কোভিডের চিকিৎসা নিয়ে কোনোরকম ব্যবসা চলবে না

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি, মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি, বামপন্থি ও বিপ্লবীদের করণীয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে সাপ্তাহিক একতায় প্রকাশিত বাসদ (মার্কসবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী-এর সাক্ষাৎকার একতা লাইভ টিভির অনলাইন পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

একতা: মহামারী আকারে বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো করোনাভাইরাসের উৎপত্তির কারণ কি সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক? নাকি এর পেছনে ‘মনুষ্য সৃষ্ট’ কারণও আছে? থাকলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কী কী কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন?

কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী: এই নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের গঠন পর্যবেক্ষণ করে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি গবেষণাগারে সৃষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এমনকি হোয়াইট হাউজ টাস্ক ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ-এর পরিচালক ডা. অ্যান্থনি ফাউচি বলেছেন, করোনাভাইরাস চীনের ল্যাবরেটরি থেকে ছড়িয়েছে- এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তার মানে এই নয় যে, চীন জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা করছে না বা মহামারী সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই। ভাইরাসের উৎপত্তি আর মহামারীর উৎপত্তি এক ব্যাপার নয়। এই নতুন করোনা ভাইরাসের উহানে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া এবং উহান থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্যানডেমিক হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের দায় আছে।

ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলেই এটি বোঝা যাবে। ৩০ ডিসেম্বর উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. লি ওয়েনলিয়ান প্রথম এই ভাইরাস সম্পর্কে তাঁর সহকর্মীদের সতর্ক করেন। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সাতটি ঘটনা লক্ষ্য করে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, সেটি অনেকটা সার্সের মতো। এই সার্স করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ২০০৩ সালে বিশ্বব্যাপী মহামারী তৈরি হয়েছিল। অথচ ডা. লি-কে চীনের জননিরাপত্তা ব্যুরো ডেকে নিয়ে সতর্ক করে ও তিনি মিথ্যে কথা বলেছেন বলে স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করায়। মাত্র ৩৪ বছর বয়সের এই চিকিৎসক পরবর্তীতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ডা. লি’র কথাটা গ্রাহ্যই করা হল না, নতুন ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্বকে পর্যাপ্ত তথ্যও চীন সরবরাহ করলো অনেক দেরিতে। এর কারণ কী? বুঝতে হবে, চীন এখন আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। এটি কমিউনিস্ট লেবেল লাগিয়ে চলা একটি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। উহান চীনের একটা বিরাট ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব। বহুদেশের সাথে উহানের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক। চীনের পুঁজিপতিদের স্বার্থে সংক্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কিত তথ্য যেমন গোপন করা হল, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে উহানের যোগাযোগও বহাল রাখা হল। ফলে সংক্রমণ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল।

সকল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশ একই কাজ করেছে। আমেরিকাও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সরকার ব্যবসার জন্য আন্তর্জাতিক বিমান বন্ধ করেনি। বিশ্বে সংক্রমণ খুবই শঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার পরও আমাদের দেশে কাদের স্বার্থে এই আন্তর্জাতিক বিমান সচল রাখা হয়েছিল তা আমাদের কারও অজানা নয়।

আবার ভাইরাসের সংক্রমণটা আকস্মিক হলেও এই সংক্রমণ ঠেকানোটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল না। সংক্রমণ হওয়ার পরে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে প্রায় সকল পুঁজিবাদী দেশের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বলে কোনো ব্যাপারই তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নেই। পুঁজিবাদী দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখে ব্যক্তিস্বাস্থ্য। রক্ষা করে সেই ব্যক্তিকে, যার টাকা আছে। ফলে সকলে মিলে বাঁচার ব্যাপার সেখানে নেই। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারাই বাঁচবে– এটাই পুঁজিবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য। তাই ভাইরাসের উৎপত্তি প্রাকৃতিক হলেও মহামারীর উৎপত্তি মানুষ সৃষ্ট, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাসৃষ্ট। প্রথমে তথ্য গোপন করে, তারপর ব্যবসার জন্য তাৎক্ষণিক লকডাউন না করে এবং ছড়িয়ে পড়ার পর মুনাফাভিত্তিক এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার কারণে আজ সারাবিশ্বের মানুষ ভুগছে। এই পরিস্থিতি অবধারিত ছিল না।

আর একটা বিষয় আপনাদের খেয়াল করতে বলব। যখন বিশ্বে পরস্পরবিরোধী দুটি সামাজিক ব্যবস্থা ছিল, তখন সমাজতান্ত্রিক শিবির মানুষের স্বাস্থ্যকে যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে দেখত, তার চাপে পুঁজিবাদী দেশগুলোও তাদের জনগণকে কিছুটা স্বাস্থ্যের অধিকার দিতে বাধ্য হয়েছিল। আজ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতিতে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় স্বাস্থ্যখাতের উদ্দেশ্য হলো শুধু মুনাফা অর্জন; মানুষের স্বাস্থ্য, মানুষের ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবন– এগুলো নিয়ে তাদের কোনো এতটুকু মাথাব্যথা নেই। এখনও বিভিন্ন দেশে যতটুকু মাত্রায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে, বা সেইসময়ে গড়ে উঠা একটা ভিত্তি আছে- সেসব দেশই একে কিছুটা সফলভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছে। কিউবার কথা সবাই জানেন। একটা ছোট দেশ কিভাবে পাবলিক হেলথের আইকন হয়ে গেল। অথচ এই দেশের ডাক্তারদের অনেক বড় বড় দেশ গ্রাহ্যই করতো না।

একতা : প্রাণঘাতী এ ভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বের ও আমাদের দেশের প্রস্তুতি কেমন ছিল? আমাদের দেশে সরকারি কোন কোন অব্যবস্থাপনাকে আপনার ক্ষমার অযোগ্য মনে হয়েছে?

মুবিনুল হায়দার: এক কথায় বলতে গেলে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। সেটা আমরা বলছি তা নয়, সরকারবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন তা নয়, সরকারি দলের চিকিৎসকদের সংগঠনের সভাপতি, মহাসচিবরা বলছেন। ব্যাপারটা এতটাই নগ্ন হয়ে গেছে। আমাদের দেশের সরকার পয়েন্ট অব এন্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, দুইমাসেরও বেশি সময় পেয়ে মুজিব শতবর্ষের প্রস্তুতি নিয়ে মগ্ন থাকলেন। কমিউনিটিতে কোনো একটিভ কেস চলে গেলে কিভাবে স্ক্রিনিং হবে, স্বাস্থ্যকর্মীদের কিভাবে শিক্ষিত করতে হবে, শর্ট টার্ম ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে কিভাবে ফিল্ড লেভেলের হেলথ ওয়ার্কার তৈরি করতে হবে, কিভাবে প্রচারের টিম করে গ্রামে গ্রামে মানুষকে এ রোগের ব্যাপারে শিক্ষিত করে তুলতে হবে-এসব কী সরকারের বিশেষজ্ঞরা জানতেন না? অবশ্যই জানতেন। এসব পড়েই তো তারা বড় বড় ডিগ্রি নিয়েছেন। কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ আমরা দেখলাম না। তারপর অসুস্থ হলে কিভাবে হাসপাতালে যাবে, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কী হবে– সেটারও কোনো গাইডলাইন ছিলনা। অনেক কথা এ ব্যাপারে বলা যাবে, এত দীর্ঘ করার সুযোগ নেই। তবে তিনটা বিষয় ক্ষমার অযোগ্য বলে আমাদের মনে হয়।

এক. লক ডাউন ঘোষণা করতেই হবে এবং একইসাথে যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের খাবার দিতে হবে-এটা প্রাথমিক ব্যাপার। এ দায়িত্ব সরকার নেননি, তারা নিয়েছেন শিল্প মালিকদের দায়িত্ব। আমাদের দেশে সবার আগে সরকারি ত্রাণ পেয়েছেন কোটিপতি গার্মেন্টস মালিকরা। মালিকরা প্রথমে কারখানা বন্ধ করেননি, পরে করেছেন, তারপরে এগুলোকে লে অফ ঘোষণার জন্য আবেদন করেছেন, শ্রমিকদের ঢাকায় ডেকে এনেছেন, আসার পর ফেরত পাঠিয়েছেন। এখন আবার লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টস কর্মীদের কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে কারখানা খুলে দিয়েছেন। সংক্রমণ এখন বাড়ছে, অথচ সরকার লকডাউন তুলে দেয়ার কথা বলছেন। সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। যাও দু’একটা পরিকল্পনা করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে কোনো সমন্বয় নেই। পুরো লকডাউনকেই তারা একটা ছেলেখেলা বানিয়ে ছেড়েছেন। এগুলো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

দুই. স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পিপিই’র ব্যবস্থা না করে তাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। পিপিই ও মাস্ক নিয়ে দুর্নীতি করেছেন। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা, খাওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা কোনোকিছুরই বন্দোবস্ত করেননি। ফলাফলে একটা বিরাট অংশের স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন ও হচ্ছেন, চিকিৎসার অভাবে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এটা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।

তিন. পর্যাপ্ত টেস্ট করানো হচ্ছে না। র্যা পিড কিট সারাবিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ সরকার গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে যে টালবাহানা করলেন তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আবার ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হওয়ার পরও স্যাম্পল কালেকশনের জায়গা খুবই কম। এসব জায়গায় গিয়ে অসুস্থ মানুষ ভোর রাত থেকে লাইন দিচ্ছেন। পরীক্ষার সংখ্যা, কালেকশন বুথ, র্যা পিড টেস্ট – এ নিয়ে সরকার যা করলেন তা অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত নিদর্শন।

অর্থাৎ লকডাউন, টেস্ট ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা- গুরুত্বপূর্ণ এই তিন ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দায়িত্বহীন ও ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার।

একতা: এমন সংকটকালে বামপন্থি ও বিপ্লবীদের করণীয় কী? সরকারের অযোগ্যতার সমালোচনা করার পাশাপাশি তাদের আরও কিছু করার আছে কি? সেসব কতোটা আপনারা করছেন?

মুবিনুল হায়দার : এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বামপন্থি এবং বিপ্লবী শক্তিই হলো সমাজের সবচেয়ে প্রগতিশীল শক্তি। আমি মনে করি, বামপন্থিরা সম্মিলিতভাবে বা কোথাও কোথাও দলীয় উদ্যোগে জনগণের মধ্যে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছে। আমরাও আমাদের বিভিন্ন গণসংঠনের সাহায্যে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছি। ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম ইত্যাদি করছি। আম্পান ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছি। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করা এবং সে লক্ষ্যে প্রচার ও সংগঠিত করা যেমন দরকার, তেমনি সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের শক্তিতে জনগণকে যতটুকু সহযোগিতা সম্ভব, সেটা দেয়ার চেষ্টাও আমরা করেছি।

একতা: মহামারী মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া যেত কি? তা হলে কী কী সুবিধা হতো, কী কী অসুবিধা ও ঝক্কি এড়ানো যেত?

মুবিনুল হায়দার: আমরা মনে করি, জাতীয় পর্যায়ে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি এবং সমাজের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী-চিকিৎসক-বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের সচেতনমহলকে সাথে নিয়ে তদারকি করা যেত। ডাক্তার-নার্সদের নিরাপত্তা প্রদান, হাসপাতালে সুচিকিৎসা মনিটরিং, প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম সরবরাহসহ সমস্ত বিষয়ে তারা দেখভাল করতে পারতেন। তাহলে একটা পরিচ্ছন্নতাও থাকতো, ত্রুটিগুলোও চোখে পড়তো। কিন্তু সরকার সেভাবে কাজ করছে না, করার কথাও নয়। এটাতে তাকে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী অবস্থান থাকলে তবেই সেটা সম্ভব হতো। কারণ আমাদের দেশে বর্তমানে অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট সরকার নিজেদের খেয়ালখুশি মতো দেশ চালাচ্ছে, মানুষের কোনোরকমের মতামতের সুযোগ এদেশে নেই। এটা একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।

যদিও কিছু বামপন্থি দল মনে করতেন যে, সরকারের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে ভালো হবে। তাদেরকে একসাথে কাজ করার জন্য আহবান করা দরকার। কিন্তু তা যে ভ্রান্ত ধারণা, এখন সরকারের কার্যকলাপে সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এই ডাকে সরকার কোনো সাড়া দেয়নি।

একতা: বৈশ্বিক এ মহামারীর পর, বাস্তব সম্ভাবনার বিবেচনায়, সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দরিদ্র ও শ্রমজীবীদের স্বার্থে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে কি কি নীতি-কাঠামোগত পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

মুবিনুল হায়দার: আমরা মনে করি, দেশের এই পরিস্থিতি সামলানোর সমস্তরকমের দায়িত্ব সরকারের। অসহায়, নিম্নবিত্ত-শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য, চিকিৎসাসহ সকল সংকটের বিরুদ্ধে সরকারের তরফ থেকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্ম হারানো শ্রমজীবী মানুষ এবং বেকারদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাপকভিত্তিক খাদ্য ও নগদ সহায়তা ও সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হবে। কোভিডের চিকিৎসা নিয়ে কোনোরকম ব্যবসা চলবে না। কোভিড চিকিৎসা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদী নীতিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিদ্যমান কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (SAP)–এর আওতায় উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো বন্ধ হয়েছে, সংকুচিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিসেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। বিএডিসি, টিসিবিসহ রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। পর্যাপ্ত খাদ্য গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করে ফসলের সরকারি ক্রয় বাড়ানোর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। খাদ্যশস্যের বিপনণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। ক্ষেতমজুরদের সারাবছর কাজ দেবার জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাম-শহরের গরিব মানুষদের জন্য সুলভমূল্যে রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে অর্থবছরের বার্ষিক বাজেটের আর্থিক নীতিকে গণমুখী করতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো সরকারকে নিতে হবে।

সামনের দিনে দেশে একটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকার সেই পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধকে আরও বাড়াতে চাইবে। কারণ সংকটপূর্ণ মুহূর্তে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। আর ঐক্যবদ্ধ হলে তাদের দাবিটা শুধু দাবি থাকবে না, একটা আন্দোলনে পরিণত হবে। এই আন্দোলন খুবই জঙ্গি হতে বাধ্য, কারণ মানুষের পেছনে ফেরার কোন রাস্তা তখন থাকে না। হয় দাবি আদায়, না হয় অনাহারে মৃত্যু- মানুষের সামনে এই দুই রাস্তাই তখন খোলা থাকে। ফলে সরকার তখন সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, পেশাগত-ইত্যাদি নানাধরনের বিভেদ বাড়িয়ে তুলবে।

এমতাবস্থায় দেশের প্রগতিশীল শক্তির দায়িত্ব এসকল ব্যাপারে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলা। তাদেরকে এই চক্রান্তগুলো বোঝানো, ঐক্যবদ্ধ রাখা। লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকা। একইসাথে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনকে জোরদার করা।