কমিউনিস্ট ঐক্য জোরদার করুন

(বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) থেকে পদত্যাগকারী ৭ কেন্দ্রীয় নেতার বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাথে একীভূত অনুষ্ঠানের যুক্ত ঘোষণা) 

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, দেশের বুর্জোয়া নেতৃত্বের কারণে সে স্বপ্ন সফল হতে পারেনি। আমরা দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা গণভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ ও উপযুক্ত বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারিনি। দেশ আজ সর্বগ্রাসী সঙ্কটে নিমজ্জিত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেশ সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদ ও ধনবাদই হচ্ছে দেশ ও জাতির জীবনে সঙ্কটের মূল কারণ। মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ তথা সাম্যবাদের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য সমাজতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষের নেতৃত্বেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের স্তর এবং শ্রমিকশ্রেণির ও তার রাজনৈতিক সংগঠনের রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত পরিপক্বতার মাত্রা বিবেচনায়, এক লাফে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আগে প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের জন্য পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের  জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পূর্বশর্ত সৃষ্টি করা। তার জন্য প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করা। সেজন্য সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ এবং এদের সহযোগী আমলা-মুৎসুদ্দি, পুঁজির মালিক, লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী এবং গ্রামাঞ্চলে পরগাছা কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীসহ মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে একটি সমাজ-বিপ্লবের মাধ্যমে পরাজিত করে, সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী ও সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা ধনিকশ্রেণিকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে, নতুন ধরনের বিপ্লবী রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কমিউনিস্ট, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির মোর্চা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। একেই আমরা বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বলছি।

সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থা থেকে ভিন্ন এবং উন্নততম একটি বিপ্লবী পর্ব। এটি পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মাঝামাঝি কোনো সমাজব্যবস্থা নয়, এটি একটি অন্তর্বর্তীতীকালীন গতিশীল পর্যায় বা বিপ্লবী প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া সনাতন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গন্ডিকে অতিক্রম করে একাধারে বুর্জোয়া বিকাশের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পাদন করবে, অন্যদিকে একই সাথে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে অগ্রসর হবে। বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে শহরের শ্রমিকশ্রেণি ও গ্রামের ক্ষেতমজুর অগ্রগামী (ভ্যানগার্ড)-এর ভূমিকা পালন করবে এবং সেজন্য তাদের যথেষ্ট পরিমাণে শ্রেণি সচেতন ও সংগঠিত করা প্রয়োজন, যে দায়িত্ব প্রধানত কমিউনিস্ট পার্টিকেই নিতে হবে। শ্রমিকশ্রেণি, ক্ষেতমজুর ও মেহনতি কৃষকের ঐক্য, সংগঠন ও বিপ্লবী জাগরণ ছাড়া বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব নয়, কারণ শ্রমিক-ক্ষেতমজুর ও মেহনতি কৃষকের জোটই বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করবে। এই জোটে টানতে হবে বিভিন্ন স্তরের পেটিবুর্জোয়াকে। ক্ষুদে ও মাঝারি বুর্জোয়া এবং সাধারণভাবে জাতীয় বুর্জোয়ার ধারায় বিকাশমান বুর্জোয়া শ্রেণি নানা দোদুল্যমানতাসহ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে অবদান রাখার সম্ভাবনা বহন করে। তাদেরকে স্বপক্ষে রাখার জন্য এবং ন্যূনপক্ষে নিরপেক্ষ রাখার জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের কাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি এবং কমিউনিস্ট ঐক্য আজ একটি বিশেষ জরুরি কর্তব্য হিসাবে উপস্থিত। অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতে যে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল, আমরা তারই ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য বহন করছি। গত শতাব্দীর বিশের দশকে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে গঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। গোটা পাকিস্তান ভিত্তিতে কখনই সেভাবে সক্রিয় হতে না পারলেও পূর্ব পাকিস্তানে এই পার্টি তীব্র দমননীতির মধ্যেও গণতন্ত্র, জাতীয় অধিকার গণমানুষের রুটি-রুজির অধিকারের জন্য বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করেছে। অনেক কমিউনিস্ট বুকের রক্ত ঢেলেছে, শত শত কমরেড বছরের পর বছর জেল খেটেছে, তীব্র অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত বিতর্কের প্রভাবে পার্টিতে বিভক্তি এসেছিল। পরে বহুধাবিভক্তি ঘটেছিল। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম ও  বাংলাদেশের স্বাধিকারের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। গণতন্ত্র, শ্রেণি-শোষণমুক্ত অর্থনীতি ও সমাজ প্রগতির প্রতিটি সংগ্রামে কমিউনিস্টদের বিশাল ভূমিকা ছিল এবং আছে। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, নারী, আদিবাসী, সাংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রের আন্দোলনে কমিউনিস্টরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কমিউনিস্টরাই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার পক্ষে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে কমিউনিস্টরাই।

এই সকল কৃতিত্বের পেছনে যেমন একদা ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির, তেমনি পরবর্তীতে কমিউনিস্টদের বিভিন্ন অংশেও কমবেশি অবদান ছিল। তবে একইসঙ্গে ভুলও যে আমাদের ছিল তা অকপটে স্বীকার করতে হবে। একদিকে দক্ষিণপন্থি বিলোপবাদী প্রবণতা, আত্মশক্তির উপর আস্থা না রেখে বুর্জোয়ার উপর নির্ভরশীলতা, অপরদিকে বাম হঠকারিতা, সংকীর্ণতা এবং বামের নামে কার্যত দক্ষিণপন্থি ঝোঁক শুধু যে কমিউনিস্ট ঐতিহ্যকে ম্লান করেছে তাই-ই নয়, এই সকল কারণে এবং বিভিন্ন ধরনের তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি ও প্রায়োগিক ত্রুটি কমিউনিস্ট শক্তিকে দুর্বল করেছে। জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা ব্যর্থ হয়েছিল।

বিশ্ব পরিস্থিতিও ক্রমাগত সংঘাতময় হয়ে উঠছে। একদিকে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী, আর অপরদিকে বিশ্বপুঁজিবাদ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে জনগণের বিপুল বিজয় শোষন মুক্তির সংগ্রামে নতুন শক্তি যোগ করেছে। বিশ্ব পরিসরে সমাজতন্ত্রের জন্য বস্তুগত অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) থেকে পদত্যাগকারী ৭ কেন্দ্রীয় নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাথে একীভূত হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং সেই ভিত্তিতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ঘোষনা দিচ্ছি ।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-প্রলিতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টিতে একীভূত হয়ে আমরা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের লক্ষ্যে এবং নিপীড়িত জাতি ও জনগোষ্ঠীর সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ও অবদান রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করছি। এই যুক্ত ঘোষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি’র সাথে একীভবনের এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই একীভূত পার্টি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নামেই পরিচিত হবে এবং  ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত দলিলসমূহ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তসমূহ কার্যকর থাকবে এবং সেসব দলিল ও সিদ্ধান্তসমূহ অনুসরণ করে কাজকর্ম পরিচালনা করা হবে।

এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত পর্যালোচনাও জরুরি। এ নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ পার্টির ভিতরেই প্রলেতারীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা অব্যাহত রেখে সিদ্ধান্তে আসার প্রয়াস গ্রহণ করবো।

কমিউনিস্ট ঐক্যের তাগিদ অনেকদিন থেকেই অনুভূত হচ্ছিল। দেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে সেখানে কমিউনিস্ট ও বামপন্থি শক্তি উদ্যোগ ও নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে অগ্রসর হওয়ার সম্ভব নয়। সেজন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে আরও শক্তিশালী, গণভিত্তিক, সংগ্রামী ও বিপ্লবী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম মেহনতি জনগণের আস্থাভাজন দল হিসাবে গড়ে তোলাটা খুবই জরুরি। সে কারণে কমিউনিস্টদের এক হওয়া প্রয়োজন। এটি আজ সময়ের দাবি।

কমিউনিস্ট ঐক্যের যে তাগিদ তা এই একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে আমরা মনে করি না। বলা যেতে পারে, ঐক্যের প্রক্রিয়া এক ধাপ অগ্রসর হলো। আমরা অন্যান্য সকল কমিউনিস্ট পার্টি ও সকল কমিউনিস্টকে কমিউনিস্ট ঐক্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় সামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এবং সে ব্যাপারেও আমাদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

দুনিয়ার মজদুর এক হও!

Leave a Reply

Your email address will not be published.