করোনা মহামারি প্রতিরোধে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ- বাম জোট

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত টেস্ট, চিকিৎসা ও টিকা প্রদানে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বাম নেতৃবৃন্দ। সরকারের এই ব্যর্থতা উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, করোনায় মানুষের মৃত্যুর দায় সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারে না।

আজ (০৩ জুলাই) শনিবার দুপুর ১২টায় বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের এক ভার্চ্যুয়াল সভার এক প্রস্তাবে উপরোক্ত বক্তব্য প্রদান করা হয়।

নেতৃবৃন্দ সভার এক প্রস্তাবে সারাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ হার ও মৃত্যু সংখ্যা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, গত বছর যখন দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ সনাক্ত হয় তখন সরকারের মন্ত্রীরা বলেছিলেন শেখ হাসিনার সরকার করোনার চেয়েও শক্তিশালী। তাদের এই অহম, আত্মম্ভরিতা, অবহেলা, অমনোযোগ, সর্বোপরি আত্মতুষ্টি করোনা সংক্রমণ থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে পারেনি। তখনই দেশের স্বাস্থ্য খাত ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ভঙুর দশা ফুটে উঠেছিল। কিন্তু দেড় বছর পরেও দেখা যাচ্ছে বিনা চিকিৎসায়, অক্সিজেন না পেয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর অসহায় মৃত্যু ঘটছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর থেকে মিথ্যা তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে জনগণের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করা হচ্ছে। যে পরিমাণ চিকিৎসা সরঞ্জাম-যন্ত্রপাতি, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, নেসাল ক্যানুলা হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে বাস্তবে সরেজমিন গিয়ে দেখা যাচ্ছে সে পরিমাণ যন্ত্রপাতি দেয়া হয়নি। অথচ এজন্য কোন কর্মকর্তার আজ পর্যন্ত শাস্তি হয়নি। এতে দুর্নীতি অনিয়ম ক্রমেই বেড়ে চলছে আর এর নিকৃষ্টতম শিকার হচ্ছে জনগণ।
সভার প্রস্তাবে বলা হয় সাতক্ষীরা ও বগুড়ায় ৭ জন করে মোট ১৪ জন করোনা রোগী অক্সিজেন না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। এর দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়, এমনকি সরকার কোনমতেই এড়াতে পারে না।

প্রস্তাবে বলা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে নড়াইল সদর হাসপাতালে ২০০টি নেসাল ক্যানুলা রয়েছে, অথচ সেখানে গিয়ে দেখা গেছে নেসাল ক্যানুলা আছে ২টি তাও এখনও পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়নি।

প্রস্তাবে বলা হয়, বাম জোটের পক্ষ থেকে গত বছর এপ্রিলেই সরাকরের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল করোনা মহামারীকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সমাজের বিভিন্ন অংশের শ্রেণি পেশার মানুষদের নিয়ে সর্বদলীয় জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের। একই সাথে সেনা বাহিনীর মেডিকেল টিম যাদের দক্ষতা রয়েছে তাদেরকে দিয়ে ফিল্ড হাসপাতাল করে দৈনিক কমপক্ষে ১ লক্ষ টেস্ট, বিনামূল্যে চিকিৎসা, আইসোলেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার। কিন্তু সরকার সে দাবি শুনেনি। এমনকি দলীয় লোক, মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানদেরকেও এ কাজে সম্পৃক্ত না করে সচিব আমলাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে করোনা প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, শুধু করোনা টেস্ট, চিকিৎসাই নয়, এমনকি টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সরকার জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর থেকে শুধুমাত্র ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকায় আজ টিকা প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদি আগে থেকে চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে টিকা ক্রয় এবং যৌথভাবে ট্রায়াল ও গবেষণায় মনযোগ দিত তাহলে এতোদিনে আমাদের জনসংখ্যার সিংহভাগকে টিকা দেয়া সম্ভব হতো। আন্তর্জাতিক টিকা বাণিজ্যের ফাঁদে পড়ে ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে চীনের টিকার ট্রায়াল দিতে না দেয়া ছিল সরকারের বিরাট ভুল। যা এখন মন্ত্রীদের বক্তব্যে বেরিয়ে আসছে।

প্রস্তাবে বলা হয় শুধু বিদেশ থেকে টিকা ক্রয় নয় সরকারের অদুরদর্শীতার কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল বায়োটেকের বঙ্গভ্যাক্স টিকা নিয়েও তুঘলকি কা- চলেছে। সভার প্রস্তাবে বলা হয় অতিউচ্চ সংক্রমিত জেলাসমূহে জরুরি ভিত্তিতে অবিলম্বে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি, হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু, পর্যাপ্ত নেসাল ক্যানুলা, আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। এবং বঙ্গভ্যাক্সের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের অনুমতি দেয়ার দাবি জানানো হয়।
সভার অপর প্রস্তাবে বলা হয়, অক্সফোর্ডের টিকাও ঢাকায় বেশি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যে ৪৫ লাখ টিকা এসেছে এবং আসবে সেটা অতি সংক্রমিত জেলাসমূহে দেয়ার দাবি জানানো হয়।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন নান্নু, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড মানস নন্দী, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবীর জাহিদ, গণসংহতি আন্দোলনের সম্পাদক কমরেড মনীর উদ্দিন পাপ্পু, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সভাপতি কমরেড হামিদুল হক, বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবি নেতা সাজ্জাদ জহির চন্দন, কাফী রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আকবর খান, ইউসিএলবি সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণসংহতি আন্দোলনে সম্পাদক বাচ্চু ভুইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.