এ প্রশ্নের জবাব চাই

অধ্যাপক কাবেরী গায়েন

সবাই বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের মুক্তি চাইছেন। ভালো কথা। আমি সরকারের কাছে জানতে চাই, কোন দোষে হৃদয় মন্ডলকে সরকার আটক করেছে?

একজন বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে বিজ্ঞানের দর্শন ঠিকমত জানা এবং শিক্ষার্থীদের আগে থেকে শিখে আসা প্রশ্নের মুখেও একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে তাঁর চর্চিত বিষয় সম্পর্কে অবিচলভাবে উত্তর দেয়াই কি তাঁর অপরাধ? এমনকি সরকারের কাছে? রাষ্ট্রের কাছে? এই উত্তর না আদায় করে প্রোফাইল ছবি রঙ্গিন করে কোনো লাভ নেই। আসুন, আমরা ঠিক প্রশ্নটা করতে শিখি। এই ফেসবুকেই আমার প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি।

১। সরকার কোন দোষে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলকে গ্রেফতার করেছে?

২। শিখিয়ে-পড়িয়ে আনা শিক্ষার্থীদের দিয়ে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন করিয়ে, সেই প্রশ্নোত্তর রেকর্ড করে চুরি করিয়ে শিক্ষার্থীদের দিয়ে এহেন অপকর্ম করানোর মাস্টারমাইন্ডদের ধরার বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

৩। শিক্ষার্থীদের সাথে হৃদয় মন্ডলের পুরো আলোচনাটুকু পড়লাম। বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা এবং সেই বিষয়টি শান্তভাবে বলার ক্ষমতা দেখে ভেতরে হাহাকার জেগেছে। তিনি বিজ্ঞানের সারকথা যেভাবে বুঝেছেন, এই বোধ যদি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি স্কুলের অন্তত একজন বিজ্ঞান শিক্ষকের থাকতো তবে এমন সব শিক্ষার্থীদের অশিক্ষাজাত মিছিল দেখতে হত না। প্রত্যেক সরকারি স্কুলে এমন একজন করে শিক্ষক কেনো নেই?

“ত্রাণ চাই না, নিরাপত্তা চাই”- লিখেছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনোত্তর সহিংসতার পরে দিনাজপুরের কর্ণেই-এর নির্যাতিত প্রান্তিক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাদা কাগজের ওপর আঁকাবাঁকা অক্ষরে। বুকে বেঁধেছিল খুব সেই লেখা। রাষ্ট্র সেই অনুরোধ রাখেনি। যতবার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়েছে প্রতিবার ত্রাণ পাঠানো হয়েছে, কখনোই সংশ্লিষ্টদের বিচার হয়নি। হয়নি বলেই এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়েছে, জীবনের প্রতিপদে সবাইকে বুঝতে হচ্ছে এবং হবে। জানি এ কথা শোনার কান এই বধির রাষ্ট্রের নেই।

তবুও এই রাষ্ট্রের একজন বেতনভুক শিক্ষক হিসেবে আমি এই শিক্ষককে গ্রেফতারের কারণ জানতে চাই। সরকারের হিম্মত থাকলে সেই জবাব দেবে নিশ্চয়ই। না হলে, আমিও শঙ্কিত পড়ানোতে। আমি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একজন শিক্ষক। সমাজের নানা বিষয়ে পড়াতে হয়। প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে শেখানো আমার কাজ। ‘নিরঙ্কুশ সত্য’ নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা সামাজিক পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে পারি না। এই জাতীয় ঘটনার পরে সরকারের তরফ থেকে যদি অন্যায়ের শিকার শিক্ষককেই গ্রেফতার করা হয়, তবে কোন ভরসায় আমি ক্লাসে যাবো? কাজেই হৃদয় মন্ডলকে কেনো গ্রেফতার করা হলো, এই প্রশ্নের পরিষ্কার জবাবটা আমার চাই। প্রশ্ন না করতে করতে তো এখানে এসে দাঁড়িয়েছি সবাই মিলে। সামাজিক কোনো সূত্রকে নির্মোহভাবে আলোচনা করতে গেলে আমার দুই গালে তালে তালে জুতা মারার মিছিল হবে না, এবং সেই মিছিলের সূত্রে আমাকে রাষ্ট্র গ্রেফতার করবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? আমি কি তবে চাকরি ছেড়ে দেবো গ্রেফতার এড়ানো এবং জীবন বাঁচানোর স্বার্থে? সম্মানের কথা বাদই থাক।

আমার এই প্রশ্ন কোনো রেটোরিক নয়। আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন। যেসব শিক্ষক চুপ করে আছেন, সেটা তাদের অভিরুচি। আমার কাছে এটা শিক্ষক হিসেবে ফের নিঃসংশয়ে ক্লাসে যাবার জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন। উত্তর পাওয়াও জরুরি। নাহলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পান-বিড়ির ব্যবসা করা, বা চা-এর দোকান দেয়াটা অধিকতর নিরাপদ কেনো মনে করবো না?

লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.