কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষক আন্দোলন

রফিকুজ্জামান লায়েক

দেশময় একটি প্রবাদ আছে- ‘যাকে দিয়ে রামের মা তাকে তুমি চিনলে না’। দেশের সকল মানুষের খাদ্যের যোগানদাতা হলেন কৃষক। তবে কৃষিকাজে কায়িক শ্রম দেন কৃষক ও ক্ষেতমজুররা মিলিতভাবে। কৃষিকাজে কৃষক ও তার পরিবারের অন্যরা সমানতালে শ্রমে নিয়োজিত থাকেন। উৎপাদিত ফসলের মধ্যে যতটুকু তার প্রয়োজন, সেটুকু রেখে বাকি সব বিক্রি করে দেন কৃষক। যদিও আগে মাত্র ৩/৪টি ফসলকে অর্থকরী ফসল বলা হত; কিন্তু এখন মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনে অনেক ফসলই চাষ করেন অর্থনৈতিক কারণে।

পাট, চা ও গবাদি পশুর চামড়ার কথা আগে বলা হলেও এখন ভুট্টা, কলা, মৎস-চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন কৃষকরা আর্থিক কারণে করে থাকেন। পূর্বের তুলনায় এখন চাষাবাদের ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আর এই পরিবর্তিত কৃষি ব্যবস্থায় কৃষক কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ফলে কৃষিকাজের সাথে জড়িত মানুষ পেশা পরিবর্তন করছেন। অথচ আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের পরিচয় কৃষিকে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ শ্রম দেন কৃষিকাজে। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি খাত হলো কৃষি। বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিতরা বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দিলেও কৃষিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। মূল সমস্যা এখানেই।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের পাশের দেশ ভারতের একটি ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছেন বিশ্ববাসী। কী সে আন্দোলন? ফসল উৎপাদন, বিপণন ও কৃষিকাজে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয় নিয়ে মোট ৩টি আইনের বিরুদ্ধে লড়ছেন ভারতীয় সংগ্রামী কৃষকরা। ১৯৬৪-৬৫ সাল থেকে ভারতীয় কৃষকরা যে অধিকারগুলো ভোগ করে আসছিলেন, ‘গুজরাটের কসাই’ খ্যাত মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেগুলিকে বাদ দিয়ে নতুন তিনটি আইন করে ভারতের কৃষি ও কৃষককে কয়েকটি কোম্পানির হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করে। আগে আমাদের পূর্বপুরুষ কৃষকরা আন্দোলন করতেন জমির মালিকানা ও উৎপাদিত ফসলের ভাগ নিয়ে। আর কোনো ইস্যু ছিল না। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আমাদের দেশের কৃষকের সমস্যা বাড়ার সাথে সাথে কৃষক আন্দোলনের ইস্যুও বেড়েছে। আজকের কৃষি ও কৃষি ব্যবস্থাকে বুঝতে হলে, কৃষকের নতুন নতুন সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে বুঝা যাবে না। কেন কৃষি ব্যবস্থায় সমস্যা বাড়ছে? উত্তরে বলতে হবে- শাসক শ্রেণির উদাসীনতা, বর্ধিত জনসংখ্যা ও কৃষক আন্দোলনের জন্য দক্ষ ও সার্বক্ষণিক কর্মীর অভাব।

আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তনের সময়কাল ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তখন দেশের যে জনসংখ্যা ছিল এখন তার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অথচ নগরায়ণ, রাস্তা নির্মাসহ নানা কাজের জন্য কৃষি জমি বা আবাদি জমি কমে গেছে। একদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে অন্যদিকে কৃষি জমি কমেছে। ফলে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষককে যন্ত্রের ও কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। সার, বীজ, কীটনাশকসহ প্রায় সমস্ত কৃষি উপকরণের জন্য কৃষক অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কৃষি উপকরণের ওপর সরকারের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কৃষক আগে লড়তেন জমির জন্য জমিদারের বিরুদ্ধে। আর এখন ঐ জমিদার শ্রেণিরই অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার কৃষি উপকরণের মালিকদের বিরুদ্ধে। ভেজাল উপকরণের কারণে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে যান। তার জন্য সরকারি কোনো কর্মকর্তা কোনো প্রকার দায় কখনও নিয়েছেন বলে জানা যায়নি। আবার সংগ্রামী সংগঠনের অভাবে তেমন প্রতিবাদী সমাবেশও লক্ষণীয় নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেখা যাচ্ছে আমাদের জাতীয় আয়ের ১৩ শতাংশের বেশি আসে কৃষি থেকে। আর জনসংখ্যার ৪১ শতাংশের কিছু বেশি কাজ করেন কৃষিতে। অর্থাৎ কৃষিতে দেশের জনসংখ্যার ৪১ শতাংশের শ্রম নিয়োজিত হয়। অথচ আয় করে মাত্র ১৩ শতাংশ। এখানে দু’টি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে– তা হলো হয় কৃষি কাজে শ্রম শক্তির অপচয় হয় কিংবা কৃষি ফসলের বাজার মূল্য কম ধরা হয়। আয় নির্ধারণের নিয়ম আমাদের জানা নেই। যদিও জানা উচিৎ ছিল বা জানানো প্রয়োজন ছিল। উৎপাদিত কৃষি ফসলের দাম কেউ নির্ধারণ করেন না। খোলা বাজারেই কৃষককে তার উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে হয়। অথচ কৃষি উপকরণে প্রায় সব কিছুরই দাম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কিসের ভিত্তিতে উপকরণের দাম নির্ধারিত হয়, তা কেউ জানে না। আর এ ক্ষেত্রে কোনো রকমের জবাবদিহিতাও নাই। ফলে কৃষক কিনতে এবং বেচতে দুই দিকেই ঠকে। ফলে লাভজনক না হওয়ায় কৃষক এখন তার পেশার পরিবর্তন করছেন। এভাবেই যদি চলতে থাকে, তবে আগামীতে কে করবে কৃষিকাজ।

আমাদের দেশের শাসকশ্রেণির যে অংশ এখন শাসন ক্ষমতায় আছে তারা নিজেদেরকে কৃষিবান্ধব বলে জাহির করার চেষ্টা করছে। কৃষকের কৃষি কার্ড কৃষকের কী লাভ হয়েছে– তা তারা বলতে পারে না। আসলে ওসব ফাঁকা বুলি ও লোক দেখানো। ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এরা ক্ষমতায় আছেন। যদি সরকার কৃষকবান্ধব হতেন তা এই সময়ে হাজার-হাজার কৃষক প্রতি বছরে এই পেশা ত্যাগ করছেন কেন? বরাদ্দ বা অনুদান আমলা ও দলীয় লোকদের পকেট ভারি করে। পরিবর্তিত কৃষি ব্যবস্থায় কৃষকের পাশে যেভাবে শাসক শ্রেণির দাঁড়ানো উচিৎ ছিল তা তারা করছেন না। উল্টো তারা তাদের শ্রেণিস্বার্থের কারণে বিএডিসি’কে পঙ্গু করে কোম্পানির হাতে কৃষি ব্যবস্থাকে তুলে দিচ্ছে। অনেক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশের সরকারসমূহ সে প্রকাশ্যে যে মতেরই হোক না কেন– “উৎপাদনশীল খাতকে বেসরকারিকরণ”করছে এবং সে জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যতটা ছাড় দেয়া যায় দিচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত হলো কষিকাজ। কিন্তু এ দিকে কতটা নজর আছে– তা সাম্প্রতিক সময়ের ২/১টি ঘটনা উল্লেখ করলেই পরিষ্কার হবে। করোনাকালীন সময়ে বর্তমান সরকার মহা ধুমধাম করে ভর্তুকি ও প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করে। কিন্তু সে টাকার কতটুকু কৃষকের জন্য ছিল। যাও বা ছিল তা তো আমলা ও সরকার দলীয় লোকদের পকেটে যাবার কাহিনী মানুষ জানেন। আর একটি ঘটনা হলো ২০২০ সালে সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশের অবশিষ্ট ২৫টি সরকারি পাটকল বন্ধ করে দিল। এ বিষয়ে যদিও অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হবেও। সরকার যা করল তা হলো পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বাজার সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি মালিকদের হাতে ছেড়ে দিল। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট ও পাটশিল্পের সাথে জড়িত কয়েক কোটি মানুষের কোনো দায়িত্ব সরকারের থাকল না। তার পরপরই পুরো বন্ধের পাঁয়তারা করছে আখ ও চিনি শিল্পকে। ইতোমধ্যে কয়েকটি চিনিকলের উৎপাদ বন্ধ করে দিয়েছে এবং বাকিগুলিও আগামীতে বন্ধ করার ব্যবস্থা করছে। অর্থাৎ আখচাষিদের কোনো দায়-দায়িত্ব সরকার আর নেবে না।

সরকার যতোই উদাসীন হোক না কোন, কৃষক তার জীবনের প্রয়োজনে উৎপাদনের স্বার্থে নতুন-নতুন কলা-কৌশল অবলম্বন করে দেশের সকল মানুষের অন্নের ব্যবস্থা করছে। বিনিময়ে কৃষক পাচ্ছেন না তেমন কিছু। কিন্তু পাইতে হলে লড়তে হবে। রোদ-বৃষ্টি-গরম-শীত প্রকৃতির এই সবের সাথে লড়াই করেই কৃষক ফসল উৎপাদন করে। ওর কোন একটিকে বয় পেয়ে গা বাঁচালে ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। তাই প্রকৃতির সাথে লড়াই যদি হয় কৃষকের প্রথম লড়াই, তা হলে তার দ্বিতীয় লড়াই হলো ফসলের লাভজনক দাম নিশ্চিত করা।

কিন্তু পরিবর্তিত কৃষি ব্যবস্থায় এ লড়াইয়ে কৃষক একা পারবেন না। প্রয়োজন লড়াকু সংগঠন ও উপযুক্ত কর্মী-সংগঠক। মৌসুমী ইস্যু ধরে কয়েকটি প্রতিবাদী জমায়েত ও মিছিল যথেষ্ট নয়। যার শিক্ষা আমরা পেয়েছি। কৃষকের শ্রম-ঘাম যথার্থভাবে কাজে লাগাতে হলে কৃষি ফসলের লাভজনক দাম অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। আগেই বলেছি কৃষক আগে লড়তেন জমির মালিকানা ও ফসলের ন্যায্য মিহ্যার জন্য। কিন্তু এখন কৃষককে লড়তে হয় প্রতি পদে পদে। তাকে লড়তে হয় উৎপাদনের উপকরণের সহজলভ্যতার জন্য, লড়তে উৎপাদিত ফসলের বিপণনের জন্য। ফলে কৃষকের লড়াই আজ অত্যন্ত কঠিন ও নানা মাত্রার। কৃষকের আন্দোলন মোটেই বিচ্ছিন্ন কোনো আন্দোণন নয়- জাতীয় স্বার্থেই আজ কৃষকের আন্দোলন শ্রেণি-স্বার্থের আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত করা এবং জাতীয় স্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত করা। কেননা কৃষকের আন্দোলন অর্থনীতিবাদী আন্দোলন হলেও আজ তাকে শ্রেণিস্বার্থের জাতীয় আন্দোলন হিসেবেই অগ্রসর করা প্রয়োজন। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় খাত হলো কৃষি। যে খাতে জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ মানুষ শ্রম নিয়োজিত করছেন। প্রচলিত বা দৃশ্যমান শাসকশ্রেণির কোনো অংশই এখন তাদের কায়েমি স্বার্থ ও শ্রেণিস্বার্থের কারণে কৃষকের লড়াইয়ের দাঁড়াবে না। যা ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়েছে। তাই কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই ৪১ শতাংশ মানুষের শ্রম ও স্বাধীন জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল থেকে কৃষকের লড়াইকে সচেতনভাবেই ব্যবস্থা বদলের সংগ্রামের সাথে অগ্রসর করা। যে আয় করে তাকে ভাল না রাখতে পারলে অন্যরাও ভাল থাকবে না। তাই শেষ জয় হবে কৃষকের। সামনে থাকবে মেহনতি মানুষের সচেতন কর্মী বাহিনী।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.