করোনা প্রসঙ্গ: দেশ-দুনিয়াকে বদলাতে হবে

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম :

বিশ্ব আজ ‘করোনা-মহামারির’ মহা দুর্যোগে নিপতিত। বিশ্বে বড় বড় দুর্যোগ-মহামারি আগেও এসেছে। কিন্তু এবারেরটি নানা দিক থেকে ভিন্ন মাত্রার ও চরিত্রের। এবারের মহামারি ব্যতিক্রমহীন ভাবে বিশ্বের সব দেশে একই সাথে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এর উৎপত্তি যে ‘নভেল করোনা’ নামক ভাইরাস থেকে তার গতি প্রকৃতি মানুষের কাছে এখনও অজানা। তদুপরি এই বহুরূপি ভাইরাস ক্রমাগত তার রূপ-বৈশিষ্ট বদল করে চলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত কোনো ‘প্রতিষেধক’ এখনও নেই। একবার মানুষের দেহে ঢুকে গেলে তার মরণকামড় থেকে বাঁচার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হওয়া কোনো ‘ঔষধ’ এখনও আবিষ্কার হয়নি।

‘করোনা-মহামারি’ এ সত্যটিকে প্রকাশ করে দিয়েছে যে বর্তমান সময়ে, ‘পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের’ তথাকথিত স্বাধীন মুক্ত-বাজারের আধিপত্বাধীন দুনিয়ায়, কোনো ভাইরাসের বিশ্বব্যপী আনা গোনা নিবৃত রাখা সম্ভব না। নিশ্ছিদ্র ‘কোয়ারেনটাইন’ দ্বারা তাকে কোনো একটি দেশে আটকে রাখা সম্ভব না। আগামীতেও এ ধরনের রোগের বিদ্যুৎ গতিতে বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে না। ব্যপক মানুষের কাছে এ উপলব্ধি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ‘করোনা-মহামারির’ ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক একটি বিশ্ব-দুর্যোগের ঘটনা নয়। এটি মানুষের আশু বাঁচা-মরার প্রশ্নের সাথে যেমন সম্পর্কিত, তেমনি তা ভবিষ্যতে ‘মানব অস্তিত্ব’ আদৌ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে কি হবে না, সে প্রশ্নের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে।

‘করোনা-মহামারি’ তথা ‘কোভিড-১৯ প্যানডেমিক’ তার অভাবনীয় ভয়াবহতা নিয়ে গত ৬ মাস ধরে বিশ্বের মানুষের ওপর অব্যাহতভাবে তার মরণাঘাত হেনে চলেছে। আজও পৃথিবী থেকে সে বিদায় হয়নি। এমনকি তার নির্বিচার আঘাত স্থিমিতও হয়নি। বরঞ্চ, অনেক দেশে তার আঘাত এখনও প্রসারিত ও তীব্রতর হচ্ছে। যেমন ঘটছে আমাদের দেশে।

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে বিশ্ববাসীকে অনেক বছর ধরে ‘করোনার’ আঘাত সইতে হবে। এটি আদৌ কোনদিন সম্পূর্ণ অপসারিত হবে কিনা সে কথাও নিশ্চিত বলা যায় না। মানুষকে বহুদিন ‘করোনার’ সাথে সহবাস করে থাকতে হবে। তাই, মানুষের সামনে আজ প্রশ্ন শুধু বর্তমান দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের বিষয়ই নয়। একই সাথে প্রশ্ন হলো করোনার সাথে বসবাস করার মতো করে জীবনযাত্রাকে ঢেলে সাজানো। আরও বড় প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে এধরনের বা আরও ভয়ঙ্কর ‘মানব অস্তিত্ব বিনাশের’ মতো ভাইরাসের সম্ভাব্য হামলা যেন মোকাবেলা করা যায় সেরকমভাবে আমাদের দেশকে ও বিশ্বকে ঢেলে সাজানো। তা করা সম্ভব হবে যদি ‘করোনা’ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে নির্মোহভাবে শিক্ষা নিয়ে আমরা অগ্রসর হতে সক্ষম হই।

বিশ্বে ও আমাদের দেশে ‘করোনা-মহামারি’ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই অপরাধতুল্য অনেক বড় বড় ভুল করা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় ভুলটি ছিল ‘কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের’ অভিনবত্ব উপলব্ধি না করতে পারা। বিচ্ছিন্ন ভাবে কোনো দেশ বা ব্যক্তির পক্ষেই যে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়, এবং বাঁচতে চাইলে যে ‘সবাই মিলে একসাথে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে’ সেই মূল দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন চিন্তা অনুসরণ করা হয়নি। সেই সত্যটিকে সামনে আনা এবং সে সম্পর্কিত ভাবনাকে জনগণের মাঝে জাগিয়ে তোলার চেষ্টাও করা হয়নি। পুঁজিবাদের ‘ব্যক্তিস্বার্থ’, ‘মুনাফার লালসা’ ও ‘বাজারের লেনদেনের’ মানদণ্ডে পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব যে সেক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়, সেকথাটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

এর ফল হয়েছে এই যে, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও তা থেকে উৎসারিত মনস্তত্ত্বের কাঠামোর মধ্যেই ‘করোনা-মহামারি’ প্রতিরোধের রণনীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও অবশ্য ছিল। চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি সমাজতন্ত্রের ধারায় পরিচালিত দেশ, অথবা যেসব দেশে বা প্রদেশে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং এমনকি যে কয়েকটি পুঁজিবাদী দেশ ‘পুঁজিবাদের’ চিরায়ত ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে পদক্ষেপ নেয়েছিল, তারা ‘করোনা’ প্রতিরোধের কাজে ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে।

‘করোনা প্রতিরোধের’ জন্য যা ছিল সবচেয়ে আগে ও বেশি করে প্রয়োজন তা হলো, ‘ব্যক্তি স্বার্থবোধের’ চলতি হাওয়ার মনস্ত্বত্ত্ব থেকে জনগণকে বের করে আনা। তাদের মাঝে ‘বিশ্বজনীন সমস্বার্থবোধ’ ও ‘সামাজিক-দায়িত্ববোধের’ ভাবনা জাগিয়ে তোলা। সেটি করা হয়নি। তা না করে বরঞ্চ বলা হলো যে, এখন মানুষের একটি প্রধান কাজ হলো ‘সামাজিক-দূরত্ব’ (Social-Distancing) কার্যকর করা। এভাবে বলাটা সঠিক হয়নি। কারণ, ‘করোনা’ মোকাবেলার জন্য উপস্থিতভাবে যা সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র তা হলো ‘শারিরিক- দূরত্ব’ (Physical-Distancing) বজায় রাখা। সেটিকে ‘সামাজিক-দূরত্ব’ (Social-Distancing) হিসেবে জনগণের কর্তব্য রুপে আক্ষায়িত করাটি জনগণের মাঝে ভ্রান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার বদলে তা মানুষকে ‘বিচ্ছিন্ন একক’ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টার কথা বলেছিল। এটি ছিল চলতি পুঁজিবাদী দর্শন-চিন্তা থেকে উৎসারিত।

মাস ছয়েক আগে ‘করোনা’ প্রথম আক্রমণ হেনেছিল চীনের ইউয়ান প্রদেশে। সপ্তাখানেকের মধ্যে পরিস্থতির বিপদজনক ভয়াবহতা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। ‘করোনা প্রতিরোধের’ কাজটিকে ‘প্রাদেশিক বিষয়ের’ বদলে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারমূলক কেন্দ্রীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য করে গণচীনের কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেয়ার মতো এক সর্বাত্বক অভিযান শুরু করেছিল। সারা দেশের মানব ও আর্থিক শক্তি সমবেত করে মাসখানেকের মধ্যেই বিস্ময়কর সাফল্যের সাথে অবস্থার অবনতি রোধ করেছিল। দেশের অন্যত্রও করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

বিনা নোটিশে আবির্ভুত হওয়া এই মহা-দুর্যোগকালে চীনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং তার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের দেশকে সম্ভাব্য ‘করোনা-মহামারি’ মোকাবেলায় প্রস্তুত করার বদলে আমেরিকা এই সুযোগে চীনের বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে নেমে পড়েছিল। দুই মাস ধরে চলেছিল আমেরিকার ‘চীন-বিরোধী’ অভিযানের নতুন এই তুফান। মিথ্যা কল্পকাহিনী ফেঁদে সে চীনকে ‘করোনার’ জন্য দায়ী করে ক্ষতিপূররণের মামলাও রজু করার ঘোষণা দিয়েছিল। চীনের এগিয়ে থাকা অর্থনৈতিক শক্তিকে খর্ব করার জন্য তার বিরুদ্ধে নতুন ‘বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞা’ জারীসহ বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অন্যান্য শত্রূতামূলক বৈরি কাজে লিপ্ত হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা সহ বিভিন্ন স্থানে উস্কানীমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সে ভূ-পরিমণ্ডলে তার প্রভাব বলয় বাড়ানোর লক্ষ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে তৎপর হয়েছিল।

এভাবে, শুরু থেকেই আমেরিকা ‘করোনা’ মোকাবেলার কাজে বিশ্ববাসীকে একসাথে সামিল করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করার বদলে ‘মানবতা বিরোধী’ বিশ্বাসঘাতকের মতো মানব শক্তিকে বিভক্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিল। তার বিষময় ফল তাকে এবং বিশ্ববাসীকে এখন ভোগ করতে হচ্ছে। আমেরিকায়ই ইতোমধ্যে চীনের চেয়ে ৩৩ গুণ বেশি মানুষকে ‘করোনার’ মরতে হয়েছে। আজ একথা পরিস্কার যে, আমেরিকা নিজের পায়ে নিজেই কুঠারাঘাত করেছিল। পুঁজিবাদ যে আজ সাধারণ ‘মানবিকতাকে’-ও ধারণ করতে পারে না, এবং এমনকি মুনাফার লোভে সে যে আত্মহনের পথ গ্রহণেও দ্বিধা করে না, সাম্প্রতিক ‘করোনা-আক্রান্ত’ বিশ্বে সেটি নির্মম সত্য হিসেবে বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে।

অপরদিকে এ সত্যটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি যেসব দেশ পুঁজিবাদের বদলে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পরিচালি‌ত, অথবা যেখানে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বাধীন সরকার আছে, কিম্বা যেসব পুঁজিবাদী দেশে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ‘ব্যক্তি খাত’ নির্ভর থাকার বদলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে- সেসব স্থানে অপেক্ষাকৃত বহুগুণ সাফল্যের সাথে ‘করোনা’ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। এই পথেই যে মানব সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হতে পারে সে সত্যও আজ মানুষের কাছে আরো বেশি করে পরিস্কার হয়ে উঠছে।

আমাদের দেশের ‘করোনা’কালীন অভিজ্ঞতা থেকেও এই একই সত্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। জানুয়ারির শুরুতেই একথা বেশ স্পষ্ট হয়েছিল যে, চীনে শুরু হওয়া ভয়ঙ্কর বিপদজনক ‘করোনা-মহামারি’ যদি বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করে তাহলে দেশ মহা -দুর্যোগে পতিত হবে। তা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে তখন থেকেই সুপরিকল্পিত কতোগুলো ব্যবস্থা শক্তভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। বিদেশ থেকে আগতদেরকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে’ রাখার ভালো ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্য্কর করা উচিত ছিল। দেশের ভেতরে ‘করোনা-কালীন’ সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সংগঠিত প্রচারণা-শিক্ষা-প্রশিক্ষণ অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল। হাজার-হাজার আগ্রহী তরুণ-তরুণীকে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে এড-হক নিয়োগ দিয়ে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ দিয় আপৎকালীন সময়ে কাজের জন্য প্রস্তুত করে রাখার পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। যথেষ্ট সংখ্যক ভেন্টিলেটর, রেসপিরেটর, টেস্টিং কিট ও ল্যাব-ইকুইপমেন্ট এবং চিকিৎসক সহ সব স্বাস্থ্য কর্মীদের ব্যবহার-উপযুক্ত স্যানিটেশন পোষাক (পিপিই), মাস্ক, গ্লাভস, গগোলস, হেলমেট ইত্যাদি মজুদ করে রাখা উচিত ছিল। চিকিৎসার জন্য অক্সিজেনের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে তার প্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত ছিল। এসব বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তা না করে তারা শুধু এসব কথা বলে মানুষকে আশ্বস্থ করতে থাকলেন যে, ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’ এবং ‘ নেতা-নেত্রীরা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন’, – তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই । চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, নেপাল, কেরালার ‘জোরালো উদ্যোগের’ পথ অনুসরণের বদলে সরকার অনেকটাই ‘কপাল’ ও ‘ব্যক্তি খাতের’ মর্জির ওপর নির্ভর করে, দুই মাসেরও বেশি সময় কার্যত হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন।

এদিকে, মার্চের মাঝামাঝিতে এসে ‘করোনা’ পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটতে শুরু করেছিল যে, কিছু ব্যবস্থা না নিলে সরকারের আর মুখ থাকে না। এমতাবস্থায় মার্চের শেষ দিক থেকে সরকার নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে রচিত কোনো ‘করোনা প্রতিরোধ স্ট্র্যাটাজি’ না থাকায়, সরকারের এসব পদক্ষেপগুলো প্রায়সই এলোমেলো, স্ববিরোধী, পিসমিল, এড হক ধরনের এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপে পরিণত হয়েছিল। এর নিদর্শন নানা ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।

গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে একাধিকবার গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া আর ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাহীন পদক্ষেপ সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ‘দিন আনি দিন খাওয়া’ কোটি-কোটি মানুষের জন্য খাদ্য-নিশ্চয়তার ব্যবস্থা না করেই তাদেরকে ‘ঘর থেকে বের না হওয়ার’ জন্য বলা হলেও তা একেবারেই কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সরকার তার নিজের ভুল স্বীকার করে তা সংশোধন করার বদলে, এজন্য দায় ‘জনগণের’ ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। শ্রমিকদের জন্য অনুদানের অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের হাতে না দিয়ে তা মালিকদের মাধ্যমে দেয়ায় তা থেকে মালিকদেরকে ৪০% কেটে রাখার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে লকডাউন আরোপ ও শিথিল করা হয়েছিল (যখন আক্রান্তের সংখ্যা ৮/১০ জন ছিল তখন ঢালাও লকডাউন ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও, এখন যখন সংক্রমণের সংখ্যা যখন ২,০০০ ছাড়িয়ে গেছে, এবং তা যখন ‘পিক’ অভিমুখে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন সাধারণ ছুটি তুলে নিয়ে লকডাউন ঢালাওভাবে শিথিল করা হয়েছে)। অনেক ক্ষেত্রে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে অসামঞ্জস্য থাকায় সকাল-বিকাল সেগুলো পরিবর্তন করতে হয়েছে।

‘করোনা’ পরিস্থিতি দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম বেহাল অবস্থাকে উলঙ্গভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। যেখানে এটিই প্রত্যাশিত যে, বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিসহ সামাজিক কল্যাণের খাতে ব্য্য় করা হবে, সেক্ষেত্রে প্রকৃত বরাদ্দ এর চার ভাগের এক ভাগও না। তাছাড়া, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি (৬ হাজার টাকা দামে বালিশ ক্রয়, ৩৭ লক্ষ টাকায় ওটির জন্য পর্দা ক্রয় ইত্যাদি ঘটনা), দলবাজী, তদবিরবাজী প্রভৃতি এখন সকলের জানা হয়ে গেছে। চিকিৎসা সেবাকে সংবিধান মোতাবেক ‘রাষ্ট্রের দায়িত্বের বদলে ‘কেনা-বেচার বাজারী-সামগ্রী’ বানানো হয়েছে। যাদের টাকা আছে তাদের জন্য চিকিৎসার উন্নত ব্যবস্থা করাই যেন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। কোটি-কোটি ‘পাবলিকের’ জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করার বিষয়টি যেন সকারের দায়িত্ব না। এই অবস্থায় ‘করোনা’ এসে গোটা ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। ‘করোনা’ রোগীর চিকিৎসা দেয়া যেমন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তেমনি অন্যান্য রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থাও একই সাথে ভেঙ্গে পড়েছে।

আজ করোনার আক্রমণের ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। ‘মুনাফার’ লালসার উর্ধ্বে উঠে জাতির সব শক্তি-সামর্থ্য সমবেত করে সমষ্টিগতভাবে ‘বেঁচে থাকার’ মানবিক কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসা আজ সবার কর্তব্য হওয়ার কথা। কিন্তু তা ঘটছে না। দেশের লুটেরা শোষক-শ্রেণির কাছে ‘মানবিক’ কর্তব্য পালনের চেয়ে ‘মুনাফা ও লুটপাটের’ মূল্য অনেক বেশি। এদেশের সরকার দেশি-বিদেশি লুটেরা শোষক-শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করাকেই তার প্রধান দায়িত্ব বলে বিবেচনা করে। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সরকারের প্রধান নজর থেকেছে সেই স্বার্থ রক্ষার প্রতি। তাতে ‘মানুষ’ মরলো কি বাঁচলো তা তার কাছে গৌণ বিষয়।

‘করোনা’ পরিস্থিতিতে সরকারের নেয়া আরো অনেক দায়িত্বহীন পদক্ষেপের কথা এসবের সাথে যুক্ত করা যায়। পরিস্থিতি এখন এতোটাই বিপদজনক হয়ে উঠেছে যে কয়েকটি লুটেরা ধনিক পরিবার প্রাইভেট বিমান ভাড়া করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এ দেশ যে তাদের কাছে ‘পরিত্যাক্ত দেশের’ মতো বিবেচিত, এর দ্বারা সে কথা স্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে।

পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী তত্ত্বের প্রতারণামূলক ও ভ্রান্ত যুক্তি হাজির করে শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে এই বলে প্রবোধ দিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় যে, শোষণ-লুটপাটের পথে কিম্বা ভালো-মন্দ যে কোনো পথে কিছু ব্যক্তিকে আগাধ সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দিলে, একসময় তা ‘চুইয়ে’ নিচতলার গরিবের কাছে পৌঁছাবে। এটিই ‘উন্নয়নের’ একমাত্র পথ। তাই, ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে দেশের ৯৯% গরিব-মধ্যবিত্ত কষ্ট করে যেতে হবে। এটি হলো উন্নয়নের অবস্যম্ভাবী কিন্তু সাময়িক ‘প্রসব বেদনা’। কিন্তু বাস্তবে ‘সাময়িক প্রসব বেদনার’ এই তত্ত্ব কার্যকর হয় না। কারণ, লুটেরারা যে সম্পদ কুক্ষিগত করে তা চুইয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত না হয়ে, তার বেশিরভাগই বিদেশে পাচার অথবা লুটেরাদের ভোগ-বিলাসে নিঃশেষ হয়ে যায়।

দেশ ও দুনিয়া যে এক নতুন অবস্থায় প্রবেশ করেছে, সেকথা ‘করোনা’ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ‘করোনার’ অভিঘাত কিভাবে কোথায় গিয়ে শেষ হবে সেকথা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু একথা বলা যায় যে ‘জেনেটিক অটো-মিউটেশনের’ প্রাকৃতিক উৎস থেকেও ভবিষ্যতে এরকম, অথবা তার চেয়ে আরও বিপদজনক ‘ভাইরাস-হামলা’ হওয়ার আশংকা আছে। তাতে ‘মহা-মড়কের’ পাশাপাশি মানব অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার বিপদ সৃষ্টি হবে। ‘কপালের’ ওপর আর ‘মুনাফা-লুটপাটের ব্যক্তিস্বার্থ তাড়িত’ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে চলতে থাকলে, ‘ইতিহাসের পরিসমাপ্তির’ পরিণতি এড়ানো যাবে না। এ থেকে বাঁচার পথ একটিই। তা হলো সমাজতন্ত্রের অভিমুখে ‘দেশ ও দুনিয়াকে বদলে দেয়া’।‘করোনা’ প্রতিরোধের জন্য যে সংগ্রাম চলছে তার যেন সেই উচ্চতর সংগ্রামে উত্তোরণ ঘটে, সেদিকে এখন থেকেই সচেতন প্রচেষ্টা চালানো সব সভ্য ও মানবপ্রেমী মানুষের আজ কর্তব্য।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)