করোনায় বাজেট: জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা চাই

এবারের বাজেট করোনা যুদ্ধের চলমান অবস্থায় প্রণীত বাজেট। সেই হিসাবে মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে সরকার অনেক বেশি বরাদ্দ দিবেন এবং রোগ প্রতিরোধ, রোগের চিকিৎসা এবং রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য নানা কর্মসূচি এবারের বাজেটে থাকবে। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ লোক অসংগঠিত খাতে নিয়োজিত। বর্তমান করোনাকালে অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন। একটি হিসাব মতে (অক্সফাম ও একশান এইড) বাংলাদেশ অর্ধেকের বেশি লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ৮৬ শতাংশ মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং ৭৮ শতাংশ মানুষ খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের জন্য আয় সমর্থন (Income Support) এর জরুরি প্রয়োজন রয়েছে সে জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ খাতে প্রচুর বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন। শোনা যাচ্ছে এবার তা কিছুটা করা হতেও পারে।

এছাড়া শুধু জীবন রক্ষা হলে চলবে না, জীবিকাও রক্ষা হওয়া চাই। সে জন্য এসএমই অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও প্রচুর বরাদ্দ দরকার। রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিকদের যদি রক্ষা করা না যায় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রায় সংকটও সৃষ্টি হতে পারে, যদিও বর্তমানে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এত ভাল যে সরকার শ্রীলংকাকে ডলার সাহায্য দিচ্ছে!

কিন্তু সবচেয়ে বড় যে সংকট বর্তমানে মানুষকে বিক্ষুদ্ধ ও সরকার সম্পর্কে আস্থাহীন করে দিচ্ছে তা হচ্ছে সরকার ব্যয় বরাদ্দ যতটুকুই করুক না কেন তাতে প্রচুর নয়-ছয় হচ্ছে এবং সুশাসনের অভাবে গরিব মানুষ তার প্রাপ্য হিস্যা পাচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে করোনার কারণে আন্দোলন-সংগ্রামও তেমন একটা জমে উঠছে না।

আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির করাল গ্রাস। সেটি যখন একজন সাহসী সাংবাদিক প্রকাশ করেছিলেন তখন উল্টো তার ওপরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের খড়গ নেমে আসলো। আমরা দেখেছি নগদ অর্থ ও রিলিফ বণ্টনে যাদের প্রাপ্য নয় তারাও অর্থ ও খাদ্যদ্রব্য পাচ্ছেন। আর যাদের প্রাপ্য তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ করার জন্য কোনো রাস্তাও তারা দেখছেন না। আমরা দেখছি পোশাক শিল্প ও বৃহৎ শিল্পের মালিকরা প্রচুর ‘রিফাইনান্স লোন’ পাচ্ছেন কিন্তু তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার হয়নি। এর পরেও শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে (পোশাক শিল্পে এর মাত্রা প্রায় ৮ শতাংশ)। অনেক খবরের মধ্যে বড় খবর হচ্ছে রেমিট্যান্স হিসাবে যে বিপুল অর্থ দেশে এসেছে তার একটা বড় অংশই হয়তো ধনীদের পাঠানো হাত ঘুরে আসা কালো টাকা। সরকার বাজেটে এবারো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তা যদি হয়, তাহলে সেটা, যারা ন্যায়সঙ্গতভাবে ট্যাক্স প্রদান করে তাদেরকে সুবিধা না দিয়ে ক্ষমতাবান লুটেরা পুঁজিকেই বেশি সুবিধা দিবে। সরকার অবশ্য একে ‘কালো টাকা’ না বলে ‘অপ্রদর্শিত আয়’বলে অভিহিত করছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, তার কাছে বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের যে তালিকা আছে তাতে যথাক্রমে অসৎ আমলা, অসৎ রাজনীতিবিদ এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা আছেন। তাদের নাম প্রকাশ ও শাস্তি এখনো হয়নি। সুতরাং বোঝাই যায় যে এই বাজেটেও আধিপত্য থাকবে ক্ষমতার ত্রিভুজের যার একটি বাহু অসৎ আমলা, অপর বাহুটি অসৎ ব্যবসায়ী এবং সর্বশেষ বাহুটি অসৎ রাজনীতিবিদ। এই ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামোকে উদ্ঘাটিত করে ভাঙতে হবে।

সুতরাং এই বাজেটে শুধু সঠিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, দরকার অসততা-লুটপাট-কুশাসনের অবসানের। সে জন্য চাই জনগণের সংগ্রাম। যেখানেই অন্যায়, যেখানেই লুটপাট, যেখানেই কুশাসন সেখানেই জনগণকে প্রতিরোধ ও সংগ্রামের ঝাণ্ডা তুলে ধরতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.