কবি শঙ্খ ঘোষ প্রয়াত; সর্বত্র শোকের ছায়া

প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ প্রয়াত হয়েছেন।

কারও কাছে অভিভাবকসম, কারও কাছে অগ্রজের সমান কবি শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের এক মহীরুহের শিকড় উপড়ে গেল যেন। শব্দের জগতে ঘটে গেল ছন্দপতন।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজ (২১ এপ্রিল) বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কলকাতার নিজের বাসায় ৮৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

প্রসঙ্গত কবি বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালেও ছিলেন কয়েক দিন। বাসায় ফিরে চিকিৎসার মধ্যেই ছিলেন। গত ১৪ এপ্রিল বিকেলে তিনি করোনায় আক্রান্ত হন।

কবি শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যজগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তাঁর মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তাঁদের কথা, দেশ আজ এক মহান কবিকে হারাল।

এদিকে শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে কলকাতার প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলা সাহিত্যে এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। নবীন ও তরুণদের তিনি ছিলেন আদর্শ। ছিলেন খুব সহজ ও সরল প্রকৃতির এক মানুষ। কবি সুবোধ সরকার বলেছেন, বাংলা সাহিত্য শঙ্খ ঘোষের কাছে চিরঋণী হয়ে রইল। বাংলা কবিতাকে তিনি উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

সংগীতশিল্পী কবির সুমন বলেছেন, ‘রাজ্যের প্রথিতযশারা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন। এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি। আমাদের বাংলা সাহিত্যের এক নক্ষত্রের পতন হলো আজ।’

নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘শঙ্খ ঘোষ ছিলেন এক বিরাট মাপের উঁচুমানের এক কবি। আমাদের ভরসা দেওয়ার এক মানুষ। আমরা তাঁর অভাব অনুভব করব আমাদের প্রতিটি কাজে। প্রতিটি চিন্তায়।’

নাট্যকার ব্রাত্য বসু বলেছেন, একটা যুগের অবসান হলো। কবি শঙ্খ ঘোষ মানেই একটা স্বতন্ত্র যুগ। যত দিন বাঙালি থাকবে, তত দিন তাঁর সৃষ্টি অমর হয়ে থাকবে।

নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী শঙ্খ ঘোষকে ‘বাঙালিদের একজন অভিভাবক’ বলে আখ্যায়িত করেন। বিভাস বলেন, ‘তাঁর শূন্যতায় আমরা আমাদের অভিভাবক হারালাম।’

নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন বলেছেন, কবি শঙ্খ ঘোষ শাসকের বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলতেন, সাহস জোগাতেন।

কবি জয় গোস্বামী বলেছেন, ‘কবি শঙ্খ ঘোষ ছিলেন জাতির বিবেক। আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’

শঙ্খ ঘোষের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

জন্ম অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে, ১৯৩২ সালে।

আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর।

পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন অধ্যাপনাকেই। পড়িয়েছেন কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৬৭ সালে আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দেন। পরে পড়িয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বহু পুরস্কারে সম্মানিত। ১৯৭৭-এ ‘মূর্খ বড়, সামাজিক নয়’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নরসিংহ দাস পুরস্কার, ওই বছরই ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান শঙ্খবাবু।

১৯৮৯ সালে ‘ধুম লেগেছে হৃদকমলে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’-এর জন্য সরস্বতী পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।

১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম সম্মানে এবং ২০১১-য় ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত।

কবিতার পাশাপাশি রবীন্দ্রচর্চাতেও প্রসিদ্ধি। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। প্রাবন্ধিক হিসেবেও সুবিদিত। ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.