কোভিডকালে বাল্যবিবাহের হিড়িক: আর্থিক অসচ্ছলতাই কী প্রধান কারণ?

নিজামুল হক বিপুল 

কোভিড-১৯ যে কত রকমের জটিলতা নিয়ে এসেছে এই ধরিত্রীর মানবজাতির জন্য সেটা বলে শেষ করা যাবে না। যারা একবার কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন শুধু তারাই বলতে পারেন এই ব্যাধির যন্ত্রণা কতটা অসহ্য।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ অদৃশ্য আরও অনেক সমস্যা এবং সংকট নিয়ে এসেছে। এসব সংকটের একটা বড় দিক হচ্ছে অভাব-অনটন আর আর্থিক অসচ্ছলতা। যার প্রভাব পড়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। এটি সমাজে আরও বড় ব্যাধির তৈরি করেছে। আর এই ব্যাধির নাম হচ্ছে ‘বাল্যবিবাহ’। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদগুলোতে এই সংকট সবচেয়ে বেশি। কোভিডকালীন সময়ে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এই যে বাল্যবিবাহের মত একটা সংকট কোভিডের কারণে বিস্তৃত হল সেটি প্রকাশ পেল প্রায় দেড় বছর পর, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হল।

আমাদের দেশে আগেও বাল্যবিবাহ ছিল, এখনও আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছিল। মানুষের সচেতনতার কারণে এটি কমেছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ এর প্রভাবে গত দেড় বছরে দেশের গ্রামীণ জনপদ বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বাল্যবিবাহ এতোটাই বেড়েছে যে, শুধুমাত্র গত ১৮ মাসে সাত হাজার ৬৭৭টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। এই যে, এতোগুলো কিশোরীর বিয়ে হয়ে গেল অসময়ে এটা একটা উদ্বেগের কারণ।

যে কিশোরীর এই বয়সে বিদ্যালয়ে যাবার কথা, সহপাঠিদের সঙ্গে নেচে গেয়ে বিদ্যালয়ের মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর কথা, চুলে বেণী বেঁধে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই কিশোরী কি না বিয়ের পিঁড়িতে বসছে অসময়ে। যার কি না ‘বিয়ে’ শব্দের সঙ্গে এখনও পরিচয়ই হয়নি। সংসার কি বুঝে উঠার আগেই তাকে বেনারসী পরে যেতে হচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। সেখানে গিয়ে পড়তে হচ্ছে নানামুখি যন্ত্রণায়। পরিণাম হিসেবে অল্প বয়সেই সে কিশোরী পরিণত হচ্ছে বুড়িতে।

দেশে বছরে কী পরিমাণ বাল্যবিবাহ হয় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে। তবে প্রতি বছরই গ্রামীণ জনপদের আনাচেকানাচে অভাবি ও দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের কিশোরী কন্যাকে সংসারের বড় যন্ত্রণা মনে করে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেয় বা দিচ্ছে। এসবের কোনো কোনো খবর কখনও সংবাদমাধ্যমে আসে আবার কখনও থেকে যায় অন্তরালে।

আমার যতদূর মনে পড়ে, ২০০৮ সালের দিকে একবার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে ফিল্ড ভিজিটে গিয়েছিলাম লালমনিরহাটে তিস্তার পাড়ে। এক শীতের সকালে আমরা লালমনিরহাট শহর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম কালিগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। আদিতমারীর মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবরধন চর নামের এক গ্রামে গিয়েছিলাম। দই খাওয়া মোড় বাজারে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। কউে আবার ভাববেন না যে, দই খাওয়া মোড়ে প্রচুর দই পাওয়া যায়। ধু ধু বালুচর। মাইলের পর মাইল হেঁটে ক্ষীণকায় তিস্তা পাড়ি দিয়ে যখন গোবরধন চর গ্রামে পৌঁছলাম তখন ছোট ছোট অনেক ঘর দেখতে পেলাম। এসব ঘরে একেকটি দরিদ্র পরিবারের বসবাস। পরিবারগুলোর কাছাকাছি যখন পৌঁছলাম তখন একেবারেই ভরকে গেলাম। দেখলাম ১১/১২ বছরের একেকটা কিশোরী বধূতে পরিণত হয়েছে। জীর্ণশীর্ণ একেকটা শরীর। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ। তাদের কারও কারও কোল জুড়ে আবার আরেকটা শিশু। এদের কেউ কেউ আবার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে চলে এসেছে নানামুখি নির্যাতনের কারণে। কিশোরীদের এমন দৃশ্য দেখে ভীষণ মায়া হচ্ছিল। কষ্টও পেয়েছিলাম। বিয়ে, সংসার, মাতৃত্ব- এসব কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের কি পরণতি হয়ে গেল। সত্যিই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।

পরিবারগুলোর অভিভাবকদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অভাব-অনটনের কারণে তারা কিশোরী বয়সেই সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দেন। এছাড়া মেয়েদের বয়স ১৫ পার হয়ে গেলে বিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। ১৫ বছরের পর তিস্তার চরগুলোতে মেয়েরা আইবুড়ি হিসেবে গণ্য হয়। তাই বাধ্য হয়েই পরিবারগুলো কিশোরীদের বিয়ের পিঁড়িতে বসায় এবং স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দেয়।

২০০৮ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে তিস্তার চরে বাল্যবিবাহের যে চিত্র দেখে এসেছিলাম সেটি এখনও সেই চরাঞ্চলে বিদ্যমান কি না জানি না। তবে সামগ্রিকভাবে দেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা কিছুটা কম বলে ধারণা করা যায়। কারণ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের দিক থেকে চেষ্টা দেখা যায় সচেতনতা তৈরির। কিন্তু এবার কোভিড-১৯ এসে রীতিমত একটা বড় ধাক্কা দিয়ে গেল। এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, গত ১৮ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযার্য়ি এই সময়ে শুধুমাত্র দেশের নয়টি জেলার ৭৬টি উপজেলায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে সাত হাজার ৬৭৭টি।

কোভিড-১৯ মহামারিকালীন বাল্যবিবাহের প্রবণতা কেন অস্বাভাবিক বেড়ে গেল- এ মুহূর্তে সেটি এক বড় প্রশ্ন। কোভিডের জন্য প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকা শিক্ষপ্রতিষ্ঠানগুলো না খুললে বাল্যবিবাহের এই ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে মোটেই জানা যেতো না। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও কিছুদিন বন্ধ থাকলে এ চিত্র যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো সেটাও অনুমান করা কঠিন।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে দেশের নয়টি জেলা খুলনা, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, চাপাইনবাবগঞ্জ, বরগুনা ও জামালপুরে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এই নয় জেলার ৭৬টি উপজেলার গ্রামগুলোতে বাবা-মায়েরা কিশোরী কন্যাদের নানা কারণে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এটা সত্যিই উদ্বেগের খবর।

কোভিড-১৯ এর কারণে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা যখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল না তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি খোঁজ নেওয়ার পরই জানা যায় যে, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে গেছে। আর বিয়ের কারণ হিসেবে আর্থিক অসচ্ছলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন পরিবারের সদস্যরা।

মাত্র দেড় বছরের বাল্যবিবাহ অস্বাবাবিক বেড়ে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে সরকারের যে কর্মকর্তারা কাজ করেন তাদের কর্মকাণ্ড, কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক। এই ১৮ মাস সময়ে কোথায় ছিলেন তারা? মাঠপর্যায়ে তাদের যে সোর্সগুলো রয়েছে তারা কি কোন রকম তথ্য সংশ্লিষ্টদের জানায়নি? এই দুটি প্রশ্ন এখন বড় করে সামনে চলে এসেছে। যদিও এই কর্মকর্তারাই এখন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়ায়। তাদের এই উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয়টি সত্যিই হাস্যকর! কারণ যাদের পাহারা দেওয়ার কথা, বাল্যবিবাহ নিয়ে মানুষকে সচেতন করার কথা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার কথা, তারা কি না ১৮ মাস ঘুমিয়ে ছিলেন। আর এখন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন!

স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছর বয়সি মেয়েদের বিয়ে শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা আপাতত বাক্সবন্দি করে রাখতে হবে, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ আর তিন মাস বাকি ২০২১ সাল শেষ হতে। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী (মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯-এমআইসিএস) দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, সাত বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে গার্ল সামিটে বাল্যবিবাহ নির্মূলে ১৫ ও ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহ কমানোর লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.