কমিউনিস্টরা কেন গণতন্ত্রের সংগ্রাম করবে

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ

[লেখাটি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড সৈয়স আবু জাফর আহমেদ ‘সাপ্তাহিক একতা’র ০১ নভেম্বর, ২০১৫ সালের সংখ্যায় লিখেছিলেন। -নির্বাহী সম্পাদক।]

দেশে যে গণতন্ত্র নেই কথাটা সবাই স্বীকার করেন। শাসক দল থেকে বিরোধী দল, সকলের বক্তৃতা বিবৃতি থেকে পরিষ্কার দেশে গণতন্ত্র নেই। শাসক দল মনে করে আগে উন্নয়ন হোক তারপর গণতন্ত্রের কথা ভাবা যেতে পারে। বিরোধীদল (গৃহপালিত নয়, রাজপথের) তাদের ভাষায় ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের(!)’ সংগ্রাম জারি রেখেছেন। এই সংগ্রাম উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে থেমে থেমে চলছে মাঝে মাঝে তা হিংস্র ও রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে।

বর্তমান আওয়ামী লীগ অথবা মহাজোট ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ৯ম সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও গণবিরোধী নীতিতে দেশ শাসনের ফলে দ্রুত জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তা বুঝতে পারেন। কিন্তু তারা তাদের ত্রুটি, দুর্বলতা দূর করে দলীয় নেতা কর্মীদের লুটপাটে রাশ টেনে না ধরে পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে পথ বেছে নিলেন সেই পথই দেশের রাজনীতির জন্য ভয়াবহ। তারা কৌশল নিলেন বিরোধীদলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে আবার ক্ষমতায় যাওয়া। তাদের এই কাজের পক্ষে যুক্তি দেখালেন গণতন্ত্র (সবাইকে নিয়ে নির্বাচন) দিলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি হেরে যাবে। তাই গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধ একসাথে চলে না। কথাটা আংশিক সত্য। পাকিস্তান আমলে এদেশের মানুষের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম, স্বাধিকারের সংগ্রামের পথ ধরে এক সময় গোটা জাতি মুক্তিযুদ্ধের মোহনায় উপনীত হয়েছিল। তাই গণতন্ত্র বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একথা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের লুটপাট, দুর্নীতি ও ব্যর্থতাকে পুঁজি করে বিএনপি ও তার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় আসার আশংকা তৈরি হয়েছিল। এই আশংকা ঠেকাতে একতরফা নির্বাচন করতে গিয়ে সরকারের জন্য বল প্রয়োগ জরুরি হয়ে ওঠে। একদিকে গণবিচ্ছিন্নতা অন্য দিকে ভ্রান্ত কৌশল বাস্তবায়ন করতে সরকারের মধ্যে ক্রমেই ফ্যাসীবাদী প্রবণতা বাড়তে থাকে। সরকার ক্রমেই বাহিনী নির্ভর হয়ে পড়ে। যে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে অতীত ঐতিহ্য ছিল তা হারিয়ে ফেলল।

এই বাহিনী নির্ভর রাজনীতি একটা দলের জন্য শেষ পর্যন্ত বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যারা একটা দলকে ক্ষমতায় বসাতে পারে, ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে তারা তাদের চোখ উল্টে ফেলতে মূহুর্ত মাত্র সময় লাগবে। তাদের এই কাজের পেছনে কোনো আদর্শের প্রণোদনা নেই- আছে মাল-কড়ি কামানোর বাসনা। এর প্রয়োজনে তারা তাদের প্রয়োজনে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। এই জায়গাটায়ই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রকৃত বিপদ।

দেশবাসীর সামনে আজ জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ অন্যতম প্রধান বিপদ, একইসাথে সাম্রাজ্যবাদী নানা শক্তির ষড়যন্ত্র রয়েছে। এই ষড়যন্ত্র ও বিপদ মোকাবেলা করতে পারে একমাত্র জনগণের সক্রিয়তা। মানুষকে সক্রিয় ও সংগঠিত করতে পারলেই সম্ভব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা। সে পথে না গিয়ে শুধুমাত্র ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করে তার ভিত্তিতে চিৎকার করে লাভ হবে না। দেশের মানুষ আজ সকল বিষয়ে নির্লিপ্ত। কোনো কিছুতেই মানুষের বিশ্বাস নেই। আওয়ামী লীগের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে মানুষ যেমন ক্ষমতার টিকে থাকার হাতিয়ার এবং ‘উন্নয়নকে’ লুটপাটের কৌশল মনে করে ঠিক তেমনি বিএনপির ‘গণতন্ত্রের’ কথা শুনলে মানুষ মনে করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্লোগান। দেশদ্রোহী জামায়তে ইসলামীকে সাথে নিয়ে, আন্দোলনের নামে পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়ে মেরে, রেল লাইন উপড়ে ফেলে আর যাই হোক গণতন্ত্র ‘উদ্ধার’ হয় না। তাই মানুষ সব কিছুতেই একেবারেই নির্লিপ্ত। মানুষের এই নির্লিপ্ততাই ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। এটা কাটাতে হলে চাই দেশে সুস্থ রাজনীতির চর্চা অনেকে বলেন আগে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ নির্মূল করি তারপর ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করার কথা ভাবা যাবে। এ বিবেচনা খুবই ভ্রান্ত। কারণ জঙ্গিবাদ মৌলবাদের উৎস হচ্ছে শোষণ-বঞ্চনা-অসাম্য-পশ্চাদপদতা ও গণতন্ত্রহীনতা। জামাত-শিবিরের উপদ্রব দমন করার জন্য আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করতে পারে কিন্তু এটা যখন স্থায়ী রূপ নেয়, ছাত্রদের মিছিলে ব্যাপক হামলা হয়, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করলে লাঠি চার্জ ও গুলি  বর্ষণ হয়, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের ওপর হামলা হয় তখন আর বল প্রয়োগের বিষয়টা আপৎকালীন থাকে না। মানুষের কাছে রাষ্ট্রের আসল চরিত্র উদ্ঘটিত হয়ে পড়ে। এই অধিকারহীন অসহায় বিপন্ন মানুষকে দিয়ে কিভাবে ‘ষড়যন্ত্র’ মোকাবেলা করা যাবে? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

আমাদের কিছু বন্ধুরা বলেন, তোমরা বামপন্থীরা গণতন্ত্র নিয়ে এত হৈ চৈ করে লাভ কী। ভোট হলে তোমরা কী একটা আসনেও জিততে পারবে? তারা উপদেশ দিয়ে বলেন, আগে দল বড় কর তারপর গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম কর। তাদের কথার জবাবে ভ. ই. লেনিনকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। লেনিন বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের বিপ্øবী কর্তব্য শীর্ষক একটি নিবন্ধে লিখেছেন, “The social Democrat Party, as the conscious exponent of the working class movement, aims at the complete liberation of the tolling masses from every form of oppressions and exploitation…. a broad free and open class struggle and the political education, training and rallying of the masses of the proletariat are unconceivable with out political freedom. Therefore it has always been aim of the class conscious proletariat to wage a determined struggle for complete political freedom and democratic revolution.”

[মেহনতি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ নির্যাতনের হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত শ্রমিকশ্রেণির সচেতন প্রতিনিধি হিসেবে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির পক্ষে একটি ব্যাপক স্বাধীন ও খোলামেলা শ্রেণি সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক শিক্ষা-দিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং ব্যাপক সর্বহারা জনগণকে সংগঠিত করার কাজ পূর্ব রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া চিন্তা করা যায় না। – অনুবাদ লেখকের]

একই নিবন্ধে লেনিন বলেছেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা আইনের সংগ্রাম শুধু মাত্র শ্রমিক শ্রেণির কাজ নয়। এই সংগ্রামে বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের মধ্যে থেকে আগত বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেছেন গণতন্ত্রের সংগ্রামে তারা তাদের ভীরুতা, অসামঞ্জস্য পূর্ণতা (inconsistency) ও দুদোল্যমানতার জন্য পরিচিত এক কথায় সকল শ্রেণিকে মুক্ত করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারীর ভূমিকা পালনের ভেতর দিয়েই কম্যুনিস্টদের অগ্রবাহিনীর  ভূমিকা পালন করতে হবে।

গণতন্ত্রের বহুমাত্রিক দিক তথা অর্থনৈতিক সামাজিক, রাজনৈতিক দিক রয়েছে। আমরা সামগ্রিকতায় গণতন্ত্রের সংগ্রাম করব। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, ইত্যাদির জন্য সংগ্রাম অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে করব। একই সাথে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথাও বলতে হবে। অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা চালু না থাকলে শেষ বিচারে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, ও প্রতিক্রিয়ার হাত শক্তিশালী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.