউনিয়ন রুমের সামনে থাকা বেশ কয়েকটি সাইকেল ভাঙা হয়। চার নম্বর গেটের সামনে আগুন জ্বালিয়ে, লাঠি উচিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে মত্ত হয়ে উঠে এবিভিপি’র সমর্থকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, বিধানসভায় বামফ্রন্টের নেতা ড. সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘বাবুল সুপ্রিয় প্ররোচনা দিয়েছেন। কিছু ছাত্রছাত্রী তাতে প্ররোচিত হয়েছেন।’ বাইরের লোক যারা ভাঙচুর করেছে ঢুকে, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন চক্রবর্তী। তিনি বলেছেন, মানুষ এই ধরনের হিংসা, প্রতিষ্ঠানে হামলা মেনে নেবেন না। চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘প্রতিবাদ থাকলে তা হতেই পারে। আন্দোলনের অনেক ফর্ম আছে। কিন্তু জবরদস্তি বাধা দিলে যাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে তাকেই সাহায্য করা হয়। বাবুল সুপ্রিয় এদিনের ঘটনায় প্ররোচনার ফাঁদ পেতে হাইলাইটেড হতে চেয়েছেন।’ এদিন ওয়েবকুটার সম্পাদক কেশব ভট্টাচার্য, জুটার সম্পাদক পার্থ রায় এবং কুটার সম্পাদক পার্থিব বসু যৌথ প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের দ্বারা সংগঠিত আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ এবং হিংসার ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসগুলিকে এই ধরনের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জনসাধারণকে সজাগ থাকতে আহ্বান জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.