করোনায় বেড়েছে দারিদ্র্যতা

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বছরপূর্তি হতে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী মানুষ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পার করেছে দুঃস্বপ্নের একটি বছর। কিন্তু করোনা ভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং আতঙ্কের শেষ হতে-না-হতেই আলোচনার বিষয়বস্তু এসে দাঁড়িয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ডওয়েভ।

কেবল পশ্চিমা দেশেই নয়, বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। শীতকালে করোনার সংক্রমণ বাড়ে আর গ্রীষ্মকালে কমে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তবে চায়নাতে সংক্রমণের শুরুটা শীতেই ছিল, এমনকি কিছু কিছু শীতপ্রধান দেশে করোনার সংক্রমণ এবং ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ভয়ংকর। তবে আবহাওয়ার সঙ্গে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, তার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ দেখা গেছে, একপর্যায়ে এসে করোনা শীত-গ্রীষ্ম মানেনি, বরং শীত, গরম এমন কি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে নির্মমভাবে তার থাবা বসিয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে প্রভাব পড়েছে সব ক্ষেত্রে। বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি। মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতা বিঘিœত হয়েছে। কার্যত সারা বিশ্বই সংকটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে করোনার কারণে। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব ব্যাপক দুর্ভিক্ষেও ঝুঁকির মুখে আছে। এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্কবার্তায় বলা হয়, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করতে পারে। সঙ্গত কারণেই যখন বিশ্বে অভাবি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে তখন এর পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। আর এজন্য বিশ্ব নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিশ্চিত করার বিকল্প থাকতে পারে না। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি মানুষকে ক্ষুধা, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং করোনা ভাইরাস মহামারির প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত সংক্রমণের হার বাড়ছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে পুরোপুরি বা শহরভিত্তিক কঠোর লকডাউন এবং কারফিউ শুরু করেছে। যেহেতু জনসাধারণের ঘরের বাইরে যাওয়া বেড়েছে, বাড়ছে জনসমাগম, এমনকি অফিস-আদালত, দোকানপাটসহ অনেক কিছুই আগের মতোই চলছে, সে কারণে সংক্রমণের হার বেড়েছে। যারা আগে ঘর থেকে বের হননি, তারাও এখন বের হচ্ছেন। শিশু-কিশোররাও বের হচ্ছে, অনেক দেশে তো স্কুল-কলেজও খুলে গেছে। ফলে নতুন কওে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণ জনগোষ্ঠী, শিশু-কিশোররা অন্যদের মধ্যে নিজের অজান্তেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

আমাদের দেশে শহর ও গ্রামে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করছে, অনেকেই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্কুল না খুললেও শিশুদের নিয়ে বাবা-মায়েরা বাইরে যাচ্ছেন। শিশুরা সতর্ক থাকতে পারছে না। নিজেদের উপসর্গ না হলেও পরিবারে বয়স্কদের সংক্রমিত করছে তারা। যেহেতু জনসমাগম বেড়ে চলেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বালাই নেই, জনসাধারণের মধ্যে একটা উদাসীনতা বা শৈথিল্য ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, এমনকি ন্যূনতম মাস্ক পরারও তোয়াক্কা নেই এবং অনেকেই শারীরিক দূরত্ব মেনে চলছেন না, তাই অদূর ভবিষ্যতে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তো আছেই।

দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই নিম্ন-আয়ের বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। করোনা মহামারির মুখে দেশে বেকার হয়ে পড়া নিম্ন-আয়ের অনেক মানুষকেই পথে পথে সাহায্য চাইতে বা ভিক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। অভাবি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং পরিবারের উপার্জন কমছে- এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে, যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। করোনা ভাইরাসের কারণে যে দারিদ্র্য বাড়ছে এবং খাদ্য সংকট থেকে শুরু করে নানামুখী সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জারি রাখতে হবে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের জন্য চরম খারাপ অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। মূলত শ্বাসতন্ত্রের উপরের ও নিচের অংশের সংক্রমণে এ ভাইরাস মানুষের অবস্থার অবনতি ঘটায়। ফলে করোনার যে কোনো বিষয়ে সচেতনতার বিকল্প নেই। জনসচেতনতা আমাদের তৈরি করতে হবে নিজেদের প্রয়োজনে।