এবার বাম জাগছে: কল্পনা নয় সত্যি


সুবক্তগীন সাকী ■

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি হাসান ফেরদৌস গত ০৮ অক্টোবর, ২০১৫, তাদের পত্রিকার ‘খোলা চোখে’র পাতায় ‘বাম জাগছে: সত্যি না কল্পনা’- শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যাতে আমারও খোলা দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে, এবং তাঁর লেখার প্রেক্ষিতে দু’টি কথা না বললেই নয়।

নিবন্ধকার লিখেছেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কয়েক দিনের জন্য নিউইয়র্কে এসে মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়ে, প্রবাসী বাঙালিদের সাথে বার দুয়েক মতবিনিময়ে অংশ নিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সিপিবি এখন দুর্দান্ত অবস্থায় রয়েছে। দেশের প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্বেই তারা। কথাগুলো শুনে কেউ কেউ ঢোঁক গিললে, সেলিম বোঝালেন, চুলায় ভাত রান্না হচ্ছে, সেদ্ধ হলে আপনারা জানতে পারবেন।

কিন্তু প্রকৃত সত্য কথা হলো, সেলিম বলেছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সফরে সস্ত্রীক আমেরিকায় এসেছেন, তাঁর বড় মেয়ের পিএইচডি প্রাপ্তির পর তার সাথে কিছু সময় কাটাতে।

মেয়েটি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে পাশ করার পর উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এসেছিলেন ক’বছর আগে। চাকরি করে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন। তাছাড়া, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কখনোই বলেননি, সিপিবি এখন দুর্দান্ত অবস্থায় রয়েছে। একথা আমি জানি, কারণ আমি সেলিমের সব সভায় ছিলাম ও সব বক্তৃতাগুলো শুনেছি।

সেলিম বলেছেন, পরিবেশ বিদ্বেষী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিমার্ণের বিরুদ্ধে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ, টিক্ফা চুক্তি, ফুলবাড়িয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খনি করার বিরুদ্ধে, গণজাগরণ মঞ্চ, বাসযোগ্য ঢাকা আন্দোলন, কালো টাকা-ঘুষ-দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, নারী অধিকার আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম, সকলের অংশগ্রহণমূলক অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ঘুষ ছাড়া চাকরির নিশ্চয়তা- ইত্যাদি গণমুখি আন্দোলন-সংগ্রামের মূল কৃতিত্ব সিপিবি সহ দেশের বামপন্থিদের কী কারণে আন্দোলনের উত্তাপ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে নি, কেনো সিপিবি-বাসদের ব্যাপক গণভিত্তি গড়ে ওঠে নি, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত গণজাগরণমঞ্চ প্রতিষ্ঠা ও তার আন্দোলনে কি বাম বা সিপিবি-বাসদ বা ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্র ফ্রন্টের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো না? এখনও কি নেই? গণমানুষের চেতনার জাগরণের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে? রামপালে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ পরিবেশ বিধ্বংসী অপতৎপরতা রুখে দাঁড়ানো ও দেশি-বিদেশি লুটপাটকারীদের কবল থেকে সুন্দরবন বাঁচাতে ‘সুন্দরবন রক্ষা অভিযাত্রা’ করা হয়েছে। বামদের খবরগুলো খুব কমই আলোর মুখ দেখে।

বাংলাদেশের বুর্জোয়া ও শাসক নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলো প্রগতিবাদিদের খবরের জন্য দিতে চায় না। অথচ দেশ গঠনে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের খবরাখবর গণমানুষকে জানান দেয়া সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের ভূমিকা থাকা উচিত।

সেদিন সেলিমের বক্তব্যে চলাকালে মাঝে-মধ্যে উপস্থিত সভ্যগণের মুহূর্মুহূ করতালি আর হর্ষধ্বনি প্রমাণ করে যে সভার শ্রোতারা তার বক্তব্যকে পূর্ণভাবে সমর্থন করেছে। সেলিমের দেয়া চুলোয় ভাত সেদ্ধ হওয়ার উপমাটি বোধ হয় ধরতে পারেননি। বাংলাদেশের জনগণ এ যাবতকালের শাসকশ্রেণি কর্তৃক শোষিত হচ্ছে, নিষ্পেষিত-পীড়িত হচ্ছে, তাদের মৌলিক বা গণতান্ত্রিক অধিকার ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে, বাক-স্বাধীনতা হারাচ্ছে, মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কর্মসংস্থানের স্থান সংকুচিত হচ্ছে বা কর্মসংস্থান হচ্ছেই না, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে অহরহ, রয়েছে বিপুল শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার, কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যে নায্য মূল্য পাচ্ছে না, শিক্ষায় করারোপ হচ্ছে, নিয়োগ বাণিজ্যের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে, বাঙালি সংস্কৃতির চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা বিকৃত সংস্কৃতির আমদানি হচ্ছে, গুম, খুন, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি বাড়ছে। এসব বিষয়ে জনগণের সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণ যদি অসচেতন থাকে, তাহলে সেই দোষ শুধু সিপিবি বা বামদের ঘাড়ে চাপানো যায় না।

জনগণেরও দায়িত্ব বা কর্তব্য রয়েছে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, তাদের কর্মসূচি বা আদর্শিক মতবাদ গ্রহণ করার আজকাল ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলেই- হয় আওয়ামী লীগ, নয়তো বিএনপি-জামাত করে। এই দলগুলোতে যুক্ত হতে তাদের পড়তে হয় না, কিছু জানতেও হয় না, জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু, শহীদ জিয়া অমর হোক- খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, আর নারায়ে তাকবির- ধ্বনি দিলেই বিশাল নেতা হওয়া যায়, নগদ কিছু বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপুল কামানোও যায়। পক্ষান্তরে, সিপিবি-বাসদ-বাম বা বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যুক্ত হতে বা করতে হলে, বুঝতে হলে-পড়তে হয়, জানতে হয়, মগজ খাটাতে হয়। আজকালের তথাকথিত বিশ্বায়নের যুগে নবীনদের, এমনকি প্রবীণদেরও সেই চেষ্টা তেমন নেই। তা যেন না থাকে, তারই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে।

যে দেশে ঘুষ-দুর্নীতি ডাল-ভাতের মতো, ধরা খেয়ে দুদকের মহা সার্টিফিকেট নিয়ে দেদারচে পার পেয়ে যায়, যে দেশে চোখের পলকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা, সাড়ে চার হাজার বা ছয় হাজার কোটি টাকা ঘোষণা দিয়ে মেরে দিয়ে পার পেয়ে যায়, আর অপরাধ ও অপরাধীকে আড়াল করতে সরকারের শক্তিমান মন্ত্রী বাহাদুরগণ সাফাই গায়- সাড়ে চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা এমন কিছু নয়; যে দেশে দুর্নীতির বিচার হয় না, বাক্স (টেন্ডার-ভোট ইত্যাদি), মানুষ ইত্যাদি ছিনতাই বা হাওয়া হয়ে যায় হরহামেশা, সেই দেশে বামই শুধু না- যেকোনো গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান জটিল থেকে জটিলতর প্রক্রিয়া। সেলিম যথার্থই বলেছেন, ‘রাজনীতি বুঝতে হলে অর্থনীতি বুঝতে হবে। রাজনীতি হলো অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ’।

বামপন্থিরা ছাড়া বাংলার ক’জন বা ক’টি দলের নেতা-কর্মীরা তা বুঝতে চায়? তবুও সিপিবি-বাসদকে সাধুবাদ যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বীজ গণমানুষের মধ্যে বুনে দেয়ার বা বিকল্পধারার আদর্শিক মতবাদের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং তার সর্বজনীন গণভিত্তিক রুপ দেয়ার সৎ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ।নিবন্ধকার আরো লিখেছেন, কমিউনিস্টরা পৃথিবীর যে দেশেই ক্ষমতা দখল করেছে, তারা সেইসব দেশে পরিবর্তনের বদলে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন, বিরোধীদের গুলি করে হত্যা, অথবা জেলে পুরে শায়েস্তা করেছেন। চীন থেকে কিউবা, ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন, এমনকি রাশিয়ায়ও একই দৃশ্য, সর্বত্র আঙুল ফুলে কলাগাছ। এসবই হলো সাম্রাজ্যবাদি প্রচারণার মূল বিষয়। নিবন্ধকার সেগুলোই উদগীরণ করলেন।

কমিউনিস্ট শাসনের ফলে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো মোটেও তার চোখে পরলো না আশ্চর্য! কমিউনিস্টদের শাসনামলে রাশিয়া, চীন বা কিউবার সমাজ বদল হয়নি, তাদের সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়নি, ধনী-গরিবের অসাম্যের অবসান বা হ্রাস হয়নি, ভাত-কাপড়-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বাসস্থান-কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা হয়নি, একথা নির্বোধও বলতে পারবে না। তবে সেইসব দেশের জনগণের শতভাগ প্রয়োজন নিশ্চয় সরকারগুলো মেটাতে পারেনি-সে কথা সত্যি। কোনো একটি দেশের কমিউনিস্ট বা বাম নেতা দুর্নীতিবাজ বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হলে, নিশ্চয় সচেতন মানুষ হিসেবে তা মানবো না, তাই বলে এর সাথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট, বাম বা সিপিবি-বাসদের-যদি না তারা দুর্নীতিবাজ হয়, কী সম্পর্ক থাকতে পারে?

ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেনের, যেখানেই কমিউনিস্ট শাসকগোষ্ঠি তাদের দেশের রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে, সেখানেই তারা তাদের দেশের জনগণকে ছিঁড়ে-ছিবড়ে খেয়ে পরবর্তীতে জনতার নাকানি-চুবানি বা প্যাঁদানি খেয়ে ইঁদুরের গর্তে ঢুকেছে-বলে নিবন্ধকার উল্লেখ করেছেন। কথাটি সত্য, তবে তারা কমিউনিস্ট বা বামপন্থি কি? নিবন্ধকারের পুরো লেখা পড়লে, একদিকে দেশিয় বা বিদেশি বামপন্থিদের প্রতি তার যেমন অনাস্থা, তেমনি আবার ব্রাজিল, বলিভিয়া বা ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বামপন্থি শাসকগোষ্ঠি- যারা গি তে আসীন, তাদের প্রতি তার রয়েছে বিপুল অনুকম্পা। তিনি আবার সেইসব বামদের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পক্ষপাতী নন, একনায়কতন্ত্রের লক্ষণ ফুটে উঠছে বলে। তার ঠুনকো অভিযোগটি ধোপে টেকে কি? জনগণ যদি বামদের বারবার নির্বাচিত করে, তাহলে তাদের দীর্ঘদিন দেশ শাসন করতে দোষ কোথায়? আর ল্যাটিন আমেরিকার ক্ষমতাসীন বাম-গণতান্ত্রিক শাসকদের একনায়কতন্ত্রী লক্ষণ আদৌ দৃশ্যমান কি? পশ্চিম বাংলার উদাহরণও নিবন্ধকার টেনেছেন। সেখানেও সিপিএম বা বামফ্রন্ট জনগণের ভোটে বিরতিহীনভাবে প্রায় চার-চারটি দশক রাজ্য শাসন করেছে, আবার জনগণের ভোটের রায় মাথায় নিয়ে তারা মহাকরণের বাইরে অবস্থান নিয়েছে।

তবে হ্যাঁ, পশ্চিম বাংলার বামদের পরাজয়টা বেশ শোচনীয় ছিলো। তাতে কী? ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অবস্থা বামদের চেয়ে আরো করুণ, শোচনীয়- অন্তত ভোটের বিচারে তাই দৃশ্যমান। তাই বলে কি একটি পরাজয়ই শেষ কথা? প্রতিটি পরাজয় থেকে বামেরা শিক্ষা নেয়, নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়। গ্রিস বা ল্যাটিন আমেরিকা কি তার প্রমাণ বহন করে না? পশ্চিম বাংলার বামদের পরাজয়ে নিবন্ধকারের উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন, বা সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তন জগতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এবং বামরা তা ভালো করেই জানে ও স্বীকার করে। কেননা, বামদের রাজনীতির মূল কথাই হলো বাস্তবতাকে মেনে একাগ্রতার সাথে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

কমিউনিস্ট শব্দ এখন লেখকের ভাষায় অসম্মানের হলেও, গ্রিস, ব্রাজিল, বৃটেনের লেবার পার্টি প্রধান, বা ল্যাটিন আমেরিকার বামপন্থিরা- যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পেরেছে বা শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে, তিনি তাদের গুনকীর্তন করার চেষ্টা করেছেন। এটা কি স্ববিরোধিতা নয়? সিপিবি বলেছে, এবং এখনও বলছে, গণমানুষের চেতনার বৈপ্লবিক জাগরণ ঘটানোর কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র ও সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা। আমরা দেখেছি, কমিউনিস্ট বা বামদের জনপ্রিয় কথা বা কর্মসূচি বুর্জোয়ারা কীভাবে মেরে দেয়। কমিউনিজমের সবচেয়ে পরীক্ষিত শত্রু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা, এমনকি ওবামাও ‘পরিবর্তনে’র শ্লোগান দিয়ে ভোটারদের পাগল করে ২য় বারের মতো ক্ষমতায় এসেছেন।

বুর্জোয়া দলগুলোও বদলে দেয়া বা পরিবর্তনের কথা বলে কি আওয়ামী লীগ, তৃণমূল-বিজেপি, এমন কি আমেরিকার রাজদ- হাতে তুলে নেয়নি? সিপিবি’র ‘আমার ভোট আমি দেবো যাকে খুশি তাকে দেবো’ শ্লোগানটি ছিনতাই হয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির সম্পদ হয়ে গেলো? নিশ্চয়ই বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা পরিবর্তনের স্বপ্ন এখনো পারেনি। তার অনেক কারণ আছে। দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে পার্টিকে তিনবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো এবং অনেকগুলো বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পার হতে হয়েছে। গোটা বাংলাদেশ এখন নষ্টদের দখলে। এখানে বাচ্চা দেয়ার জন্য ভালো ডিমও পচে যায়। এই সমাজে বাম, প্রগতিবাদ বা মুক্তচিন্তার উত্থান ও বিকাশ খুব সহজ নয়। নির্বাচনসহ সকল স্তরে কালোটাকার দৌরাতœ বন্ধ হলে প্রগতি বনাম বুর্জোয়া পেশিশক্তির লড়াই উপভোগ করা যেতো। সোভিয়েত পতনের পর, বিলোপবাদিরা পার্টিকে প্রায় ধ্বংস্তুপে পরিণত করে, দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত, এমনকি সম্পত্তি-অফিস-প্রকাশনা ইত্যাদি ভাগবাটোয়ারা করে কেটে পড়েছিলেন। দীর্ঘদিনের ত্যাগী বিশ্বাসী নেতৃবৃন্দের এই বিপুল ত্যাগের ধাক্কা পার্টি আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠছে। ব্যর্থতা নিশ্চয় আছে, কিন্তু সাফল্যও নেহাত কম নয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের রাজা-বাদশার হাতের রক্ত কমিউস্টদের হাতে লেগে থাকার কথা নিবন্ধকার বলেছেন। বাংলাদেশের কথাই চিন্তা করুন না কেনো। মুক্তিযোদ্ধাদের হাত কি শত্রুর রক্তে রঞ্জিত হয়নি? গ্রিসের সিরিজা ও স্পেনের পদেমোস পার্টি হঠাৎ করেই বামপন্থা নীতি গ্রহণ করেননি। আগে থেকেই পার্টি দু’টো বামপন্থি নীতিতে চালিত। তাদের দেশে গরীবের ওপর করারোপ না করে যদি শুধু ধনিক শ্রেণির ওপর তা ধার্য করা হয় মন্দ কী? গণতন্ত্র তো কেবল ভোট নয়। গণমানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার সমূহের নিশ্চয়তা, জনগণের প্রাত্যহিক ব্যয় হ্রাস বা ক্রয়ক্ষমতা নাগালের মধ্যে রাখা, বাড়তি চাপ বা পীড়ন থেকে মুক্তির পথ তৈরি করে দেয়াই জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সে বাম-ডান-বিপ্লবী যেই হোক।

লেনিন যথার্থই বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ ধনতন্ত্রের শেষ ধাপ। আজকের দিন পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের ধাপের পর আর কোনো স্তরের কথা কোনো দার্শনিক, রাজনীতিক, অর্থনীতিক, বা সমাজবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করতে পারেনি। শুধু ভারমন্টের স্বতন্ত্র সাংসদ বার্নি স্যান্ডার্স’র জনপ্রিয়তায় হিলারি ক্লিনটনই তাঁর রণকৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হননি। এরুপ ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে দেখেছি। অতীতে কমিউনিস্ট বা ছাত্র ইউনিয়কে টেক্কা দিতে আওয়ামী লীগকে সংস্কৃতির দিকে ঝুকতে বাধ্য হতে হয়েছিলো। পরবর্তীতে তাদের বিএনপি-জামাতকে টেক্কা দিতে আরো অধিক দমন-পীড়ন, সন্ত্রাস বা মৌলবাদের দিকে ঝুকতে হয়েছে। ফলত জঙ্গিবাদ এখন এই জনপদের জন্য নতুন আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এই কথাগুলো সেদিন বলেছিলেন, যা নিবন্ধকার সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। নিবন্ধকার ল্যাটিন আমেরিকা বা বিশ্বের অন্যান্য বামপন্থি সরকার সমূহের উদাহরণ টেনেছেন। সমগ্র লেখার এটা একটা ভালো দিক।

কিন্তু তিনি জানেন না ল্যাটিন আমেরিকা, গ্রিস, বৃটেন আর আমাদের বাংলাদেশের পরিবেশের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। যদি ১ শতাংশ মানুষের হাতে থাকে গোটা দুনিয়ার ৫০ শতাংশ সম্পদ। আর ৮০ শতাংশ মানুষের নিয়ন্ত্রণে মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ সম্পদ। তাহলে, সম্পদের এই যে আকাশ-পাতাল ফারাক, তা আমরা মানবো কেনো? পর্বতপ্রমাণ অসাম্য ও বৈষম্যের ফলে যদি ফ্রান্স, রাশিয়া বা চীনে বিপ্লব হতে পারে, তো বাংলাদেশে বিপ্লব না হোক, অন্তত নতুন একটি গণঅভ্যুত্থান হতে ক্ষতি কী? শাসকগোষ্ঠির একচেটিয়া দমন-পীড়ন দুঃশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠার পরিবেশ কি গদিসীনরাই তৈরি করে দেয়নি? তাই নিবন্ধকারকে সবিনয়ে বলি, ভাত রান্না করার জোগারযন্ত্র এগিয়ে যাচ্ছে। চুলাও জ্বলছে, পাতিলের জলও ফুটছে, ভাত সেদ্ধ হতে কতোক্ষণ, শুনতে কি পাচ্ছেন না বুঁদবুঁদের শব্দ?


লেখক: কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.