একতা: জনতার কণ্ঠস্বর

মনজুরুল আহসান খান

লেনিন বলেছিলেন পত্রিকা হচ্ছে পার্টির সংগঠক ও প্রচারক। লেনিনও সারা দেশে বিচ্ছিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপগুলিকে একসূত্রে গাঁথার জন্য গোপন পত্রিকা প্রকাশ করেন। ইস্ক্রা, ইজভেস্তিয়া, প্রভদা এমনি নানা নামে গোপনে পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। এমনিতে নানা মত প্রকাশিত হতো। পাঠকরা এসব নিয়ে পার্টি সভায় তর্ক-বিতর্ক করত এবং আলোচনার মাধ্যমে অনেকটা কাছাকাছি আসতো। ভারতবর্ষে বাংলায় যুগান্তর, কালান্তর প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশ হতো। একটি পত্রিকার সাথে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফফর আহমেদ এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম জড়িত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন ভাষায় পার্টি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ হতো। ইংরেজিতে নিউ এইজ ছিল বিখ্যাত। এখনও পত্রিকাটি দিল্লী থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশে সিপিবির সাপ্তাহিক- একতা। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগে আগে এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন পার্টির পক্ষ থেকে খোকা রায় এর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বর্তমানে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও পরবর্তীতে সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সদ্য প্রয়াত মুনিরুজ্জামানও এর সাথে জড়িত ছিলেন। পত্রিকার ডিক্লেরেশন নেওয়া হয়েছিল অধ্যাপক আব্দুল হালিমের নামে। মহাউৎসাহে একতা বিক্রি শুরু হলো। পার্টির নেতারা নিয়মিত লিখতেন। এছাড়া দৈনিক সংবাদেও পার্টির নেতারা ছদ্মনামে উপসম্পাদকীয় লিখতেন। এই সব লেখা থেকেই কমরেডরা পার্টির লাইন বুঝে নিতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রিকা অফিসে হানাদার বাহিনী আক্রমণ চালায়। হামলা চলে ইত্তেফাক ও সংবাদ অফিসে। সংবাদ অফিসে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক শহিদ সাবের নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাপ্তাহিক একতা কলকাতা থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। পত্রিকা হাতে হাতে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কমরেড মণি সিংহ সভাপতি এবং মোহাম্মদ ফরহাদ সাধারণ সম্পাদক এবং আমি, মানিক প্রমুখ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। আমাকে একতার সম্পাদকমণ্ডলীতে নেয়া হয়। আমি একতায় নিয়মিত লেখা শুরু করি। একতা নিজে শ্রমিকদের কাছে বিক্রি করি। স্বল্প সময়ের মধ্যে একতা শ্রমিকদের মধ্যে এবং সমর্থক মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমি শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখতাম। এমনও দিন গেছে, আমি নরসিংদী সভায় যোগ দিতে গেছি। সেখানে মঞ্চে বসেই একতার জন্য লিখছি এবং এক দুই পাতা করে বাসে একতা অফিসে পাঠিয়ে দিচ্ছি। একতা অফিস তখন বংশালে সংবাদ অফিসের কাছেই। এর পরে দুই তিন বার একতা নিষিদ্ধ করা হয়। আমি সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মতিউর রহমান একতা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ জানাননি। পরে জানতে পারি মতি তার একটি প্রতিবেদনে রাঙামাটিকে ভারতের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই কারণে সেনা গোয়েন্দা দপ্তর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একতাকে এই ধকল সামলাতে অনেক সময় লাগে। এছাড়া যতদূর মনে পরে অজয় রায়ের কারণেও একবার একতা নিষিদ্ধ হয়।

পার্টির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা যখন গর্বাচেভের দেখাদেখি সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন, তখন তারা একতার পাতাকেও ব্যবহার করেন। আমি ঘোর আপত্তি জানাই। তখন বলা হয় সবাই তাদের মতামত সম্পর্কে নির্দ্বিধায় লিখতে পারবেন। আমি সে সময় একতায় ‘কমিউনিস্টরা রুখে দাঁড়াও’ শিরোনামে একটি লেখা লিখি। লেখাটি পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত হয়। এছাড়া আজকের কাগজে ‘কমিউনিস্টরা যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে’ এই শিরোনামে একটি লেখা দিই। এটি পরে পুস্তিকা আকারে ছাপা হয়।

মানিক ভাইরা পার্টি ছেড়ে যাওয়ার সময় পার্টির সম্পত্তি নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু অজয় রায় ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে একতাকে কব্জা করলেন। তিনি কবি শামসুর রাহমানসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একতা জোরেশোরে চালাবার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু শামসুর রাহমানসহ অন্য অনেকেই বাধ সাধলেন। তারা বললেন, একতা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র। এতে একমাত্র তাদেরই অধিকার। অজয় রায় একতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। আমি আজকের কাগজ অফিসে গিয়ে মতিউর রহমানকে বললাম, একতার ডিক্লারেশন আমাদের দিয়ে দিতে। সে আইনজীবীদের সাথে পরামর্শের জন্য দুইদিন সময় নিল। দুইদিন পরে কোনো ঝামেলা না করে একতার সব কাগজপত্র আমাকে দিয়ে দিল। আমি পরে এ. এন. রাশেদার নামে একতার ডিক্লেরেশন করালাম। সেই থেকে একতা আমাদের হয়ে গেল। শাহীন নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নিল। এরপর থেকে একতা নিয়মিত বের হচ্ছে। আমি স্বনামে লিখতাম। এছাড়া ‘রাখাল’ নামে এবং ‘সহজ আলী’ নামেও সাধুভাষায় নিয়মিত লিখতাম। এসব বিদ্রুপাত্মক লেখা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এইভাবে একতা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হয়ে উঠল।

এখন একতা সবচেয়ে পুরাতন সাপ্তাহিক। একতা বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের দিশারী হয়ে চিরকাল টিকে থাকবে। একতা জিন্দাবাদ।

লেখক: সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.