এ কোন দেশ?

আমাদের দেশে এখন চারিদিকে অহরহ গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজবের কারণে সাধারণ মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গুজব রটিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ পিটিয়ে মারছে মানুষকেই। আর সেখানে একজন-দুজন নয় সবাই যেন সংঘবদ্ধ। এসব নৃশংস ঘটনার গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। একজন মানুষের মধ্যে থাকা উচিত মানবিক মূল্যবোধ, কিন্তু এদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে ধর্মীয় মতান্ধতা। এদের কি কোনো মানবিকতা নেই? এ কোন দেশে আছি আমরা? ধর্মানুভূতি কোনো একটা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়। সব ধর্মের মানুষের ধর্মানুভূতি রক্ষা করা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের অবশ্য কর্তব্য।

মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, ক্রোধ, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যমূলক সমাজ একদিনে তৈরি হয়নি। ধর্মভিত্তিক ভূখণ্ড সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আজকের এ অস্থির সমাজের জন্ম। এই অস্থিরতা থেকে যদি বেরিয়ে আসতে হয় তবে সন্তানদের বিজ্ঞান আর বিবর্তনের শিক্ষা দিতে হবে। আগামী প্রজন্মকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ধর্মানুভূতির নামে মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে দূরে রাখার কুফল কী, লালমনিরহাটের ঘটনা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করে যেসব বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চালানো হচ্ছে, তা নানাভাবে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো, ভেদাভেদ সৃষ্টি করা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে রাজনীতিকরণের যে প্রক্রিয়া দেশে চলে আসছে অতি সহজেই তা বন্ধ করা যাবে না। মূলত ধর্মকে রাজনীতিকরণের এ প্রক্রিয়াটি বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ, যা কিনা স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্নভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গত এক দশকে খুবই সুপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিদ্বেষপূর্ণ ধর্মীয় মনোভাব থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে পারে কেবল রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ আর জবাবদিহিতার চর্চা। গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় স্বাধীনতার অপব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক প্রচারণা যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধ করে না দেয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ রকম আরও নৃশংস ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে।

কয়েক বছরে বাংলাদেশে গুজবনির্ভর বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ফেসবুকে বানোয়াট খবর প্রচার করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোনো ঘটনায় কি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে? বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলা হয়। গণতন্ত্রের চর্চা না থাকা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুচিন্তিত মতপ্রকাশে বাধা প্রদান করা, প্রগতিশীল চর্চা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে বাধাগ্রস্ত করা, পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেশকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তমনা, প্রগতিশীল চিন্তাধারার ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ দেশের কিছু মানুষের মাঝে উগ্রবাদী মূল্যবোধের জন্ম দিচ্ছে।

ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে লালমনিরহাটে একদল মানুষ পৈশাচিক উন্মত্ততায় যেভাবে বর্বর ও বিভৎস হামলা চালিয়েছে, তা সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। লালমনিরহাটের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের উন্মত্ততার ধারাবাহিকতার অংশ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। সরকার আক্রান্ত মানুষকে রক্ষা না করে, মৌলবাদী শক্তিকে ইন্ধন জুগিয়েছে। সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে পরিকল্পিতভাবে দেশে মৌলবাদের প্রসার ঘটানো হচ্ছে। বাক্, ব্যক্তি, বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইকে বেগবান করার পাশাপাশি ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রদায়িক উসকানি, উগ্রতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ বাঁচিয়ে রাখতে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়াকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে।