একাত্তর পূর্ববর্তী বামপন্থি আন্দোলন ও মোজাফফর আহমদ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতি (সিপিবি)

একাত্তর পূর্ববর্তী বামপন্থি আন্দোলন এবং মোজাফফর আহমদের ভূমিকা
৭১ পূর্ববর্তী বামপন্থি আন্দোলন এবং মোজাফফর আহমেদের ভূমিকা ছিল অনন্য। এই অঞ্চলের বামপন্থি আন্দোলনের যারা সেনাপতি তাদের মধ্যে মোজাফফর আহমদ অন্যতম। এবং এটাও সত্য তিনি আমাদের বামপন্থি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবেন। ১৯২২ সালে জন্ম গ্রহণের পর পনেরো, ষোল বয়স থেকেই তিনি ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত হন। তিনি পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে সক্রিয় বাম আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।

এবং সবকিছুর স্বাভাবিক পরিণতি তার মধ্যে বামপন্থি আন্দোলনের বীজ বপন করে। এবং তিনি তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ কমিউনিস্ট রাজনীতির দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং পার্টিতে যুক্ত হন। কিন্তু সেই সময়ের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান সরকারের অত্যাচারে এবং নিষেধাজ্ঞায় কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারত না। একই সময় ভাষা আন্দোলনসহ নানা আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। একই সাথে মুসলিম লীগ থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এমন সময় নিষেধাজ্ঞার দরুন পার্টির নির্দেশে আওয়ামি লীগের ভেতরে গোপনে কাজ শুরু হয়। এই সময় তিনি আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেন।

“মান্নান ছদ্মনাম ধারণ করে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীতে দ্বৈত সদস্যপদের বিধান বাতিল করলে তিনি ন্যাপেরই নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন”

১৯৬৬ সালে যখন ৬ দফা দাবিতে তুমুল আন্দোলন চলছে তখন তিনি হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। উচ্চ শিক্ষা শেষে যুক্ত হন শিক্ষকতার সাথেও। কিন্তু রাজনীতির প্রয়োজনেই তিনি শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। এর পর পূর্ব বাংলায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্ট থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকেই যুক্ত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৮০ সাল পর্যন্তও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। মান্নান ছদ্মনাম ধারণ করে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীতে দ্বৈত সদস্যপদের বিধান বাতিল করলে তিনি ন্যাপেরই নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এর মধ্যে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন মোজাফফর আহমদের মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ ঘটায়।তাঁর অনন্য অবদানগুলোর ভেতরে যেগুলো অম্লান থেকে যাবে তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে তার অগ্রণী ভূমিকা।

বিশেষ করে ১৯৫৭ সালে তিনি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে সংসদে রেজ্যুলেশন পেশ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ এর বিরোধিতা করলেও, শেখ মুজিবর রহমান তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। আরেকটি বড় অবদান হল ষাটের দশকে প্রগতিশীল আন্দোলন চীনপন্থি রুশপন্থি হিসেব বিভক্তির সময় তিনি শক্তভাবে তাঁর অবস্থানকে ধরে রাখেন। একটি পক্ষ আইয়ুব খানের পক্ষে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কালে তিনি শক্ত অবস্থানে থেকে এর বিরোধিতা করেন। এবং স্বাধিকার আন্দোলন আওয়ামী লীগ একটা সময় পরিত্যাগ করলেও তাঁর নেতৃত্ব সেই আন্দোলনকে অগ্রসর রাখে। জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের ধারায় অগ্রযাত্রার নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের সপক্ষে বামপন্থিদের অবস্থান নিশ্চিত করেন মোজাফফর আহমদ।

কাছাকাছি পাড়ায় থাকায় মোজাফফর আহমদের সাথে আমার অনেক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত আচার আমি অনেক কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি বেশভূষায় কোনো সময়ই কেতাদুরস্থ ছিলেন না। পাড়ার পরিচিত অপরিচিত সকল লোকের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। তিনি মতামত ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে মারফতি ধাঁচে কথা বলতেন। তাতে কিছুটা ভাববাদী ধাঁচ থাকলেও অন্তর্নিহিত অর্থ খুবই বাস্তব। তিনি স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। যদিও মারফতি ধাঁচে আলাপ করতেন কিন্তু বাহ্যিকভাবে তা মনে হতো না। তিনি হরহামেশাই বলতেন, ‘মিডলক্লাস মডেস্টির চেয়ে প্রলেতারিয়েত স্টেট ফরোয়ার্ড উত্তম’।

১৯৭৩ এ ছাত্র ইউনিয়নের দ্বাদশ সম্মেলনে তিনি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তখন আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তাঁর সাথে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ট হতে শুরু করে। ৭৫ পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামে সেই রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। ১৯৮২ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন পর কারামুক্তির পর তাঁর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছাপিয়ে ব্যক্তিগত সুম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ১৯৮২ সালে আমি ক্ষেতমজুর সমিতি শুরু করি, তখন তাঁর সাথে আমার দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়। তাঁর অনুমান ছিল আমি ক্ষেতমজুরে সুবিধা করতে পারব না। তবে তিনি পরে ক্ষেতমজুর আন্দোলনে আমার কর্মকাণ্ড দেখে মোহিত হন।

“আওয়ামী লীগ আগে সেন্টার লেফট প্রভাবিত ছিল। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ লুটেরা ধনিক শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তিনি আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিগুলোকে হয়তো প্রয়োজনের চাইতে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এবং সেইসব বিবেচনা থেকে দেশের অভ্যন্তরের ডায়নামিকস এর প্রতিফলন তাঁর সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়নি”

ন্যাপের সবসময়ের বা মোজাফফর আহমেদের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে যে আমি সর্বদা একমত ছিলাম তা নয়। তাঁর সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আমি একমত নই। তিনি সম্ভবত অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাথে চলার ক্ষেত্রে তাই প্রতিফলিত হয়। আওয়ামী লীগ আগে সেন্টার লেফট প্রভাবিত ছিল। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ লুটেরা ধনিক শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তিনি আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিগুলোকে হয়তো প্রয়োজনের চাইতে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এবং সেইসব বিবেচনা থেকে দেশের অভ্যন্তরের ডায়নামিকস এর প্রতিফলন তাঁর সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়নি।

আমরা জিয়াউর রহমানের আমলে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে মোজাফফর আহমদকে ক্যান্ডিডেট করেছিলাম।তখনই বাম ঐক্যের সম্ভাবনা থাকলেও ন্যাপের ভাঙনের ফলে তা আর সম্ভব হয়নি। এমনকি ৭৩ এর নির্বাচনের পর থেকেই হয়তো ন্যাপের ঘুরে দাঁড়ানো অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।

এই দেশের বাম আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালা মোজাফফর আহমদ। ইতিহাস এখন অনেক বড় আপদকালীন সময় পার করছে। ইতিহাস অনেকেই এক ব্যক্তিকেই দিয়ে শেষ করতে চান। কিন্তু তাঁর মানে এই না যে ইতিহাসে অন্য কারও অবদান নেই। এদেশের ইতিহাসে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ হয়তো পাঠ্য বইয়ে, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম উল্লেখ হয় না, কিন্তু একদিন অবশ্যই হবে। এবং কেউ তা মুছে ফেলতে পারবে না।

অনুলিখন: তাহসিন মল্লিক

শেয়ার করুন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

Leave a Reply