‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

পাকিস্তানের আইয়ূবী আমলে প্রায় প্রতিবছর ছাত্র ইউনিয়ন ‘একুশে সংকলন’প্রকাশ করতো। এসব সংকলনের কোনো একটিতে প্রকাশিত একটি কবিতার শিরোনাম ছিল “আমরা লড়ছি লাল গোলাপের জন্য। এ কথাগুলো আমার ও অনেকের মন কেড়েছিল। কবিতার এই গভীর অর্থবোধক ও ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ শিরোনামটি অনেকদিন ধরে আলোচনায়-বক্তব্যে উদ্ধৃত হতো, পোস্টারে উৎকীর্ণ হতো।

আইয়ূব শাহীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে-করতে একাত্তরে আমরা আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছেছিলাম। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমিও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে গেরিলা বাহিনীর একজন কমান্ডার হিসেবে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। গেরিলা যুদ্ধের নয় মাসের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যে গানগুলো আমরা গুণগুনিয়ে গাইতাম, সেগুলোর মধ্যে আমার প্রিয় গানটির প্রথম দু’টি লাইন ছিল- “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি”। সেই গান গাইতে গাইতে আমরা সেদিন মুক্ত স্বদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর স্বপ্ন জেগে দেখতাম। সেই স্বপ্নে দেখা দেশ-সমাজ আজ আধাঁরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দেশে আজ যে অবস্থা চলছে তাতে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় চোখে পানি এসে যায়। মনে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে।

একাত্তরের মার্চে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলাম। অনার্স পরীক্ষা চলছিল। ১ মার্চ বই   খুলে শেষ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই ‘ব্রেকিং নিউজের’ মতো করে চমক জাগানো খবরটি এসে পৌঁছেছিল যে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছেন যে, পকিস্তানের নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। তৎক্ষণাত স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠে বই-খাতা খোলা রেখেই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়েছিলাম রাজপথে। শুরু করে দিয়েছিলাম সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য বহুমাত্রিক প্রস্তুতি কাজ। ২৫ মার্চের পর সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। নয় মাস ধরে চলা সেই যুদ্ধে একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে আমি সামিল হয়েছিলাম।

রণক্ষেত্রে আমরা সেদিন স্বপ্ন দেখতাম ফুলের বাগানের মতো এক অনিন্দ্য সুন্দর দেশ গড়ে তোলার। এক শোষণহীন বৈষম্যমুক্ত ‘ইনসাফের’ সমাজ প্রতিষ্ঠা করার। সমাজতন্ত্র অভিমুখীন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার। অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে অস্ত্র পাশে রেখে ‘একটি ফুল’ ও ‘একটি মুখের হাসির’ কথা ভেবে গুণগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে আলোচনা করতাম সেই স্বপ্ন পূরণের পথ-পন্থার কথা। মনে মনে রচনা করতাম ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার ছোট-বড় পরিকল্পনার ছক।

এসব কথা মনে মনে ভাবতামই শুধু না। হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে প্রতিষ্ঠা করা ‘মুক্ত অঞ্চলগুলোকে’ আমরা সেই স্বপ্নের ধারায় পরিচালনা করতাম। চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি, মদ-জুয়া, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ, জবরদস্তি-খবরদারি ইত্যাদি মুক্তাঞ্চলগুলোতে ছিল না। আমরা স্বপ্ন দেখতাম যে দেশ পুরোপুরি হানাদার মুক্ত করার পর আমরা গোটা দেশটিকেই সেরকম অনিন্দ সুন্দর বাগানের মতো করে গড়ে তুলবো। এসব প্রত্যাশা ও স্বপ্নকে নিয়েই রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাঙালি জাতির গর্বের শেষ নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম’- কোন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সংগ্রাম নয়। জাতি হিসেবে ইতিহাসে এটিই বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু ‘জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের’ রাজনৈতিক অর্থটি সঠিকভাবে না বুঝলে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীর আসল তাৎপর্যটি অনুধাবন করতে পারব না। তা নিয়ে কিছু কথা বলে নেয়া তাই এখন প্রাসঙ্গিক হবে।

ইতিহাসের আদিম যুগে মানুষ দলবদ্ধ গোষ্ঠী হিসেবে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, গুহায় বাস করত। এই গোষ্ঠীবদ্ধতা ক্রমান্বয়ে কতগুলো সামাজিক নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতির জন্ম দেয়। সামষ্টিক যৌথতা ছিল তার মূল উপাদান ও ভিত্তি। কোনো একটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে ছিল না কোনো শোষণের (অর্থাৎ একজনের প্রাপ্য অন্যের দ্বারা আত্মসাৎ করার) সুযোগ ও উপাদান। কিন্তু বিকাশের একটা স্তরে যখন সমাজে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির সূত্রপাত ঘটল, তখন সমাজে সামষ্ঠিক যৌথতার বদলে একটি অংশের কর্তৃত্বের ব্যাপারটি সামনে চলে এলো। তা পরিণত হলো উদ্বৃত্ত-মূল্য যে বা যারা আত্মসাৎ করবে, অর্থাৎ যারা শোষণ করবে, তাদের শোষণের স্বার্থরক্ষার একটি বিষয়ে। শোষক এবং শোষিত, এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ল সমাজ। সামষ্টিক যৌথতার কর্তৃত্বকে গ্রাস করে নিল মুষ্টিমেয় শোষকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব। শোষকের স্বার্থ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্রমে সমাজের মাথার ওপর জায়গা করে নিল একটা ‘কর্তৃপক্ষ’। এই কর্তৃপক্ষই ছিল আধুনিক ‘রাষ্ট্রের’ ভ্রুণ। ইতিহাসের ধারায় পর্যায়ক্রমে দাস-সমাজ, সামন্তবাদী-সমাজ ও পুঁজিবাদী-সমাজের মধ্য দিয়ে মানবজাতি এগিয়েছে। এসব ভিন্ন ভিন্ন পর্বে সব সময়ই শোষকের স্বার্থে ‘রাষ্ট্র’ নামে একটা নিপীড়নের যন্ত্র অস্তিত্বমান থেকেছে।

একইসাথে ভৌগলিক, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে এবং ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার প্রভৃতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় মানব সমাজের মধ্যে জাতিগত বৈচিত্র্য ও বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। জাতি পরিচয়ের উদ্ভব ঘটেছে। যাকে আমরা আধুনিক যুগে জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত তা গোড়া থেকে ছিল না। আগেকার রাজা-বাদশারা সৈন্যবাহিনী নিয়ে অন্যকে আক্রমণ করত। বিজয়ী রাজা বিজিত রাজ্যের (রাষ্ট্রের) ভূমি দখল করে নিজ রাজ্যের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করে নিত। কিংবা, রাজ্যের অভ্যন্তরের কেউ বিদ্রোহ করে রাজ্যের একাংশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নতুন একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করত। এগুলো সবই ছিল জাতি নির্বিশেষে শোষণের ক্ষেত্রের ভৌগলিক ভাগ বাটোয়ারার ব্যাপার। জাতিগত পরিচয় ও অধিকারের বিষয়টি তখন এসব রাজ্য গঠন-বিলুপ্তির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না।

জাতি বলতে কী বুঝায় তা নিয়ে পাকিস্তানি আমলে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো হতো। একথা এখন প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রধান উপাদান হলো ভাষা। তাছাড়া সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক যোগসূত্র, সাধারণ ঐতিহাসিক ধারা প্রভৃতি উপাদান একত্রিত হয়ে জাতীয়তার পরিচয় নির্ধারিত হয়ে থাকে। জাতি পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘জাতি-রাষ্ট্র’ গঠনের ব্যাপারটি বিগত চার-পাঁচ শতাব্দীর ব্যাপার মাত্র। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে (বিশেষত ইউরোপে) যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে শুরু করলো, তখন থেকে তার উদ্ভব ঘটলো। পুঁজির স্বার্থে তাকে তার নিজের কর্তৃত্বাধীন বাজার নিশ্চিত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ল। বাজার নিয়ে পুঁজিপতিদের মধ্যে দ্বন্দ্বও অনিবার্য হয়ে উঠল। এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে নিজ নিজ বাজার আপন কর্তৃত্বাধীনে রাখার জন্যই রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে ‘জাতীয়তাবাদের’ উদ্ভব ঘটলো। দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ এক জিনিস নয়। দেশপ্রেম সব সময় ছিল এবং আছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ হলো একটা পুঁজিবাদী আদর্শ যা অনেক সময় উগ্র ও সংকীর্ণ হয়ে উঠার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল এবং এমনকি ফ্যাসিস্ট রূপও নিতে পারে। পুঁজিবাদের সহযাত্রী জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করেই এক সময় প্রতিষ্ঠা লাভ করতে শুরু করলো ‘জাতি-রাষ্ট্র’।

পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেণিতে শ্রেণিতে এবং জাতিতে জাতিতে অসম বিকাশের অনিবার্য্যতা। জাতি-রাষ্ট্র গঠন সংশ্লিষ্ট জাতির বিকাশের সুযোগ করে দেয়। সাথে সাথে যেসব জাতি-রাষ্ট্র তুলনামূলক অগ্রসর (অর্থনৈতিক) বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে, সেই উন্নত অবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তা তাদেরকে পিছিয়ে থাকা দেশের উপর জাতিগত আধিপত্য ও শোষণ চাপিয়ে দেয়ার পথও করে দেয়। সেখাআনে তারা উপনিবেশ স্থাপনের সুযোগ করে নেয়। উপনিবেশগুলোকে পরিণত করা হয় উৎপাদিত শিল্প পণ্য বিক্রির এবং শিল্পের জন্য সস্তায় কাঁচামালের যোগানের উৎস হিসেবে। একসময় প্রায় সারা দুনিয়াটিই এই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অধীনে চলে আসে। এই ব্যবস্থা আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে রূপান্তরিত হয় আধুনিক সাম্রাজ্যবাদে। মুনাফার হার বাড়ানোর জন্য অদম্য প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিতে ‘পণ্যের’ পাশাপাশি ‘পুঁজি’-ও নানাভাবে রপ্তানি হতে শুরু করে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হয়ে একচেটিয়া পুঁজির আবির্ভাব ঘটায়। ক্রমেই এই কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়ার বহুজাতিকরণ ঘটে। গোটা দুনিয়া সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশ পরিণত হয় ব্রিটেনের উপনিবেশে। দুই-তিন শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে অব্যাহত থাকে এই সাম্রাজ্যবাদী-ঔপনিবেশবাদী ব্যবস্থা। নির্মম থেকে নির্মমতর হতে থাকে জাতিগত নিপীড়ন।

একপর্যায়ে উপনিবেশগুলোতে শুরু হয় জাতিগত শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি লাভের সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ধারাই হলো বিশ্বব্যাপী পরিচালিত ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’। এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থায় এক সময় আসে ভাঙন। রাশিয়ায় সংগঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, প্রতিষ্ঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরো ১৪টি দেশ সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করে, গড়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। এই নতুন শক্তি সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শোষণমুক্ত মানব সভ্যতা গড়ে তোলার প্রত্যয় ঘোষণা করে। সমাজতন্ত্র হয়ে ওঠে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের স্বাভাবিক মিত্র। বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে যায়। দেশে দেশে দুর্বার হয়ে ওঠে ‘মুক্তি সংগ্রাম। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একের পর এক দেশ স্বাধীন হতে থাকে। ভারতবর্ষেও ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা দেশত্যাগের আগে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভেদ-নীতিকে সুচতুরভাবে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষে বিভক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়। এজন্য তারা মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি উভয়কেই বিশেষভাবে কাজে লাগায়। এভাবেই সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। ফলে গোটা ভারতবর্ষের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পরিপূর্ণ বিজয় খর্বিত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে পূর্ববঙ্গের জনগণের ওপর ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অব্যাহত শোষণের সাথে যুক্ত হয় পাঞ্জাব ভিত্তিক পাকিস্তানি শাসক ও ২২টি একচেটিয়া ধনিক গোষ্ঠীর অতিরিক্ত আরেকটি শোষণের বোঝা। বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তির বিষয়টি তাই একাধারে ইঙ্গ-মার্কিন তথা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তি এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণ ও তার জাতিগত নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি অর্জনের দ্বিবিধ কর্তব্যে পরিণত হয়। এর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর দশকের পর দশক ধরে চলে পূর্ববঙ্গের গনমানুষের রক্তঝড়া লাগাতার গণ-সংগ্রাম, চলে তাঁদের সুতীব্র শ্রেণি-সংগ্রাম।

জনগণের ধারাবাহিক সংগ্রামী অভিযাত্রার শক্তিকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছিল সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনৈতিক-সামাজিক-আদর্শিক ভিত্তি। সেই ভিত্তি ছিল একদিকে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতা। তা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির জাতীয়তা পরিচয়ের ভিত্তির ওপর অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে তার আরেকটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ধারা। এটি কোনোক্রমেই ছিল না পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে তার পূর্বাংশে শুধুমাত্র ভৌগলিক পরিচয়ের নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা বিচ্ছিন্নবাদী প্রয়াস। এটি স্পষ্টভাবে ছিল, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী অগ্রসরমান জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। উপরন্তু, তা ছিল পাকিস্তান অনুসৃত পুঁজিবাদের শোষণমূলক পথ পরিত্যাগ করে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন পরিকল্পিত প্রগতিশীল অর্থনৈতিক-সামাজিক বিকাশের পথনির্দেশ। একাত্তরের সংগ্রাম ছিল একইসঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। এভাবেই রূপ পেয়েছিল নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রগতিমুখীনতা। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে সূচিত হয়েছিল নতুন অভিযাত্রা।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হচ্ছে। ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য অর্জনগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে। দেশ এখন মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীর বিপরীত ধারায় চলছে। একাত্তরের স্বপ্নগুলো আজ ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। ‘ফুলের সৌরভ’ আর শিশুর ‘মুখের হাসির’ বদলে আজ দেখতে হচ্ছে ‘ক্যাসিনোর বাগান’, লুটপাটের মহোৎসব’, ‘বৈষম্যের কুৎসিত ক্রমবৃদ্ধি’। দেখতে হচ্ছে বুয়েটের কৃতি ছাত্র আবরারের থেতলানো লাশ, মাস্তান বাহিনী দ্বারা শিক্ষক-ছাত্র লাঞ্ছনা, ছাত্রলীগের পান্ডাদের দ্বারা ‘টর্চার সেল’, ‘গেস্ট রুমের’ নির্যাতন ইত্যাদি। এবং এরকমই আরো অনেক কিছু। প্রবল প্রতিকূলতার মুখে ‘সুন্দর’ আজ কোণঠাসা। দেশ আজ ‘অসুন্দরের’ ও দুঃশাসনের দখলে চলে গেছে। ‘ফুলের’ সতেজতা আজ পদদলিত। ‘মুখের হাসি’ আজ মৃয়মান।

এখানেই ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটতে দেয়া যাবে না। ‘আশায় বুক বেঁধে’ লড়ে যেতে হবে। রচনা করতে হবে ‘মুক্তিযুদ্ধের নব-অধ্যায়’। গার্মেন্টস শ্রমিকদের দুরন্ত সংগ্রাম, গনজাগরণ মঞ্চের উত্থান, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ইত্যাদি ঘটনা এই নিদর্শনই দেয় যে – শহীদের রক্তের দামে জন্ম নেয়া এই দেশে ‘ফুলের ও হাসির’ বিনাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধের নবজাগরণ হবেই। এটি শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র! তারই প্রস্তুতি চলছে আজ ঘরে ঘরে। তবে, সেজন্য শুধু অপেক্ষা করে বসে থাকা নয়। ধৈর্য্য ও নিষ্ঠার সাথে সে জন্য কাজ করে যেতে হবে। অর্ধশতাব্দি পরেও, ‘একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্য, একটি মুখের হাসির জন্য’ যে লড়াই শুরু হয়েছিল তা আজও শেষ হয়নি। সে লড়াই চলছে অবিরাম। মনে রাখতে হবে- ‘এই দিনই দিন নয়, আরও দিন আছে। এই দিনকে নিতে হবে সেই দিনের কাছে’।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.