কেন মার্কস পড়বো?

এম. এম. আকাশ

[গত সংখ্যার পর]

আমরা যেমন Physics পড়ি পদার্থ সম্পর্কে ক্রমবিকাশমান জ্ঞানকে গভীর থেকে গভীরতরভাবে জানার জন্য, সেজন্য যেমন আমরা নিউনটকেও পড়ি, আইনস্টাইনকেও পড়ি, কোয়ান্টম মোকনিক্সও পড়ি তেমনি মার্কস প্রণীত বিজ্ঞানকে ক্রমবিকাশমান জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে Thesis-Antithesis-Synthesis এই পদ্ধতিতে আমাদের পাঠ করতে হবে।

মার্কসের একটি বিখ্যাত বক্তব্য হচ্ছে “এ যাবৎ দার্শনিকেরা শুধু পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে গেছে, আসল বিষয় হচ্ছে পৃথিবীকে বদলে দেয়া।”(দেখুন Thesis on Feurbach-এর শেষ ১১ নম্বর থিসিসটি!) এই দিক থেকে দেখলে মার্কসের লেখাগুলি পড়া উচিৎ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানব-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়কে সঠিকভাবে শুধু ব্যাখ্যার জন্য নয়, ব্যাখ্যাগুলিকে কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণের জন্য মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করার জন্যও বটে। যদি দেখা যায় অনুশীলনমূলক যাচাই মাকর্সের সূত্রকে ভ্রান্ত বা অকল্যাণকর প্রমাণিত করেছে, তাহলে মার্কসের পরামর্শটি হবে মার্কসকে ত্যাগ করা।

যতটুকু অংশ ভুল বা সেকেলে হয়ে গেছে ততটুকু বাদ দিয়ে নতুন তত্ত্বের সৃজনশীল বিকাশের মাধ্যমে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে গেলেই মার্কস ঠিক মত পাঠ করা সম্ভব হবে। আমরাও তখন দাবি করতে পারবো মার্কসকে আমরা মার্কসের পন্থাতেই পাঠ করেছি। এই প্রসঙ্গে দুটি ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরতে চাই। ১৮৮৩ সালে কার্ল মার্কস যখন জীবিত ছিলেন তখন মার্কসের ভক্তরা তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অর্থনৈতিক কার্যাকরণকে হেগেলের “চরম ধারণার”(Absolute Idea) মত “চরম”ভেবে যত্রতত্র তার ভুল প্রয়োগ শুরু করেন। আনাড়িদের হাতে পড়ে তাঁর তত্ত্বের এই দুদর্শা দেখে তখন মার্কস নিজেই বলেছিলেন,

“What is certain is that, I myself am not a Marxist”.

[দেখুন Engel’s letter to Conrad Schmidt (1890),Marx-Engels Selected Correspondence, Progress Publishers, Moscow. P-393]

দ্বিতীয় তথ্যটি বিখ্যাত সৃজনশীল মার্কসীয় তাত্ত্বিক আন্তোনীয় গ্রামসীর একটি প্রবন্ধ থেকে নেয়া। গ্রামসী যখন দেখলেন ইউরোপের সবচেয়ে উন্নত দেশে বিপ্লব না হয়ে বিপ্লব শুরু হলো রাশিয়ার মত একটি মাঝারি ও অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশে তখন তিনি লিখলেন পুঁজি গ্রন্থে পুঁজিবাদের উত্থান-বিকাশ-পতনের যে “স্বাভাবিক ঐতিহাসিক” (Natural-Historical) নিয়মের বিবরণ আছে তাকে লঙ্ঘন করেই রাশিয়াতে বিপ্লব হয়েছে। সুতরাং অক্টোবর বিপ্লবকে “Anti Capital” বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করে তিনি মার্কসবাদের সারমর্মকে অক্ষুণ্ন রেখে নতুন ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা করলেন। দাবি করলেন লেনিনের নতুন রণকৌশলই নতুন পরিস্থিতিতে মার্কসের বক্তব্যেও ভিন্ন, কিন্তু সারমর্মের দিক থেকে সঠিক প্রয়োগ।

লেনিনের মার্কস পাঠের পদ্ধতি

লেনিন নিজে মার্কস পাঠ করেছিলেন গভীর অভিনিবেশসহ, দ্বান্দ্বিক ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে। তাঁর মার্কস পাঠের পদ্ধতি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী নাদেজদা স্ক্রুপস্কায়া “শিক্ষা-দীক্ষা”গ্রন্থে লিখেছিলেন,

“মার্কস পড়ার সময় তিনি (লেনিন) অগণিত অংশ উদ্ধৃত করে রাখতেন। মার্কসের রচনা থেকে উদ্ধৃত অংশে ভরা বহু খাতা ‘লেনিন ইনষ্টিটিউটে’ আছে। ভ্লাদিমির ইলিচ এগুলি তাঁর লেখায় ব্যবহার করতেন, ফিরে ফিরে পড়তেন, টীকা লিখতেন।”(নাদেজদা স্ক্রুপস্কায়া, শিক্ষা-দীক্ষা, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, পৃ: ৫৮)

ক্রুপস্কায়া আরো লিখেছেন, মার্কসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাঠক লেনিন ১৯২০ সালে কমসমলের (বলশেভিকদের কিশোর সংগঠন) তৃতীয় নিখিল রুশ কংগ্রেসে বলেন,

“আমাদের প্রয়োজন মানবিক জ্ঞানের সারাংশ আয়ত্ত করতে পারা এবং এমনভাবে আয়ত্ত করা যাতে কমিউনিজম মুখস্ত করা একটা ব্যাপার হয়ে না থেকে, হয় এমন একটা বস্তু যা আপনারাই নিজে ভেবে বার করেছেন, তার মধ্যে অঙ্গীকৃত হবে এমন সব সিদ্ধান্ত যা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অনিবার্য।”(শিক্ষা-দীক্ষা,প্রগতি,পৃ: ৫৯)

ক্রুপস্কায়া আরো লিখেছেন, লেনিনের একটি প্রিয় বাক্য ছিল “আসুন মার্কসের সঙ্গে পরামর্শ করা যাক।”সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় লেনিন গভীর মনোযোগ দিয়ে, সৃজনশীল সমালোচকের দৃষ্টিতে মার্কস পাঠ করেছিলেন। তার এই পাঠপদ্ধতি সম্পর্কে ক্রুপস্কায়ার আরেকটি শিক্ষণীয় উক্তি হচ্ছে,

“লেনিনের পদ্ধতি ছিল অনুরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে মার্কস যা লিখেছেন তা বেছে নিয়ে সযত্নে বিশ্লেষণ করে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার তুলনা দ্বারা উভয়কার মিল-গরমিলগুলি বের করে আনা। লেনিন তা কী করে করতেন তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হল ১৯০৫-১৯০৭ সালের বিপ্লব (রুশ দেশের প্রথম বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে–যেটি অসমাপ্ত অবস্থাতেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে takeover করেছিল।) (শিক্ষা-দীক্ষা,প্রগতি,পৃ: ৬৩)

মার্কসের থেকে কী পড়বো?

এতক্ষণ আমরা মার্কস পড়ার সঠিক পাঠ-পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছি। একটি প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই আসবে, তা হচ্ছে মার্কস প্রকাশিত–অপ্রকাশিত যে হাজার হাজার পৃষ্ঠার লিখিত পা-ুলিপি রেখে গিয়েছেন এগুলি সবই কি সমান প্রাসঙ্গিক বা সমান মূল্যবান? মার্কস এর চিন্তাকে বোঝার জন্য এগুলি সবই কি আমাদের পড়তে হবে? আধুনিক জীবনে এত সময় কি কারো আদৌ আছে? যারা মার্কস নিয়ে গবেষণা করতে চান বা চেয়েছেন তারা মার্কসের অপ্রকাশিত পা-ুলিপি ও নানা চিঠিপত্র নিয়ে আজো প্রবল উৎসাহে গবেষণা ও তত্ত্বচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ভারতের দেশ পত্রিকায় যেমন আজও রবীন্দ্রচর্চা রবীন্দ্র ভক্তরা কিছুদিন পরপরই অব্যাহত রেখেছেন অনেকটা সেরকম। কিন্তু সাধারণ পাঠকদের জন্য মার্কসের সবকিছু পড়ার দরকার নেই। তাদের জন্য দুটি বই অবশ্যই পড়ার সুপারিশ পণ্ডিতরা করে থাকেন। একটি হচ্ছে তাঁর “পুঁজি”গ্রন্থটি। অপরটি এর আগে লেখা “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”নামক ক্ষুদ্র একটি পুস্তিকা, যার সহ-লেখক ছিলেন এঙ্গেলস। এই দুটি বই সহজলভ্য এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। “পুঁজি”গ্রন্থটির চার খণ্ডে প্রণয়নের একটি মহাপরিকল্পনা ছিল মার্কসের। মহাপরিকল্পনার পর একমাত্র প্রথম খণ্ডটি মার্কস লিখে শেষ করে, প্রকাশ করে যেতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড এঙ্গেলস সম্পাদনা করে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ করেন। অনেকে মনে করেন- “Theories of Surplus Value” নামে মার্কসের যে আরো তিনটি খণ্ড বাজারে পাওয়া যায় সেগুলি ছিল আসলে সব মিলিয়ে পুঁজি গ্রন্থের অপ্রকাশিত চতুর্থ খণ্ড যা এঙ্গেলস সম্পাদনা করে যেতে পারেন নি। আজকাল অবশ্য “পুঁজি”গ্রন্থের নানা জনপ্রিয় ছোট সংস্করণ বা Short Version প্রকাশিত হয়েছে।

পুঁজি গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে এর ভূমিকায় মার্কস লিখেছিলেন যে এর উদ্দেশ্য হচ্ছে “পুঁজিবাদী সমাজের গতির নিয়মটি”উদ্ঘাটিত করা।”এবং তার এই উদ্ঘাটন পদ্ধতিটি ছিল দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতি। তিনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে বাজারে পণ্য ক্রয় বিক্রয় ব্যবস্থা থেকে, মুদ্রার উদ্ভব হয় এবং কিভাবে মুদ্রা পুঁজিতে পরিণত হয় এবং অবশেষে পুঁজি তার নিজের নিয়মেই বিকশিত হয়ে সংকটে পড়ে এবং অবশেষে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের মাধ্যমে অনিবার্যভাবে তার মৃত্যু ঘটে–পুঁজির এই সমগ্র ঐতিহাসিক জীবনবৃত্তান্তটি একটি প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক (Natural-Historical Law) নিয়ম হিসেবে সারা বিশ্ব থেকে আহরিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মার্কস। মার্কসের এই প্রকল্প ছিল তাই খুবই উচ্চাকাক্সক্ষী এক প্রকল্প। অনেকেই তাই মার্কসের এই কাজকে জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। মার্কস নিজেও প্রথমে পুঁজি গ্রন্থকে ডারউইনের নামে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন! এই গ্রন্থে মার্কস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পুঁজিবাদী সমাজের মৃত্যুবাণ পুঁজিবাদের ভেতরেই নিহিত আছে এবং কেউ চাক্ বা না চাক তার হাত থেকে পুঁজিবাদের কোনও রক্ষা নেই।

কিন্তু ‘পুঁজি’গ্রন্থ প্রকাশের প্রায় দেড়শত বছর পর আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি যে পুঁজিবাদের নানা সংকট সত্ত্বেও এখনো টিকে আছে। ফলে মার্কসের পুঁজি বইটি পড়তে হবে দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিতে অর্থাৎ পুঁজিবাদের কি ভাবে ধ্বংস হবে বলে মার্কস ভেবেছিলেন, তার কতটুকু হলো, কতটুকু হলো না, কেন হহলো না, ইত্যাদি খুঁজে বার করার জন্য পুঁজিবাদবিরোধী বিপ্লবী অবস্থান থেকে পড়বেন তারা যারা পুঁজিবাদের বৈষম্য-বেকারত্ব ও অন্যান্য নানা সংকটের জন্য পুঁজিবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে আগ্রহী এবং পুঁজিবাদের ধ্বংস চান। আর যারা বৈষম্যমূলক শ্রেণিবিভক্ত পুঁজিবাদের সংকটের সংস্কার করে তাকে মানবিক চেহারা দিতে চান ও তা সম্ভব বলে মনে করেন তারা পড়বেন মার্কস পুঁজিবাদের কাঠামোতে যে অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত করেছিলেন সেগুলি পুঁজিবাদের কাঠামো বজায় রেখেই কোনভাবে সমাধানের উপায় আছে কি না- তা খুঁজে দেখার জন্য। তাদের অবস্থান বিপ্লবী হবে না, হবে রক্ষণশীল। এই দুই ধরনের পাঠকই আজ “ক্যাপিটাল”পড়ছেন এবং পরস্পরের সঙ্গে আজো নানাভাবে তর্কযুদ্ধে (Discourse) অবতীর্ণ হচ্ছেন।

সুতরাং যারা মার্কসের বিরোধী ও পুঁজিবাদের পক্ষে এবং যারা মার্কসের পক্ষে ও পুঁজিবাদের বিরোধী উভয়ের জন্য মার্কসের “ক্যাপিটাল”একটি অন্যতম শিক্ষণীয় চিরায়ত গ্রন্থ। পুঁজিবাদ যেহেতু এখনো বিদ্যমান সেজন্য “পুঁজি”গ্রন্থও এখনো এই উভয় স্কুলের জন্য একটি অন্যতম পাঠ্যবই বটে।

অনেকের ধারণা “সমাজতন্ত্র”বোঝার জন্য মার্কসের লেখা পড়তে হবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত মার্কস রচিত ৬০ খণ্ড বইয়ের মধ্যে মাত্র একটি অতি ক্ষুদ্র ত্রিশ-চল্লিশ পৃষ্টার তন্বী পুস্তিকা আছে যার প্রত্যক্ষ বিষয়বস্তু হচ্ছে পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজতান্ত্রিক সমাজ। এই বইয়ে সমাজতন্ত্রকে আবার তিনি দুই স্তরে ভাগ করেছিলেন। প্রথম স্তরকে তিনি তার কিছুটা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে নাম দিয়েছিলেন “সমাজতন্ত্র”বা ”সাম্যবাদের নিম্নতর স্তর”(Lower Phase of Communism)। মার্কসের আদর্শ সমাজের নাম তাই সমাজতন্ত্র নয়, তার নাম সাম্যবাদ (Communism)। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ নিয়ে মার্কসের যে ছোট্ট একটি মাত্র সিরিয়াস লেখার কথা উপরে উল্লেখ করা হলো, তার নাম হচ্ছে,

“গোথা কর্মসূচির সমালোচনা প্রসঙ্গে” (Marx, “A critique of Gotha Programme”, Marx-Engels selected works, volume-2, Foreign language publishing house, Moscow, 1949, PP-17-34) এই লেখাটি সম্ভবতঃ তারাই পড়বেন যারা পুঁজিবাদ-উত্তর নতুন মানবিক সমাজ নির্মাণে আগ্রহী। আর যেসব দেশে সমাজতন্ত্রের নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, সাফল্য-ব্যর্থতার নানা রেকর্ড রয়েছে, সেসব দেশের সমাজ বিকাশের “ডাইনামিক্স”বোঝার জন্যও মার্কসের এই ছোট বইটি কাজে লাগতে পারে।

তবে পুঁজিবাদের যাঁতাকলে যে শ্রমিক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শোষিত জনগণ ধুঁকছে, যে কালবর্ণের মানুষ, উপনিবেশের মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ, নির্যাতিত নারী, অধিকার হারা সর্বহারা ম্লান-মুঢ়-মুক মুখ নিয়ে মুক্তির দিন গুনছেন–তারাও মার্কস পড়বেন, কিন্তু তাদের কাছে পুঁজি নয়, আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণাদায়ক বই হচ্ছে “কমিউস্টি পার্টির ইশতেহার”। এই বই মার্কস এঙ্গেলস দুজনে মিলে লিখেছিলেন। বইটি খুবই ছোট কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল “Electrifying”. বইটি তাঁরা রচনা করেছিলেন আন্তর্জাতিক বিপ্লবীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন “কমিউনিস্ট লীগের”একটি ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি রচনার দায়িত্ব পাওয়ার পর। এটি হচ্ছে সাম্যবাদীদের ইশতেহার। এই বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ কপি ছাপা হয়েছে, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই এই বই অনূদিত ও পঠিত হয়েছে। বি.বি.সি.-র জরিপ অনুযায়ী মার্কসের এই বইটির কদর পৃথিবীর হাতে গোনা অল্প কয়েকটি বইয়ের সমপর্যায়ভুক্ত।

উপসংহার

আমরা এই প্রবন্ধে বলার চেষ্টা করেছি যে মার্কস আজো প্রাসঙ্গিক, কারণ পৃথিবীতে আজও পুঁজিবাদ টিকে আছে। এবং মার্কসের লেখার অন্যতম বিষয় ছিল “পুঁজিবাদের গতির নিয়ম আবিষ্কার”। সুতরাং আমরা মনে করি পুঁজিবাদকে যারা রক্ষা করতে চান তারা যেমন মার্কস পাঠ করছেন, তেমনই যারা পুঁজিবাদকে ধ্বংস করতে চান তারাও মার্কস পাঠ করবেন। যদিও তাদের উভয়ের পাঠের দৃষ্টিভঙ্গী ও উদ্দেশ্য হবে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী।

আমরা আরো বলেছি যারা ভবিষ্যতের নবায়িত সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ অথবা বৈষম্যহীন-শোষণহীন-গণতান্ত্রিক-সমৃদ্ধ একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন তাদেরকেও আজ আত্মসমালোচনাসহ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে মার্কসের মূল রচনাগুলি পাঠ করতে হবে। তবে বেশি করে পড়তে হবে এই বিষয়ে মার্কসবাদী ও অমার্কসবাদী সকল গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকদের বিতর্কমূলক রচনাসমূহ। আর এই পাঠকে হতে হবে মুক্তমনা পাঠ।

আমরা আরো বলেছি, মার্কসকে পড়ার পদ্ধতিটি হবে দ্বান্দ্বিক। সর্বশেষ তথ্যের সাহায্যে মার্কসের তত্ত্বগুলিকে যাচাই সাপেক্ষে ক্রমাগত সৃজনশীলভাবে তত্ত্বকে বিকশিত করতে হবে। মার্কসের রচনা পাঠের সময় সর্বদা কোনটি মার্কসের লেখার সারমর্ম আর কোনটি তার আপেক্ষিক পরিবর্তনযোগ্য প্রকাশ সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে মার্কস পাঠ করলে আমরা মার্কসকে কখনো ঈশ্বর বা নবী বা absolute idea-র প্রবক্তা বানাবো না, আবার তাকে শয়তানের চেলা বা পরিপূর্ণ মিথ্যা ও ভুলে ভরপুর বলেও মনে করবো না। হেগেল যেমন তাঁর দর্শনকে Absolute Idea বলে দাবি করেছিলেন, মার্কস কিন্তু নিজে কখনো তার “আদর্শকে”absolute বলেন নি।

তবে মার্কসকে শুধু পড়ার জন্য পড়া এক কথা, আর মার্কস পড়ে তার আলোকে দুনিয়াকে বদলানোর চেষ্ট করা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি কথা। (সমাপ্ত)

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.