এ কেমন অমানিশা!

মীর মোশাররফ হোসেন

ইউরোপে একটা যুদ্ধ লেগে আছে। রাশিয়াকে বাগে পেতে সাম্রাজ্যবাদীরা তৎপর। কোনোরকমে সুযোগ করে উঠতে পারলেই ভেতরে ঢুকে পড়ার জন্য তৈরি তারা। ফাঁদ পাততে সময় নিয়েছে তারা এক দশক। চারপাশে সবাইকে ন্যাটোর সদস্য বানিয়ে বসিয়ে রেখেছে অস্ত্র, সেনা। কেবল ইউক্রেইন হলেই হতো। কিন্তু সাদা ভাল্লুক গর্জে উঠেছে। মরণকামড় দেওয়াই লাগতো তার। তাতেই সারা দুনিয়া টালমাটাল। বেশি টালমাটাল ইঙ্গ-মার্কিনিরা। ইউরোপ পুড়লেও তাদের আলুপোড়া খেতেই হবে।

নিজেদের মিডিয়া, সোশাল মিডিয়া, স্যাটেলাইট কোম্পানি সবাইকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে; চলছে একের পর এক সাইবার আক্রমণ। ‘ক্যানসেল রাশিয়া’ পলিসি এমনভাবে চলছে যেন মস্কোর ওপর ইউরোপের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপে খুব শিগগিরই যে মন্দা নেমে আসবে তার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমে যাওয়া যাবে। কেবল তারাই নয়, তাদের এশিয়ার চেলা-চামুন্ডারাও সূর্যের চেয়ে বালি গরমের মতো তপ্ত। তক্কে তক্কে আছে। কখন রাশিয়াকে খুবলে খাওয়া যাবে। এরপর বাকি থাকবে চীন। সেটাকেও ঘিরে ধরে এবং পরে কাবু করে দুনিয়াকে তাদেও জিম্মায় নিয়ে নিলেই তো হল। সাদা চামড়ার প্রভুত্ব, ইউরোপীয় প্রভুত্ব আর কে ঠেকাবে? এই জোরের সঙ্গে আর কে রুখে দাঁড়াবে?

ধুন্ধুমার অবস্থা। বিশ্বজুড়ে নানান খেলা চলছে। রেজিম চেইঞ্জ। ফলস ফ্ল্যাগ। জাতিসংঘে ভোট…কত কী? দুশ্চিন্তা বাড়ছে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি নিয়ে। নানান প্রতিষ্ঠান সতর্ক করছে। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছেন বেগুনির বদলে কুমড়ো দিয়ে কুমড়োনি খেতে। কী নিদারুণ তামাশা চলছে। এই তামাশা কী সেচের পানির অভাবে আত্মহত্যা করা দুই কৃষকের মৃতদেহের সঙ্গে হয়নি? তামাশা কী হয়নি খুলনার ছাত্র অন্তুর সঙ্গে, অভাবের সঙ্গে না পেরে যাকে গলায় দড়ি দিয়ে জ্বালা মেটাতে হয়েছে? বেগুনি না পেয়ে কুমড়ো, তেল কম খাওয়ার এসব বক্তব্য তো সরকারপ্রধান একদিন করেননি, করেই যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন। আর রিকশা ফেরত না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হচ্ছে নাজমুল কাজীদের।

মানুষ পথে না নেমে এলে, পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা না বদলে ফেললে এ অমানিশার কাল কাটবে না। চলুন, শুধু ঘটনা আর সংখ্যা টুকে রাখি-

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘটু গ্রামের কৃষক অভিনাথ মার্ডি ও তার চাচাতো ভাই রবি মার্ডি। জমির জন্য সেচের পানির জন্য ১২ দিন ধরে চেষ্টা করে গেছেন তারা, কিন্তু পাম্প অপারেটরের মন গলেনি। শেষে ‘সেচের পানি না পেয়ে’ সাঁওতালি দুই কৃষক বিষপানে আত্মহত্যা করেন। পুলিশ প্রথমে ‘সাদা কাগজে’ অভিনাথের স্ত্রী রোজিনা হেমরমের স্বাক্ষর নিয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করে। পরে চাপে পড়ে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা নেয়।

অভিযুক্ত ধরা পড়েছে। তদন্ত হচ্ছে। ভাগ্যিস, গণমাধ্যমের চোখে পড়েছিল। দেশজুড়ে রব উঠেছিল। নাহলে একে কৃষক, তায় আদিবাসী, তাদের মৃত্যু নিয়ে পুলিশ আর রাষ্ট্রের ভাবতে বয়েই গেছিল। কিন্তু এই ঘটনা সম্ভবত চোখে আঙুল দিয়ে এটাই দেখাচ্ছে যে. আমাদের অর্থনীতি যাদের শ্রমে ঘামে পুষ্ট হয়, আমাদের পেট ভরায় যারা, সেই কৃষকদের প্রতি আমদের রাষ্ট্রের কী নিদারুণ অবজ্ঞা।

অন্তু ছিল মেধাবী। কুয়েটের ড. এম এ রশিদ হলের শিক্ষার্থী হলেও আবাসন স্বল্পতার কারণে থাকতেন হলের বাইরে নিজ ব্যবস্থাপনায়। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে এবং নিজের খরচ মেটাতে একটি টিউশনি করাতেন। কিন্তু গত মাসে সেই টিউশনিটা চলে যায়। এ বিষয়টি নিয়ে অন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অন্যদিকে হলে বাকি ছিল ছয় হাজার ৬৭৫ টাকা। সেজন্য গত রোববার অন্তু মায়ের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়ে ফিরে কুয়েটে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিকেল আবারও বাড়িতে ফেরে। পরের দিন সোমবার সকালে তার বাবা দেবব্রত রায় ও মা মাঠে কাজ করতে যান। সকালে ছোট বোন প্রাইভেট পড়তে যায়। পড়া শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রাইভেট পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে দেখতে পায় ঘরের বাঁশের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে অন্তুর নিথর দেহ।

উন্নয়নের এই নজির সৃষ্টিকারী দেশে অন্তুর মতো শিক্ষার্থীদেরও ধরে রাখতে পারছি না আমরা। উন্নয়ন তার কাছে পৌঁছাল না। অভাব নিয়েই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু ওই যে উন্নয়নের ধাক্কা, তা সামলে উঠতে পারল না।

ছেলেটা রিকশা চালিয়ে খায়। আগেও একবার ওর রিকশা পুলিশ ধরে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করছিল। আরেকদিন রিকশা আটক হলো। কিন্তুজরিমানার টাকা দিতে পারেনি দেখে পুলিশ রিকশাটা থানায় নিয়ে যায়। হাইওয়ে থানার পুলিশ রিকশা আটকের কথা প্রথমে অস্বীকার করে। মূলত উপরি ইনকামের জন্য এই আটক। যার রিকশা আটক সেই নাজমুল তার পরিচিতদেও জানান, ৩ হাজার টাকা লাগবে গাড়ি ছাড়িয়ে আনতে।

নাজমুল সেই টাকা জোগাড় করতে পারেননি। বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। এই সেই রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র, যেখানে সকলের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের। সেই রাষ্ট্র নাজমুলের দায়িত্ব নিতে পারেনি। দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের মতো নাজমুল নিজেই নিজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। রিকশা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তার এই আস্পর্ধা রাষ্ট্রের, তার লুটপাটকারী বাহিনী আর চেলাচামুণ্ডা গোষ্ঠীর সহ্য হবে কেন? তারা বাধ সেধেছে। নাজমুলের শ্রমের সিংহভাগের ভাগ চেয়ে বসেছে। রিকশা আটকে ৩ হাজার টাকা দাবি! ভালো ব্যবসা। এভাবে শত শত রিকশাচালক শ্রমিকের প্রতিদিনের রক্ত পানি করা আয়ে অনেকে পুষ্ট হচ্ছেন, নিজেকে ‘এলিট’ বানাচ্ছেন।

এই ঘটনা একটু অন্যরকম। এক শিক্ষককে নিয়ে। শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল। পুরো ঘটনা বলার দরকার নেই। সম্ভবত এটা এতক্ষণে রাজনীতি সচেতন সকলেরই জানা। আমি কেবল হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা করা বাদীর কথা বলবো।

‘গণিত শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল স্যারকে আমার চাকরিজীবনে ধর্ম নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে শুনিনি। তিনি একজন ভালো শিক্ষক, ’ কথাগুলো ডেইলি স্টারকে বলছিলেন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী মো. আসাদ মিয়াঁ।

আসাদ গত ১০ বছর ধরে ওই স্কুলে ইলেকট্রিশিয়ান পদে কর্মরত আছেন। তিনি বলেছেন, ‘মামলার বাদী হতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন এবং আমি তাতে রাজি হই। তবে আমার সঙ্গে ঘটনার ব্যাপারে স্কুল কর্তৃপক্ষ বা পুলিশ কোনো আলোচনা করেনি। শুধু মামলার বাদী হতে সদর থানায় ডাকা হয়েছিল।’

আসাদ আরও বলেন, ‘আমারও প্রশ্ন আমিই কেন মামলার বাদী? স্কুলে তো আরও অনেক মানুষ ছিলেন।’

তথ্য অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় গত ২২ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধে মামলা করেন আসাদ।

পেনাল কোড ২৯৫ ও ২৯৫ (এ) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা, কথার মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা ও ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অপরাধে এ মামলা হয়।

পুলিশ নিজেই মামলার এজাহার লিখেছে উল্লেখ করে পঞ্চম শ্রেণি পাস আসাদ মিয়াঁ বলেন, ‘পুলিশ মামলার এজাহার লেখার পর প্রধান শিক্ষককে একজন বাদী লাগবে বলে জানায়। তারপর প্রধান শিক্ষক আমাকে ফোন দিয়ে থানায় আসতে বলেন। পরে পুলিশের লেখা এজাহার প্রধান শিক্ষক ও পুলিশ আমাকে পড়ে শোনায়। কিন্তু, এ এজাহার তৈরির আগে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। যেসব কথা এজাহারে লেখা হয়েছে তার ব্যাপারে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।’

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘শিক্ষক হৃদয় মন্ডল কিছুদিন ধরে ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিদ্রূপ ও কটূক্তিমূলক কথাবার্তা বলে আসছেন।’

অথচ মামলার বাদী এ বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।

আসাদ বলেন, ‘যে ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কেও আমি কিছু জানি না।’

আসাদ বলেন, ‘হৃদয় মন্ডল স্যারের যে অডিও রেকর্ড করা হয়েছে সেটি আমি শুনিনি। ছাত্রদের কাছ থেকে মৌখিক বক্তব্য শুনেছি। ক্লাসে শিক্ষক কী কথা বলেছিলেন তা আমি শুনিনি। ছাত্রদের কাছ থেকে শুনেছি। আমি তখন নিচতলায় ছিলাম। ছাত্ররা যখন লিখিত অভিযোগ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে যাচ্ছিল তখন শুনেছিলাম।’

স্কুলে বিক্ষোভের দিন ছাত্রদের পাশাপাশি বহিরাগত অনেকে ছিলেন বলেও জানান আসাদ। বলেন, ‘সেদিন মন্ডল স্যারকে প্রধান শিক্ষক ডেকে এনেছিলেন। প্রধান শিক্ষক তখন বলেছিলেন যদি আপত্তিকর কথা বলে থাকেন, তাহলে ছাত্রদের কাছে মাফ চান। কিন্তু, স্যার এতে রাজি হননি। তিনি ওই মন্তব্য করেননি বলে বলেছিলেন।’

আলোচিত চারটা ঘটনাই বললাম। আশপাশে চোখ রাখলে এরকম নানান কিছু আপনিও দেখতে পাবেন । বুঝতে পারবেন এই রাষ্ট্র পচতে পচতে কতটা ধ্বসে পড়েছে। এটাকে বদলাবে যারা, তাদের জোট কী হচ্ছে? আর কত দেরি? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো বলতেই হচ্ছে- ‘একটু পা চালিয়ে ভাই’; আর কত অপেক্ষায় থাকতে হবে?

লেখক: সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.