কমরেড চন্দন ঘোষ: জীবন ও সংগ্রাম

কাফি সরকার

কমরেড চন্দন ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছু সময় পূর্বে ৫ মে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। মৃত্যুবরণ করেন ১৯ আগস্ট ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর বাবা গিবিন্দ্র নাথ ঘোষ ও মা সুষমা রানী ঘোষ। বাবা-মা দুজনেই এখন আর বেঁচে নেই। কমরেড চন্দন ঘোষ বাবা-মা’র পঞ্চম সন্তান। তাঁরা ছিলেন ছয় ভাই এক বোন। বোন গীতা রানী বিশ্বাস ছিলেন বাবা-মা’র দ্বিতীয় সন্তান। তিনিও এখন আর বেঁচে নেই। চন্দন ঘোষের বড় ভাই কানু ঘোষ রংপুরেই লেখাপড়া করেন, পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেই সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়েকে বিয়ে করেন। যতদূর জানা যায় তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। কমরেড চন্দন ঘোষ রংপুরেই বসবাস করেন তাঁর বাবা-মা’র সাথে রংপুরের ধাপ এলাকায় বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক রংপুর অফিসের প্রধান ফটকের উল্টো দিকে। তাঁর ভাই দীপক ঘোষ ও রজৎ ঘোষও বহুকাল পূর্বেই মারা গেছেন। বর্তমানে জীবিত আছেন গৌতম ঘোষ ও কুন্তল ঘোষ।

কমরেড চন্দন ঘোষের বাবা-মা তাঁরা দুজনেই ছিলেন প্রগতিশীল সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাঁরা দুজনেই নাটকে অভিনয় করতেন। বাবা গিবিন্দ্র নাথ ঘোষ যিনি গিরিন ঘোষ বলে সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজে নাটক লিখতেন, নির্দেশনা দিতেন এবং নিজেই সেই নাটকে অভিনয়ও করতেন। তুলসী লাহিড়ির সাথে তিনি বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেছেন। যেমন- নবাব সিরাজউদ্দৌলা, টিপু সুলতান, ছোঁড়াতার’সহ আরও অনেক। চন্দন ঘোষের মা সুষমা রানী ঘোষ ছিলেন মিশুক মানুষ, তিনি সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। তিনি নিজে বাজার করতেন এবং নিজেই রান্না করে ঐ সময় তাঁদের বাড়িতে যেসব মানুষ যাতায়াত করতেন তাঁদের যত্ন করে খাওয়াতেন। তাঁদের বাড়িটা ছিল একটি উন্নত সাংস্কৃতিক আবহ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন বাড়ি।

এই উন্নত সাংস্কৃতিক আবহ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশেই কমরেড চন্দন ঘোষ বেড়ে উঠেছেন। তিনি যখন স্কুলের ছাত্র তখন তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন নীলফামারীর কমরেড আমজাদ হোসেন, বদরগঞ্জের কমরেড জিতেন দত্ত, শ্যামপুরের কমরেড ছয়ের উদ্দিন, শঠিবাড়ীর ডাবরার কমরেড মহির প্রধান, রংপুরের কমরেড মনিকৃষ্ণ সেন, শংকর বসু ও কমরেড শাহাদত হোসেন। তাঁদের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল রংপুরের প্রবীন রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আফজালের। মোহাম্মদ আফজালের পরিবারের সাথে ছিল তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁদের বাড়িতে এই মানুষগুলির যাতায়াতে কমরেড চন্দন ঘোষের মানস চেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, ফলে তিনি স্কুলের ছাত্রাবস্থাতেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িতে পড়েন এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতা গঙ্গাচড়ার নজরুল ভাইয়ের সাথে সবসময় থাকতেন। তাঁরা চেষ্টা করতেন ছাত্র ইউনিয়নের ব্যানারে শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার। কমরেড চন্দন ঘোষ নিজে কোনো বড় সংগঠক ছিলেন না। কিন্তু তিনি কখনোই ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে ছিলেন না। তিনি ছাত্রাবস্থাতেই স্বপ্ন দেখতেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। তিনি বিশ্বাস করতেন এদেশে অবশ্যই সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ সকল রকম শোষণের হাত থেকে মুক্তি লাভ করবে। পরবর্তীতে কমরেড চন্দন ঘোষ যুবলীগের সাথে যুক্ত হন এবং পীরগঞ্জের যুবনেতা কাজী আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে ৬০ এর দশকে রংপুর অঞ্চলে শক্তিশালী যুব আন্দোলন গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখেন। তখন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন বরিশালের ইমাদুল্লা।

কমরেড চন্দন ঘোষ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। পার্টি সদস্যপদ লাভের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য ও আদর্শে বিশ্বাস করতেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করতেন। কমরেড চন্দন ঘোষ মূলত: ছিলেন কৃষক নেতা। কমরেড ছয়ের উদ্দিন ও অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামানের নেতৃত্বে রংপুর অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষক আন্দোলনে ভূমিকা রাখা তাঁর জন্য সহজ হয়েছিল, কারণ তিনি সহজেই গ্রামের কৃষক পরিবারগুলির সাথে মিশে যেতে পারতেন। তিনি রংপুর অঞ্চলে ক্ষেতমজুর আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পার্টি সদস্যপদ লাভের পর থেকে ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পার্টিতে সংগঠক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর বিলোপবাদীদের কবল থেকে রংপুরের কমিউনিস্ট পার্টিকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন এবং বুক চিতিয়ে কমরেড ছয়ের উদ্দিনের নেতৃত্বে বিলোপবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে রংপুরের পার্টিকে রক্ষা করেছিলেন। এটিই ছিল চন্দন ঘোষের একজন কমিউনিস্ট হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

পরবর্তীতে কমরেড চন্দন ঘোষ কমিউনিস্ট পার্টির রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কমরেড ছয়ের উদ্দিন সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁরা দুজনে মিলে অন্যদেও সাথে নিয়ে রংপুরে কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেন। মাঝখানে একটি টার্ম বাদ দিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি জেলা পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.